একটা ক্রিকেট ম্যাচের চব্বিশ ঘণ্টা আগে ম্যাচটা নিয়ে কী কী লেখা সম্ভব?

যুযুধান দুই টিমের তুল্যমূল্য বিচার। দলের প্রধান অস্ত্রদের নিয়ে কাটাছেঁড়া। কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে, সেই আলোচনা। পিচের চরিত্র বিশ্লেষণ। হয়তো বা দুটো দলের প্রথম এগারো নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী।

কিন্তু ম্যাচটা যদি হয় টি-টোয়েন্টি, তা হলে যাবতীয় বিশ্লেষণ, যাবতীয় আলোচনা নিউজপ্রিন্ট নষ্ট ছাড়া কিছু মনে হবে না। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে কী হচ্ছে, কখন হচ্ছে, কেন হচ্ছে, বুঝতে বসলে যে যুক্তির সঙ্গ হারাতে হতে পারে। বাড়ির সবচেয়ে ছোট ছেলের প্রতি যেমন গোটা পরিবারের প্রচ্ছন্ন একটা প্রশ্রয় থাকে, ক্রিকেট সংসারে টি-টোয়েন্টি কি অনেকটা সে রকমই নয়?

চিয়ারলিডারদের নাচ, হঠাৎ-হঠাৎ ডিজের কানফাটানো তাণ্ডব, ম্যাচ চলতে চলতেই ফিল্ডারের ইন্টারভিউ, আম্পায়ারের টুপিতে ক্যামেরা ফিট করে দেওয়া— সর্বকনিষ্ঠের যাবতীয় আবদার, তা সে যতই আজগুবি হোক না কেন, মেটানো স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সেই টি-টোয়েন্টির সর্ববৃহৎ উৎসব, মানে আইপিএল, এই আইপিএলের একটা ম্যাচের আগে তা হলে কি লেখা উচিত? ঐতিহ্যের খাঁটি ক্রিকেটীয় প্রিভিউ দিয়ে এই উৎসবের ডেসিবেল মাপাটা পণ্ডশ্রম। ইডেনে আইপিএল নাইনের প্রথম ম্যাচটা না হয় ধরা যাক একটা কোলাজ দিয়ে। যুক্তি-তর্ক-বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য-হাসি-মজার যে কোলাজে ক্রিকেট আছে, আছে ক্রিকেটের বাইরের অনেক কিছু।

যত কাণ্ড পিচ নিয়ে: কলকাতা নাইট রাইডার্সের প্র্যাকটিস সবে শুরু হয়েছে। গৌতম গম্ভীরকে দেখা গেল হনহন করে পিচের দিকে হেঁটে যেতে। একা। গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ সবুজ ঘাসে ভরা বাইশ গজ দেখলেন। একটু পরই সেখানে হাজির কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায়। ইডেনের কিউরেটর আর কেকেআর অধিনায়কের মধ্যে যে সৌজন্য বিনিময় হচ্ছে না, ক্লাবহাউসের লোয়ার টিয়ার থেকেও বোঝা গেল। পরে শোনা গেল, পিচে ঘাস নাকি চায়নি কেকেআর। সিএবি আবার বলে যাচ্ছিল, বেশি ঘাস ওড়ালে পিচের বারোটা বেজে যাবে। এবং গম্ভীর এ দিন প্র্যাকটিস করতে এসে আবিষ্কার করেন, ঘাস ঠিক ততটাই আছে, আগে যতটা ছিল। যা নিয়ে নাকি কিউরেটরের সঙ্গে তপ্ত বাক্যবিনিময়ও হয়। ইডেন কিউরেটর বা নাইট অধিনায়ক দু’জনেই ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেন। সুজন কিছুতেই স্বীকার করলেন না যে, গম্ভীর তাঁকে কিছু বলেছেন। বললেন, কোন পিচে খেলা হবে সেটা নাকি ঠিক হচ্ছিল! টিম বাসে ওঠার সময় গম্ভীরকে ধরা হল। ক্লাবহাউস থেকে যে ব্যাপারটা দেখা গিয়েছে, সবিস্তারে বলাও হল। শুনেটুনে বিরক্ত গম্ভীরের জবাব, ‘‘কিছুই হয়নি। আপনাদেরই এ সব চোখে পড়ে!’’ তবে কিছু না হলে ঘাস আর ওড়ানোর কথা হবে কেন? রবিবার তো সেটা হচ্ছে। সকালেই হচ্ছে।

