মরসুমের প্রথম বড় ম্যাচে ০-২ পিছিয়ে গিয়েও ড্র করে ড্রেসিংরুমে ফেরা। খেলা শেষে বাড়ির পথ ধরা ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের আক্ষেপ জিততে না পারার জন্য। তাঁদের চোখে এ দিনের ত্রাতা দু’জন। কোস্টা রিকার বিশ্বকাপার জনি আকোস্তা এবং দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সুভাষ ভৌমিক।

জনি গোল করে ম্যাচে ফেরান ইস্টবেঙ্গলকে। আর সুভাষ মোক্ষম চালে লালরিনডিকা রালতেকে নামাতেই ঘুরে দাঁড়িয়ে সমতায় ফেরা লাল-হলুদের।

ডার্বিতেই বড় দলের হয়ে কলকাতায় প্রথম খেলতে নেমে গোল করেছেন সেলিম নুর, ফেলিক্স, ডুডু ওমাগবেমি, আক্রম মোগরাভিরা। এ বার সেই তালিকায় জনি। এই চার বিদেশিই অতীতে বড় দলের জার্সি গায়ে প্রথমেই ডার্বি ম্যাচে খেলতে নেমে গোল করেছেন।

লিগের অঙ্ক

• ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগান দু’দলেরই পয়েন্ট সমান। আট ম্যাচে ২০।

• গোল পার্থক্যেও দুই প্রধান একই বিন্দুতে। মোহনবাগান (১৮-৫), ইস্টবেঙ্গল (১৬-৩)।

• দু’দলেরই তিনটে করে ম্যাচ বাকি। দু’দল সব ম্যাচ জিতলে গোল পার্থক্যে খেতাব নির্ধারিত হবে।

• গোল পার্থক্য এক হলে দেখা হবে কোন দল বেশি গোল করেছে।

• ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ বাকি পিয়ারলেস, মহমেডান এবং এফসিআইয়ের সঙ্গে

• মোহনবাগানের ম্যাচ এফসিআই, কাস্টমস ও মহমেডানের সঙ্গে।

যুবভারতী ছাড়ার আগে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘‘সমর্থকরা দারুণ ভাবে পাশে ছিলেন। কলকাতায় প্রথম খেলতে নেমেই গোল করায় দারুণ লাগছে।’’ এ দিন প্রথম দিকে একটু নিরাপদ ভাবে খেলছিলেন নেমার-মেসিকে রুখে আসা ইস্টবেঙ্গলের এই স্টপার। প্রথম দিনেই স্যামি ওমোলোর মতো দুর্দান্ত ভাবে চোখে পড়েননি। কিন্তু শান্ত মাথায় রক্ষণকে নেতৃত্ব দিয়ে খেলতে পারার একটা সহজাত গুণ রয়েছে তাঁর। কভারিং এবং অনুমানক্ষমতাও বেশ। হেড করার সময়জ্ঞানও ভাল। তবে ওমোলোর অস্ত্র ট্যাকল তাঁর ঝুলিতে এ দিন দেখা যায়নি। বদলে ‘লুজ’ বল ধরে খেলতে ভালবাসেন।

এ দিন সকালেই কলকাতায় এসে ডার্বি দেখতে যুবভারতীতে চলে এসেছিলেন লাল-হলুদের নয়া স্প্যানিশ কোচ আলেসান্দ্রো মেনেনজেস গার্সিয়া। তিনিও দোভাষীর সাহায্য নিয়ে স্টেডিয়াম ছাড়ার আগে বলে গেলেন, ‘‘জনিই তো খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিল।’’ সাংবাদিক সম্মেলনে ইস্টবেঙ্গলের বর্তমান কোচ বাস্তব রায়ও বলে গেলেন, ‘‘প্রথমার্ধের শেষ দিকে জনির গোলটাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। ওই সময় গোল না হলে চাপে পড়ে যেতাম আমরা।’’

ইস্টবেঙ্গলকে ম্যাচে ফেরানোর আর এক কারিগর সুভাষ প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে কোনও কথা না বলেই হনহন করে যুবভারতী ছাড়েন। এ দিন তাঁর মগজাস্ত্রেই দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াল ইস্টবেঙ্গল। জনির হেড এই সময় অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট। শিল্টন পালের দুরন্ত সেভ, সঙ্গে একের বিরুদ্ধে এক পরিস্থিতিতে আমনার গোল করতে না পারা। ম্যাচ শেষে লাল-হলুদ ড্রেসিংরুমে তাই আক্ষেপ এই ম্যাচ জিতে ফিরতে না পারার জন্য। রেফারির উপর তাঁদের ক্ষোভ দ্বিতীয়ার্ধে একটি পেনাল্টি না
পাওয়ার জন্য।

জনি-সহ ইস্টবেঙ্গলের তিন চার ফুটবলার কমলপ্রীত, কাশিম ও গোলকিপার রক্ষিত ডাগর এ দিন প্রথম বড় ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন। ফলে শুরুতে অল্পস্বল্প ভুল হচ্ছিল তাঁদের। সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের বাঁদিকে চুলোভা ও ব্র্যান্ডন ওভারল্যাপে আসা মোহনবাগান রাইট ব্যাক অরিজিৎ বাগুইকে ধরছিলেন না। এই সুযোগেই ম্যাচে জাঁকিয়ে বসেছিল মোহনবাগান। সেখান থেকেই ০-২ পিছিয়ে পড়া। সুভাষ এটা বুঝতে পেরেই কমলপ্রীতের জায়গায় লালরিনডিকাকে নামিয়ে এক ঢিলে তিন পাখি মারেন। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, মোহনবাগান রক্ষণে প্রান্ত থেকে বল উড়ে এলেই সমস্যা। তাই সেট পিসে গোলের জন্যই তিনি নামিয়েছিলেন ডিকাকে। বর্ষার ভিজে মাঠে ডিকার দূরপাল্লার শটও কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই কাশিমকে রক্ষণের সামনে রেখে ডিকাকে একটু এগিয়ে রেখেছিলেন মাঝমাঠে। আর তার সামনে আমনা। এই অঙ্কেই সেট পিস থেকে সমতা ফেরানো ইস্টবেঙ্গলের।

সঙ্গে ছিল স্বাধীনতার পরে প্রথম বিদেশ থেকে ট্রফিজয়ী সুভাষের বিখ্যাত ‘ভোকাল টনিক’। দ্বিতীয়ার্ধে সহকারী রঞ্জন চৌধুরী ও বাস্তবকে নিয়ে তিনি জবি জাস্টিনদের বলেন, ‘‘গোল যখন হয়েছে, তখন তোমরা হারতে পারো না। দ্বিতীয়ার্ধে চলো প্রেসিং ফুটবল খেলে মোহনবাগানে চেপে ধরি। গোল শোধ হবেই।’’ টেনে আনেন জর্জ টেলিগ্রাফ ম্যাচে ৭৫ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকে ইস্টবেঙ্গলের ২-১ জিতে ফেরার কথাও। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফুটবলারের কথায়, ‘‘এতেই ঘুরে দাঁড়ায় ইস্টবেঙ্গল।’’

তবে পিছিয়ে যাওয়া ম্যাচে এ রকম দুর্দান্ত ভাবে ফিরে আসাকে সমর্থকরা কুর্নিশ করলেও তাঁরা ক্ষুব্ধ দলে কোনও বিদেশি স্ট্রাইকার না থাকায়। লাল-হলুদের নতুন স্প্যানিশ কোচ বলছেন, ‘‘আমাদের তো স্ট্রাইকার আসছেই।’’