বুধবার রাতে বাঁ কাঁধের চোটে কাবু হয়ে পড়েছিলেন আন্দ্রে রাসেল। বৃহস্পতিবার অনুশীলনেও আসেননি। হোটেলের ঘরে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। শুক্রবার সন্ধে পর্যন্ত তিনি খেলবেন কি না, তা নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের সংশয় থাকলেও তাঁর স্ত্রী জাসিম লোরা আস্থা হারাননি। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, আন্দ্রে খেলবেন। একশো শতাংশ ফিট হয়েই মাঠে নামবেন। 

শুক্রবার ইডেনে ২৫ বলে ৬৫ রান করে প্রমাণ করে দিলেন, তাঁর কাঁধে বিন্দুমাত্র ব্যথা নেই। বরং ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা রয়েছে আগের মতোই। রাসেল যখন পরিচিত বিধ্বংসী মেজাজে এগিয়ে চলেছেন, হসপিটালিটি বক্সে তখন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর স্ত্রী জাসিম লোরা। হয়তো প্রত্যাশার চাপে। তিনি কি বিশ্বাস করেছিলেন, কাঁধে চোট নিয়েও এমন ইনিংস উপহার দেবেন স্বামী?

হসপিটালিটি বক্স থেকে বেরোনোর সময় রাসেলের স্ত্রী জাসিম বললেন, ‘‘বুধবার রাতে ওর চোট লাগার পরেও আমি আস্থা হারাইনি। বিশ্বাস করেছিলাম রাসেল খেলবে। এর আগেও দিল্লি ক্যাপিটালসের বিরুদ্ধে একই জায়গায় আঘাত পেয়েছিল। তখনও বিশ্বাস করেছিলাম ও খেল‌বে। এ বারও অন্যথা হয়নি।’’

রাসেলের ইনিংসকে কত নম্বর দেবেন জাসিম? তাঁর কথায়, ‘‘রাসেল স্বমহিমায় ছিল। এর থেকে বেশি আর কী-ই বা আশা করতে পারি!’’

বুধবার রাতে রাসেলের অবস্থা দেখে ‌বোঝা যায়নি, তিনি খেলতে পারবেন। বুঝতে পারেনি কেকেআর টিম ম্যানেজমেন্টও। তাই হয়তো শুক্রবার ম্যাচের আগে পর্যন্ত নেটে ব্যাট করানো হচ্ছিল কার্লোস ব্রাথওয়েটকে। একান্তই রাসেল না পারলে তিনিই ছিলেন সম্ভাব্য পরিবর্ত। কিন্তু রাসেল ফিরলেন। ম্যাচের আগে ব্যাট নিয়ে মাঠে নামার সময় চিৎকার করে উঠল ইডেনের গ্যালারি। বুঝিয়ে দিল, তাঁরা রাসেল-ঝড় দেখতেই এসেছেন। কী করে ফিট হলেন রাসেল? জাসিমের উত্তর, ‘‘কাল রাত ২.৩০-এর সময় জিম করতে গিয়েছিল। সেই ভিডিয়োও রয়েছে। যে মানুষটি মাঝরাতে জিমে কসরত করতে পারে, সে সব করতে পারে। কেকেআরকে ম্যাচ জেতানোর জেদ ওর মধ্যে কাজ করেছিল। তাই দ্রুত সুস্থ হয়ে গিয়েছে,’’ বলেই ‌গাড়িতে উঠে গেলেন জামাইকার মডেল। বলে গেলেন, ‘‘আমরা এখান থেকেও কিন্তু ফিরতে পারি।’’

এ দিকে রাসেলের রাজত্ব করা মাঠেই সেঞ্চুরি করে গেলেন বিরাট কোহালি। ইডেন আরও এক বার প্রমাণ করল, তাঁরা সব সময়েই ভাল ক্রিকেটের পূজারি। বিরাট-তাণ্ডবের সঙ্গে তাল মিলিয়েই ছিলেন তাঁর ভক্তেরা। তাঁর মধ্যে একজন ইংল্যান্ড থেকে উড়ে  এসেছেন শুধুমাত্র বিরাটের ব্যাটিং দেখার জন্য। 

ঠিক যেন ‘বাকেট লিস্ট’ সিনেমার জলজ্যান্ত উদাহরণ। ২০০৭ সালে রব রেইনার পরিচালিত সিনেমায় দেখানো হয়, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত দুই বৃদ্ধ বেরিয়ে পড়েছেন স্বপ্নপূরণের খোঁজে। তাঁদের স্বপ্নপূরণের ঠিকানা কখনও ‘গ্রেট ওয়াল অব চায়না’। কখনও বা ‘তাজমহল’। কখনও আবার ‘মাউন্ট এভারেস্ট’-এর চূড়ায় দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য  উপভোগ করা। শুক্রবার ইডেনেও সেই ছবির চরিত্রের প্রতিবিম্ব দেখা গেল।

সাইমন অ্যালান। ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়েছিল ২০০৮ সালে। চিকিৎসার পরে তা ঠিক হয়ে গেলেও বাড়িতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি। বেরিয়ে পড়েছেন তাঁর স্বপ্নপূরণের খোঁজে। বেশ কয়েকটি স্বপ্নের মধ্যে অন্যতম সামনে থেকে বিরাট কোহালির ব্যাটিং দেখা। সেই সঙ্গে ইডেনের গ্যালারিতে বসে ক্রিকেট উপভোগ করা। শুক্রবার তিনি ইডেনে খেলা তো দেখলেনই, বিরাট-সেঞ্চুরির সাক্ষীও থাকলেন। ৯৬ রান থেকে চার মেরে বিরাটের সেঞ্চুরি পূরণ ‌করার পরে তাঁর চোখে জল। অ্যালান বলেন, ‘‘ঈশ্বর আমার স্বপ্নপূরণ করেছেন। অনেক দিন ছেলেটি রান পায়নি। আজ প্রার্থনা করে এসেছিলাম, যেন ও হাসিমুখে হোটেলে ফিরতে পারে। কিন্তু সেঞ্চুরি দেখার স্বাদ নিতে পারব, তা একবারও ভাবতে পারিনি।’’

বিরাটের ব্যাটিং এবং ইডেনে বসে ম্যাচ উপভোগ করার ছাড়া আর কী রয়েছে তাঁর ‘বাকেট লিস্টে’? অ্যালানের উত্তর, ‘‘ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময় আমি ইংল্যান্ডে থাকব না। তাইল্যান্ডে যাব। কিছুদিন ওখানে থাকব। তার পরে বাহামা আইল্যান্ডে গিয়ে ছুটি কাটাব। এ ছাড়াও  তাজমহল, পেরুর মাচুপিচু দেখার ইচ্ছে আছে। ইনকা সভ্যতার ধংসাবশেষ দেখে আসার ইচ্ছে আছে।  জীবনে আর হারানোর কিছু নেই। তাই প্রত্যেক মুহূর্ত উপভোগ করে যেতে চাই।’’