• শ্রীরূপা বসু মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ঝুলনদের জন্য কিন্তু গর্বই হচ্ছে

India Women's National Cricket Team
হতাশ: মাত্র ৯ রানের জন্য হাতছাড়া হয়েছে বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যাওয়ার পরে ভারাক্রান্ত ঝুলন ও তাঁর সঙ্গীরা। রবিবার লর্ডসে। ছবি: এএফপি।

Advertisement

হাসতে হাসতে যে ম্যাচটা জিতে বিশ্বকাপ নিয়ে দেশে ফেরার কথা ছিল, সেটাতেই তীরে এসে তরী ডুবে গেল মিতালি রাজের। আকস্মিক ভাবে মাত্র ৯ রানে বিশ্বকাপ ফাইনাল হেরে বসল ওরা। যা ফের এক বার প্রমাণ করল, ক্রিকেট এখনও এক মহান অনিশ্চয়তার খেলা।

তেতাল্লিশ ওভারের শেষে পুনম রাউত যখন আউট হয়ে ফিরছে, তখন জিততে গেলে ভারতের দরকার ছিল ৪২ বলে ৩৮ রান। হাতে ৬ উইকেট। সিঙ্গলস নিয়েই ম্যাচটা শেষ করে দেওয়া যেত। পিচে কোনও জুজু নেই। ইংল্যান্ডের ফিল্ডিংও বেশ খারাপ। এ রকম পরিস্থিতি থেকে স্রেফ ‘চোক’ করে গেল ভারতের টেল এন্ডাররা। ২২৮-৭ এর জবাবে ভারত অল-আউট হয়ে গেল ২১৯ রানে।

হেরে গেল ঠিকই, কিন্তু মেয়েদের জন্য গর্বই হচ্ছে। যে ভাবে বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠল ওরা, যে ভাবে লড়ল, যে ভাবে গোটা দেশের মন জয় করে নিল, তার জন্য গর্ব হচ্ছে।

ম্যাচ শেষে টিভি স্ক্রিনে বারবার দেখাচ্ছিল ৪৬ রানে ৬ উইকেট নেওয়া অ্যানিয়া শ্রাবসোল-কে। টিমকে বিশ্বকাপ জেতানোর আনন্দে মুখ ঝলমল করছে। মিনিটখানেক পরেই ভেসে উঠল ভারতীয় ডাগআউট। ঝুলন, মিতালি, হরমনপ্রীতদের চোখেমুখে তখন অমাবস্যার অন্ধকার।

আরও পড়ুন: মেয়েকে আউট হতে আঁধার কৌর ঘরে

ম্যাচ হারলে অনেক কাটাছেঁড়া হয়। হবেও। আমার মতে এ দিন ভারতীয়দের ম্যাচ থেকে হারিয়ে যাওয়ার টার্নিং পয়েন্ট হরমনপ্রীত কৌরের (৫১) আউট। ও আউট হয়ে যাওয়ার পরেই হঠাৎ একটা ঠকঠকানি এসে জুড়ে বসল ঝুলনদের টিমে। আর পুনম রাউত (৮৬) শতরানের কাছ থেকে ফিরতেই শিখা, দীপ্তিরা চাপটা টেনে আনল নিজেদের দিকে। উইকেট টু উইকেট বল করে শ্রাবসোল ছয় উইকেট পেল ঠিকই। কিন্তু সেই বলে এমন কিছু বিষ মাখানো ছিল না।

খারাপ লাগছে ঝুলনের জন্য। ও আজ নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিল ইংল্যান্ড ব্যাটসম্যানদের। ও দ্বিতীয় স্পেলে বল করতে আসতেই ইংল্যান্ডের রানের গতি কমে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পারফরম্যান্স দাম পেল কেবল রেকর্ড বুকে।

তবে এত কিছুর পরেও ভাল লাগছে মহিলা ক্রিকেট নিয়ে গোটা দেশের এই উন্মাদনা দেখে। মনে পড়ে যাচ্ছে চুয়াত্তর সালের সেই দিনগুলোর কথাও। যখন বাস্কেটবল, হকি, হ্যান্ডবল থেকে চারশো বাছাই মেয়ে ধরে এনে ক্রিকেট টিম তৈরি হতো। তখন আন্তর্জাতিক ম্যাচ বেশি পাওয়া যেত না। তিরানব্বই সালে কোচ হিসেবে দল নিয়ে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম। ওখানে একটা ক্যামেরা ভাড়া করে হাইলাইটস বানানো হতো। তার ধারাভাষ্য দিতাম আমি।

রবিবার ভরা লর্ডসে যখন মিতালি রাজ টস করতে নামছে তখন কুড়ি বছর আগে কলকাতার সাই ক্যাম্পে দেখা সেই ছোট্ট নিষ্পাপ মুখের মেয়েটার কথা মনে পড়ছিল। বিশ্বকাপের জন্য সম্ভাব্য ভারতীয় দলে সে বার প্রথম এসেছিল মিতালি। সে বার দুর্দান্ত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও সাতানব্বই বিশ্বকাপে মিতালিকে আমরা টিমে রাখতে পারিনি। চূড়ান্ত দল বাছাইয়ের দিনে সিদ্ধান্ত হয়, বাচ্চাটার প্রতিভা দারুণ। আরও একটু বড় হতে দাও। নইলে চোট-আঘাতে মাঠের বাইরে চলে যেতে পারে!

হেরে গিয়েও গর্ব হচ্ছে ঝুলন গোস্বামীর জন্য। বিশ্বকাপ ফাইনালে দশ ওভারে মাত্র ২৩ রানে ৩ উইকেট। ঝুলন ওর স্পেলটা শেষ করে ফেরার সময় ওর রান-আপ আর ফলো থ্রু স্লো-মোশনে দেখিয়ে বিদেশি ধারাভাষ্যকাররা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছিলেন। মনে পড়ছিল, বিবেকানন্দ পার্কের এক কোণে স্বপন সাধুর কোচিং ক্যাম্পে সেই চাকদহ থেকে ভোরের প্রথম ট্রেন ধরে খেলতে আসা লম্বা মেয়েটার কথা।

আশ্চর্য লাগে প্রথম দিন দেশের হয়ে খেলার জন্য মেয়েটার মধ্যে যে তাগিদ দেখেছিলাম, আজও তা অটুট। লম্বা হওয়ায় একদম মাথার উপর থেকে বলগুলো ডেলিভারি করে। সঙ্গে রহস্যময় সব সুইং। এ বার ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপে দেখলাম রিভার্স সুইং-টাও দারুণ করাচ্ছে। টুর্নামেন্টের শেষের দিকে এসে ছন্দটা পেয়ে গিয়েছিল আমাদের বাংলার মেয়ে। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ল্যানিং যার হদিস খুঁজে পায়নি। এ দিন ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরাও খাবি খেয়েছে ওর বলের সামনে। মারার জায়গাই দেয়নি বাঙালি পেসার।

খেলায় হার-জিত থাকবেই। শেষ দিকে সামান্য ভুলত্রুটির জন্য হারলেও মিতালির দলের এই বিশ্বকাপে লড়াই হৃদয়ে থেকে যাবে গোটা ভারতের।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন