ওয়ান্ডারার্সের খারাপ হতে থাকা পিচে শেষ পর্যন্ত কত রান বিরাট কোহালিদের হাতে থাকলে জেতার মতো স্কোর হিসেবে গণ্য হতে পারে?

কমেন্ট্রি বক্সে উপস্থিত প্রাক্তন ক্রিকেটারেরাও দেখা যাচ্ছে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছেন। সুনীল গাওস্কর বলে দিলেন, ‘‘১৮০ রানের লিড যদি নিতে পারে ভারত, তা হলেই জেতার মতো স্কোর। উইকেটের অবস্থা মোটেও ভাল নয়।’’

আবার কেপলার ওয়েসেলস মনে করছেন, ২২০ রান হাতে না থাকলে নিরাপদ ‘লিড’ নয়। ‘‘ভারতকে অন্তত ২২০ রানে এগিয়ে যেতে হবে নিশ্চিন্ত থাকার জন্য। না হলে কিছু বলা যায় না। দু’শোর মধ্যে টার্গেট থাকলে ম্যাচ ফিফটি-ফিফটি,’’ মাঠ ছাড়ার সময় বলে গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে অন্যতম সেরা অধিনায়ক ওয়েসেলস।

জয়ের রান নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। যেটা নিয়ে কোনও সংশয় নেই, তা হচ্ছে, ওয়ান্ডারার্সকে এখন ক্রিকেটের রণক্ষেত্র নয়, বক্সিং রিংয়ের মতো দেখাচ্ছে। আর ম্যাচ যেন পৌঁছে গিয়েছে দ্বিতীয় ইনিংসের শ্যুট আউটে। যশপ্রীত বুমরার পাঁচ উইকেট, ভুবনেশ্বর কুমারের সুন্দর সুইং বোলিং এবং মুরলী বিজয় ও কে এল রাহুলের সাবধানী ব্যাটিংয়ে দিনের শেষে ভারত এগিয়ে ৪২ রানে। হাতে রয়েছে নয় উইকেট। ওয়ান্ডারার্সের পিচে কে কতক্ষণ টিকবে, সেই গ্যারান্টি কার্ড কেউ দিতে চাইবে না। তবু দ্বিতীয় দিন ড্রেসিংরুমে ফেরার সময় দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে ভারতই কিছুটা হলেও মানসিক ভাবে এগিয়ে।

আর কোহালিদের টিমবাস স্টেডিয়াম ছাড়ার সময় যে ভাবে ভারতীয় ভক্তদের ভিড় দেখা গেল, সেটাও বেশ ইতিবাচক। প্রথম দুই টেস্টে সুযোগ তৈরি করেও হেরেছে কোহালির দল। অধিনায়ক স্বয়ং সিরিজের একমাত্র সেঞ্চুরি করে, সর্বোচ্চ স্কোরার হয়েও সব চেয়ে বেশি করে আক্রান্ত। গত কালও টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ায় তীব্র ভাবে সমালোচিত হয়েছেন। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই বুমরা, ভুবনেশ্বর-রা অধিনায়কের সিদ্ধান্তকে যথার্থ প্রমাণ করে দিলেন। এখন বরং মনে হচ্ছে, ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্তই না টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। ওয়ান্ডারার্সের পিচ যে রকম উত্তরোত্তর খারাপ হচ্ছে তাতে শেষ ইনিংসে ব্যাট করাটা অভিশাপই হতে যাচ্ছে ফ্যাফ ডুপ্লেসি-দের জন্য। এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, টসের সময় যে ডুপ্লেসি এসে বলেছিলেন, তিনি ফিল্ডিং করতেন সেটা স্রেফ গেমসম্যানশিপ। নিজের দেশের সংবাদমাধ্যমের দিক থেকে চাপে থাকা প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে আরও চাপে ফেলতেই সম্ভবত বলেছিলেন।

