অসীম ধৈর্য। অদম্য ইচ্ছাশক্তি। ভাল ব্যাটিং টেকনিক। এ সবই ঋষভ পন্থকে মঙ্গলবার ওভালে অসাধারণ একটি সেঞ্চুরি এনে দিল। ব্যাটসম্যান ঋষভ মঙ্গলবারের এই ইনিংস থেকে অনেক নম্বর পেলেও উইকেটকিপার ঋষভের পাশ মার্ক পাওয়াও কিন্তু কঠিন হয়ে উঠছে ক্রমশ। 

যে জন্য ভারতীয় দলে তাঁর ডাক পাওয়া, সেই কিপিংয়ের টেকনিকে ঋষভ খুবই কাঁচা বলে মনে করেন কিংবদন্তি কিপার সৈয়দ কিরমানি। তাঁর বক্তব্য, স্টাম্পের সামনে ব্যাট হাতে তিনি যতটা সফল, স্টাম্পের পিছনে তিনি ততটাই ব্যর্থ। কিরমানির মতে, ‘‘টেস্ট স্তরের কিপিং টেকনিকের ধারেকাছেও নেই ঋষভ। অনেক তৈরি হতে হবে।’’ 

মঙ্গলবার ওভালে ভারতের হার বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমে ঋষভ জীবনের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করলেও কিপিংয়ে তাঁর পারফরম্যান্স প্রত্যাশার স্তরে পৌঁছতে পারেনি। ইংল্যান্ডে শেষ দু’টি টেস্টে তিনি যথাক্রমে ৩০ ও ৪০টি বাই রান দেন, যা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে ক্রিকেট মহলে। 

হতাশ ১৯৮৩-র বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের কিপার কিরমানিও। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আনন্দবাজার-কে বেঙ্গালুরু থেকে ফোনে বলেন, ‘‘টেস্ট দলে থাকার মতো কিপার ও মোটেই না। আত্মবিশ্বাস আছে। কিন্তু তৈরি হতে না দিয়েই এ রকম একটা জায়গায় ওকে নামিয়ে দেওয়াটা একেবারেই উচিত হয়নি। ফলে কিপিং টেকনিকের ধারেকাছেও যেতে পারছে না। দীনেশ কার্তিক ওর চেয়ে ভাল কিপিং করতে পারত। কারণ, ওর অভিজ্ঞতা আছে।’’ ৬৮ বছর বয়সি প্রাক্তন তারকার প্রশ্ন, ‘‘ব্যাটিং, বোলিং শেখাবার লোক তো দলে অনেক আছে। কিন্তু কিপিং শেখাবার লোক কোথায়? টেস্ট স্তরের কিপিং শেখাবে কে? রবি শাস্ত্রী, সঞ্জয় বাঙ্গারদের কাছ থেকে এটা আশা করা ঠিক না। আসলে এখন কেউ টেকনিকের ধার ধারে না। সবাই শুধু ফল চায়। এটাই এই যুগে সবচেয়ে সমস্যা।’’ পার্থিব পটেলের ক্ষেত্রে যা হয়েছিল, ঋষভের ক্ষেত্রেও তেমনই হতে পারে বলে আশঙ্কা কিরমানির। বলেন, ‘‘পার্থিব পটেলকেও এ ভাবে কম বয়সে টেস্টে নামিয়ে ওর ক্ষতি করা হয়েছিল। অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে ভাল খেলার পরে ওকে সোজা টেস্ট দলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। টেস্টে নেমে যথারীতি ব্যর্থ হয় ও। যার ফলে ভারতীয় দলে ফিরতে ওর অনেক সময় লেগে যায়। ঋষভের ক্ষেত্রেও না এমনই হয়।’’

নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কিরমানি বলেন, ‘‘টেস্ট খেলার আগে একজন কিপারকে সেই স্তরে পৌঁছনোর জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫— এই চার বছর আমি তৈরি হয়েছিলাম। তখন ফারুক ইঞ্জিনিয়ারের পরেই ছিলাম আমি। তবু চার-পাঁচ বছর কাউন্টিতে নিজেকে তৈরি করতে হয়েছিল। ১৯৭৬-এ যখন প্রথম টেস্ট খেলি, তখন আত্মবিশ্বাস ও টেকনিক, দু’দিক থেকেই যথেষ্ট ভাল জায়গায় ছিলাম। সে জন্যই বহু দিন ধরে ধারাবাহিকতার সঙ্গে খেলতে পারি। সবার তো সচিন তেন্ডুলকরের মতো মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষমতা নেই।’’

দশ বছরে ৮৮টি টেস্টে ১৬০টি ক্যাচ নেওয়া কিরমানি বলছেন, ‘‘উইকেট কিপিং ক্রিকেটে সবচেয়ে কঠিন কাজ। আর তা শেখানোর জন্য বিশেষজ্ঞ কিপার-কোচ দরকার। ঋষভ-পার্থিবরা তা পায়নি বলেই ওদের ভুগতে হচ্ছে। আসলে আমাদের দেশে এই ধারণাটাই নেই যে কিপারদের জন্য আলাদা কোচ দরকার।’’ ভারতীয় দল তো দূর অস্ত্, তাঁর শহর বেঙ্গালুরুতে জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতেও কখনও ডাকা হয়নি কিরমানিকে। অথচ দেশের নতুন প্রজন্মের কিপারদের নিয়ে বেশ চিন্তিত তিনি। 

তবে এঁদের মধ্যেই ঋদ্ধিমান সাহাকে কিছুটা পছন্দ তাঁর। কিরমানি বলেন, ‘‘সাহা অনেক ধারাবাহিক, আত্মবিশ্বাসী। টেকনিকেও ভাল। কিন্তু কাঁধের চোটটা ওকে পিছিয়ে দিতে পারে। চোট সারিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে ওকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করতে হবে। পারলে ওকে অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া উচিত। কারণ, একশো শতাংশ নিখুঁত না হলেও কিপিংটা ও অন্যদের চেয়ে ভাল করে।’’