টেস্ট সিরিজের শুরু থেকে অজিঙ্ক রাহানে। এ বার আর. অশ্বিন। ভারতীয় দলের প্র্যাক্টিস থেকে মুখ অন্ধকার করা সিনিয়র ক্রিকেটারের দৃশ্যটা যেন উধাওই হতে চাইছে না।

এত দিন ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান ব্যাটসম্যান এবং টেস্টের সহ-অধিনায়ক। তাঁকে প্রথম একাদশে না রেখে রোহিত শর্মাকে খেলিয়ে যাওয়া নিয়ে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছে। এখন সেই জায়গা নিতে চলেছেন দেশের মাঠে দলের এক নম্বর বোলিং অস্ত্র।

সমস্যা হচ্ছে, দেশের মাঠ মানে ঘূর্ণি রণক্ষেত্র। বল ঘুরবে, নিচু হবে। সেখানে এক নম্বর ঘাতকের নাম আর. অশ্বিন। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বিদেশ সফরে এলে গতি এবং বাউন্স স্বাগত জানানোর জন্য তৈরি থাকে। তা-ও সেঞ্চুরিয়নে বরাত জোরে অনেকটা ভারতীয় ধরনের উইকেট পাওয়া গিয়েছিল। জোহানেসবার্গে সে সব আতিথেয়তার বালাই নেই। ওয়ান্ডারার্সের বাইশ গজে ঘাস যে রকম ছিল, এ দিনও সে রকমই সবুজ থেকে গিয়েছে। সামান্যও কাটা হয়নি। তাতে অশ্বিনের প্রথম একাদশে থাকা নিয়ে কালো মেঘ আরও বেড়েছে। ভারতীয় দলে একটা পরিবর্তন নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। অজিঙ্ক রাহানে ফিরবেন। রোহিত শর্মা এ দিন দীর্ঘক্ষণ নেটে ব্যাট করলেও সম্ভবত তাঁর জায়গাতেই ফিরবেন সহ-অধিনায়ক রাহানে। একমাত্র যদি রণনীতি পাল্টে ছয় বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানের ফর্মুলায় যায় ভারতীয় দল, তবেই রোহিতের সম্ভাবনা আছে। 

দক্ষিণ আফ্রিকা শিবির থেকে অনেকেই সেঞ্চুরিয়নের পিচ নিয়ে তোপ দেগেছিলেন। মর্নি মর্কেল কটাক্ষ করেছিলেন, ‘‘আমরা তো ভারতীয় পিচে বল করছিলাম।’’ ফ্যাফ ডুপ্লেসি ম্যাচ জেতার পরেও দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডকে পিচ নিয়ে জরুরি পদক্ষেপ করার ডাক দিয়েছিলেন। ডুপ্লেসি বলেছিলেন, ‘‘আমরা দেশের মাঠে কী রকম পিচে খেলতে চাইছি, সেটা নিশ্চয়ই নতুন করে বলার দরকার নেই। আমরা পেস, বাউন্স চাই— সকলেই জানে।’’

দক্ষিণ আফ্রিকান টিম থেকে এই কোরাসের পরে পিচ নিয়ে আর কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ বা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ড। পাছে ফের ডুপ্লেসি-রা প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন। আর ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা এই বাইশ গজের যুদ্ধ চলছে ডিভিলিয়ার্সদের ভারত সফর থেকে। দু’বছর আগে ভারতে যখন গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, বন বন ঘূর্ণি বানিয়ে তাদের চার টেস্টের সিরিজে ৩-০ হারিয়েছিল ভারতীয় দল। একটি টেস্ট বৃষ্টির জন্য ভেস্তে যায়। সেই ঘা এখনও দগদগে হয়ে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটারদের মনে। ডিভিলিয়ার্সের মতো শান্তশিষ্ট ক্রিকেটারও নাকি টিম মিটিংয়ে বলেছেন, পাল্টা ৩-০ না করতে পারলে মনের শান্তি হবে না!

ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের এখন নামকরণ করা হয়েছে ফ্রিডম সিরিজ। মহাত্মা গাঁধী ও নেলসন ম্যান্ডেলার নামে ট্রফি দেওয়া হয় জয়ীদের। কিন্তু গাঁধী বা ম্যান্ডেলার শান্তির বার্তার কোনও ছাপ দু’দেশের ক্রিকেটে বেঁচে নেই। বরং পুরোটাই যুদ্ধ আর প্রতিশোধের আবহ। ভারত ওদের দেশে ঘূর্ণি বানিয়ে আমাদের বন্দি করেছিল। এখানে পেস, বাউন্সের কড়াইয়ে ওদের ভাজা ভাজা করে আমরা মুক্তিলাভ করব— এই মোটামুটি দক্ষিণ আফ্রিকান থিম সং।

আর দেশ পাল্টাতেই চিত্রনাট্যেও কী রাতারাতি পরিবর্তন! ভারতের ঘূর্ণি পিচে যিনি ডুপ্লেসিদের মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে হাজির হতেন, সেই অশ্বিনকে না ওয়ান্ডারার্সে বাইশ গজে বন্দি হয়ে কাটাতে হয়। এ ব্যাপারে সোমবারের আনন্দবাজারেই পরিষ্কার ইঙ্গিত ছিল। এ দিন মাঠের নানা ছবি দেখে মনে হল, ঘটনা সে দিকেই এগোচ্ছে। অশ্বিন খুব বেশি বল করলেন না নেটে। মাঝে এক বার দেখা গেল উমেশ যাদবকে বোলিং টিপ্‌স দিচ্ছেন। আবার নেট প্র্যাক্টিসের শেষের দিকে বোলিং কোচ বি. অরুণকে নিয়ে একা একা কোনও ব্যাটসম্যান ছাড়াই বল করে গেলেন। তখন শরীরী ভাষা মোটেও অন্যতম সেরা বোলিং অস্ত্রের মতো চনমনে নয়, বরং ব্রাত্য বোলারের যন্ত্রণাকাতর চোখমুখই ফুটে উঠেছে।

পাশের নেটেই তখন তাঁর অধিনায়ক দাপটে ব্যাটিং প্র্যাক্টিস করে চলেছেন। দুই টেস্টে হারের পরে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন অনুশীলনের সময়। গত কাল এবং এ দিন প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দু’বার ব্যাটিং করলেন বিরাট কোহালি। এক বার হেড কোচ রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে স্টান্স নিয়ে আলোচনা করতেও দেখা গেল। সোমবার প্র্যাক্টিসের শেষ বেলায় পাশাপাশি দু’টো নেটে দুই সিনিয়রের অনুশীলন হয়তো টেস্টের প্রস্তুতিতে সব চেয়ে গভীর ছবি হয়ে থাকল। এক জন আসন্ন লড়াইয়ের জন্য তৈরি হচ্ছেন। অন্য জন হয়তো ভবিষ্যতের কথা ভেবে তেল দিয়ে মেশিন সক্রিয় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। 

বলে না, ক্রিকেট হচ্ছে মহান অনিশ্চয়তার খেলা। নায়কের সিংহাসনও যে কত দ্রুত বদলে যায়!