সেই কারণেই হয়তো ডুপ্লেসি ক্রিজে আসা মাত্র কোহালিকে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে দেখা গেল। প্রেস বক্সের কাচের ঘর ছেড়ে গ্যালারিতে গিয়ে সেই সময়কার খেলা দেখতে দেখতে আবিষ্কার করা গেল, মাঠে রীতিমতো কথার ঝড় উঠেছে। প্রেস বক্সে বসে যার আন্দাজ পাওয়াই সম্ভব নয়। কথার ফুলঝুরি ফুটছে মাঠের মধ্যে। অধিনায়ক কোহালি থেকে হার্দিক পাণ্ড্য— সকলে তাতিয়ে যাচ্ছেন বোলারদের। মাঝেমধ্যে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের উদ্দেশে বাছাই করা শব্দ স্প্রে করা হচ্ছে হিন্দিতে। শেষ পর্যন্ত ভারত যদি এই টেস্ট জিততে পারে, ওই এক ঘণ্টা টার্নিং পয়েন্ট হয়ে থাকবে। যখন কোহালির নেতৃত্বে প্রচণ্ড আগ্রাসী শরীরী ভাষা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ভারত। ওই সময়েই এ বি ডিভিলিয়ার্স এবং ডুপ্লেসি— দু’টো প্রধান উইকেট তোলেন যথাক্রমে ভুবনেশ্বর এবং বুমরা। এত দিন সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ‘ভু-বু’ জুটি কামাল করছিল। এক দিনের ক্রিকেটে তাঁদের বিশ্বের সেরা পেস জুটি আখ্যা দিয়েছেন স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার-রাও। এ বার টেস্টেও এই জুটির সফল অভিযান শুরু হয়ে গেল। বুমরা এই সিরিজে প্রথম টেস্ট খেলেছেন। অ্যালান ডোনাল্ডের মতো কিংবদন্তি ফাস্ট বোলার পর্যন্ত তাঁর বোলিং দেখে মুগ্ধ। জীবনের তৃতীয় টেস্টেই নিলেন পাঁচ উইকেট। তিনি ১৮.৫ ওভারে ৫৪ রানে নিলেন পাঁচ উইকেট। ভুবেনশ্বর ১৯ ওভারে ৪৪ রানে তিন উইকেট। এই দু’জনের জন্যই দক্ষিণ আফ্রিকা সাত রানের বেশি ‘লিড’ নিতে পারল না।

অত বেশি রানেও তারা এগোতে পারত না যদি নাইটওয়াচম্যান  কাগিসো রাবাডা এবং টেলএন্ডার ভার্নন ফিল্যান্ডার-কে তাড়াতাড়ি আউট করতে পারতেন ভারতীয় বোলাররা। রাবাডা দু’ঘণ্টার উপরে ক্রিজে কাটিয়ে করে গেলেন ৩০। ফিল্যান্ডার ৭৫ মিনিট কাটিয়ে ৩৫। দু’জনের মিলিত অবদান ৬৫। কম রানের খেলায় বোলারদের করা এই রানগুলোই পার্থক্য গড়ে দিয়ে যায়।

মহম্মদ শামির বোলিং নিয়ে কাউকে কাউকে বেশ হতাশ দেখাল। এমন প্রাণবন্ত, ফাস্ট বোলিং-সহায়ক পিচে শামির মতো সিম এবং সুইং হাতে থাকা বোলারের ভয়ঙ্কর হতে না পারাটা বিস্ময়কর। ১২ ওভারে ৪৬ রান দিয়ে পেলেন মাত্র একটি উইকেট। সব চেয়ে দুশ্চিন্তার, ওভার প্রতি দিয়েছেন প্রায় চার রানের কাছাকাছি। ইশান্ত শর্মা-ও একটি উইকেট পেয়েছেন, কিন্তু তাঁকে দেখে এতটা ম্যাড়ম্যাড়ে মনে হয়নি।

ভারতীয় ক্রিকেট ভক্তরা আশা করবেন, রাবাডা-ফিল্যান্ডার এমন ক্ষতি করতে পারেননি যাতে এখানেও টেস্ট হারতে হয় কোহালির দলকে। ক্ষতি পুষিয়ে দলকে লড়াইয়ে রাখার দায়িত্ব এখন ব্যাটসম্যানদের। সারা সিরিজে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন, বোলাররা প্রত্যাঘাত করে গিয়েছে। এখন বিজয়, রাহুলদের প্রত্যয়ী হয়ে উঠে নিশ্চিত করার দায়িত্ব যে, প্রজাতন্ত্র দিবসে অন্তত দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের হাতে পরাধীন হবেন না!