বিরাট কোহালি যখন টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিল, অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি এখন মুম্বইয়ে, ধারাভাষ্য দেওয়ার কাজে। স্টুডিয়োয় এক প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনিও আমার মতোই অবাক কোহালির এই সিদ্ধান্তে।

টস হওয়ার আগে লন্ডনের আকাশ বেশ মেঘলা ছিল। পরে অবশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়। ওভালের পিচে সবুজ আভাও ছিল। বোঝা যাচ্ছিল, শুরুর দিকে পেসাররা সাহায্য পাবে। তাও কেন ব্যাটিং নিল কোহালি? ভারত অধিনায়ক ব্যাখ্যা দিল, প্রস্তুতি ম্যাচ বলে প্রথমে ব্যাট করার চ্যালেঞ্জটা নেওয়া হয়েছে। আমি একমত হতে পারছি না। প্রস্তুতি ম্যাচ হোক কী আসল ম্যাচ, শুরু থেকেই ছন্দটা তৈরি করা উচিত। এই যে প্রথমেই ভারত এ রকম একটা ধাক্কা খেল, সেটা সমস্যা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি নিউজ়িল্যান্ড কিন্তু বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করার আগে আত্মবিশ্বাস পেয়ে গেল। এ বারের বিশ্বকাপ যে-হেতু রাউন্ড রবিন লিগ, তাই এই নিউজ়িল্যান্ডকেও কিন্তু খেলতে হবে কোহালিদের।

আরও একটা ব্যাপার আবারও পরিষ্কার হয়ে গেল। ব্যাটিংয়ে প্রথম তিন জন ব্যর্থ হলে, বেশির ভাগ ম্যাচেই কিন্তু ভারতকে ভুগতে হয়। এ দিনও হল। ভারত ১৭৯ রানে শেষ। নিউজ়িল্যান্ড জিতল ছয় উইকেটে। এই ম্যাচে পুরো ফিট না থাকার জন্য কেদার যাদব এবং বিজয় শঙ্কর খেলেনি। কিন্তু বাকিরা তো ছিল। কে এল রাহুল চার নম্বরে এল। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি ছিল, দীনেশ কার্তিক ছিল, হার্দিক পাণ্ড্য ছিল, রবীন্দ্র জাডেজা ছিল। প্রস্তুতি ম্যাচে তেরো জন খেলতে পারে বলে ভারত হার্দিক, জাডেজা— দু’জনকেই খেলায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল ব্যাটিংয়ে সেই গভীরতা নেই। ঋষভ পন্থকে না নেওয়াটা কিন্তু ভোগাতে পারে ভারতকে। রাহুলদের কিন্তু এ বার রান করতে হবে। 

প্রস্তুতি ম্যাচে ধোনি কিপিং করল না। ওর ব্যাটিং দেখে পরিষ্কার, এখন আর ও ২০১১ সালের ধোনি নেই। রাহুল যতই আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে ভাল খেলুক, জাতীয় দলে এখনও নিজের জায়গা পাকা করতে পারল না। রোহিতকে দেখেও মনে হল, আইপিএল-মোডে আছে। ঘরের বাইরে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ বোর্ড লাগানো। ঘুম ভাঙেনি। পা সে রকম নড়ছে না। একই কথা খাটে শিখর ধওয়ন সম্পর্কেও। যে কারণে শুরুর দিকে নিউজ়িল্যান্ড পেসারদের সুইং আর অফ দ্য পিচ মুভমেন্ট সামলাতে পারল না ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের সম্পর্কেও ভাল হোমওয়ার্ক করে এসেছিল নিউজ়িল্যান্ড। ঠিক জায়গায় বলটা রেখে গেল। ধওয়নকে বাইরে বাইরে খেলাল। কোহালিকে মারার একেবারে জায়গা দিল না।

কমেন্ট্রি বক্সে দেখা হয়ে গেল ব্রেট লি-র সঙ্গেও। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন পেসার বলছিলেন, এমন একটা পিচে খেলা হচ্ছে যেখানে শুরুতে বলটা জায়গায় রাখতে পারলেই সুইং করবে। সিম মুভমেন্টও হবে। নিউজ়িল্যান্ড বোলাররা ঠিক সেই কাজটা করে গেল।

ভারতীয় বোলারদের মধ্যে অবশ্যই সেরা যশপ্রীত বুমরা। নিউজ়িল্যান্ড ব্যাটিংয়ের সময় পিচ নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। সেখানেও কিন্তু বুমরা আগুন ঝরিয়েছে। ওর ইয়র্কার সামলাতে না পেরে এলবিডব্লিউ হয়ে যায় কলিন মুনরো। বুমরার শর্ট বলেও দেখলাম সমস্যায় পড়েছে ফর্মে থাকা কেন উইলিয়ামসন, রস টেলররা। 

বিশ্বকাপ শুরুর আগে অনেকেই বলেছেন, ইংল্যান্ডে এ বার প্রচুর রান হবে। ভারতের প্রস্তুতি ম্যাচটা দেখে মনে হল, রান উঠবে ঠিকই কিন্তু প্রথম দিকে সাহায্য পেতে পারে পেসাররা। বিশেষ করে যারা সুইং করাতে পারে। যেমন বোল্ট, সাউদি, মিচেল স্টার্ক, ডেল স্টেন। আমাদের পেস-ত্রয়ী। কিন্তু তার পরে পিচ নিষ্প্রাণ হয়ে যাবে। যেখানে স্পিনাররা বড় ভূমিকা নিতে পারে।

ভারত এ দিন তিন স্পিনারকে দিয়ে বল করাল। শেষ দিকে একটা করে উইকেট পেল যুজবেন্দ্র চহাল এবং জাডেজা। কুলদীপ যাদব ৮.১ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে কোনও উইকেট পেল না। ভারতীয় স্পিনারদের খেলতে নিউজ়িল্যান্ড ব্যাটসম্যানরা বিশেষ সমস্যায় পড়েছে বলে মনে হল না। এই ব্যাপারটা কিন্তু চিন্তায় রাখবে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টকে। অতীতে মাঝের ওভারে দুই রিস্ট স্পিনার প্রচুর উইকেট নিয়ে অনেক ম্যাচ জিতিয়েছে দলকে। বিশ্বকাপেও কিন্তু দুই স্পিনারের দিকে তাকিয়ে আছে ভারত।   

এ দিন ব্যাটে বলে সফল ক্রিকেটার জাডেজা। ৫০ বলে ৫৪ করল। আবার সাত ওভারে ২৭ রানে এক উইকেট নিল। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বকাপ ম্যাচে কি সুযোগ দেওয়া হবে জাডেজাকে? আমার উত্তর হল, অবশ্যই দেওয়া উচিত। জাডেজা একটা প্যাকেজ। লোয়ার অর্ডারে ভাল ব্যাট করে, বলে কাজ চালিয়ে দেবে, দুর্দান্ত ফিল্ডার। দুই রিস্ট স্পিনারের এক জনের জায়গায় অবশ্যই খেলানো যায়। 

শেষে বলব, কোহালিরা একটা প্রস্তুতি ম্যাচ হেরেছে বলে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। এটা ভারতকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে পারে।