ব্রেথটেকিং ব্রেথওয়েট: গত রবিবার যে মাঠে চারটে ছক্কা মেরে ক্রিকেট কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছেন, এক সপ্তাহ পরে আজ সেই ইডেনে ফিরছেন কার্লোস ব্রেথওয়েট। দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের সবচেয়ে আলোচ্য ব্যক্তির জীবনে এই সাত দিনে কী কী পরিবর্তন এসেছে? টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে নাকি প্রবল সমস্যায় ভুগছেন দীর্ঘদেহী ক্যারিবিয়ান। ইন্টারভিউয়ের এত চাহিদা যে, সময়ে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না! দিল্লির নতুন মেন্টর রাহুল দ্রাবিড়ের ক্লাসে নিয়মিত ছাত্র। স্পিনের মোকাবিলা কী ভাবে করতে হয়, না শিখে দেশে ফিরবেন না।

 

 

চার ছক্কার সোনালি অতীতে পড়ে থাকতে চান না ব্রেথওয়েট। আর শুধু ব্রেথওয়েটকে নিয়ে পড়ে থাকতে চান না গৌতম গম্ভীর। ক্যারিবিয়ান দানব নিয়ে নাইট অধিনায়ক যা বললেন, অতীতে বহু বার বিপক্ষের বহু বড় নাম নিয়ে বলেছেন— নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, বিপক্ষের এগারো জনকে নিয়েই পড়াশোনা হচ্ছে। কিন্তু তার পরেও যদি... যদি ব্রেথওয়েট চলে? দেখা যাক।

শাহরুখের বার্তা, দূত মাইসোর: নতুন মরসুমে সাধারণত নাইটদের সরাসরি কোনও না কোনও বার্তা দেন টিম মালিক শাহরুখ খান। এ বার তিনি সেটা করার আগেই তাঁর হয়ে টিমকে মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছেন কেকেআর সিইও বেঙ্কি মাইসোর। টিমকে বলেছেন— যাই হোক না কেন, তোমাদের কাজ হল মাঠে নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী সেরাটা দেওয়া। শুধু কেকেআরের জন্য নয়, নিজেদের জন্যেও। তোমরা খেলাটা উপভোগ করো। দেখবে সাফল্য চলে আসছে।

ব্যাট নয়, চপস্টিক: কেকেআরের টিম হোটেলে দুপুরের দিকে অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখা গেল। টিমের ‘জোকার’ হিসেবে পরিচিত ব্র্যাড হগ অভিনব খেলায় মগ্ন। সঙ্গী নাইটদের সহকারী কোচ সাইমন কাটিচ। টেবলে একটার উপর একটা ব্লক সাজিয়ে ছোটখাটো টাওয়ার তৈরি করা। আর তাঁদের চপস্টিক দিয়ে একটা একটা করে ব্লক তুলতে হচ্ছে, টাওয়ারটাকে না ভেঙে। গোটা ব্যাপারটা ভিডিওয় তুলে রাখা হচ্ছে। ব্যাপারটা মজার হলেও অর্থহীন নয়। মনঃসংযোগ বলেও ক্রিকেটে তো একটা বস্তু আছে, যা সময়-সময় ঝালিয়ে নিতে হয়।

নারিন রহস্য: ত্রিনিদাদের স্পিনারকে প্রথম ম্যাচে পাচ্ছে না কেকেআর। তবে গম্ভীর বলে গেলেন, দ্বিতীয় ম্যাচ থেকে সুনীল নারিন থাকবেন। থাকবেন, নিজের সেরা ছন্দে। আইসিসির নজরদারির জুজু নাকি তাঁর বোলিংয়ের বিষ কমিয়ে দিচ্ছিল। এ বার সেই ভূত তাড়িয়ে দেখা যাবে নতুন নারিনকে। আর আন্দ্রে রাসেল? এ দিন টিমের সঙ্গে প্র্যাকটিস করেননি, রাতে ঢুকছেন। টিমের বক্তব্য, রবিবার আছেন।

দ্রাবিড়-দর্শন: কোচ হিসেবে রাহুল দ্রাবিড়ের সিভি ইতিমধ্যেই ঈর্ষণীয়। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালস টিমটা প্রায় নিজে হাতে গড়ে তোলা, তার পর জাতীয় যুব দলকে বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যাওয়া। দ্রাবিড়ীয় দর্শন এ বার দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠবে কি না, সময় বলবে। আপাতত দ্রাবিড়কে দেখা গেল ব্যস্ত কোচের ভূমিকায়। কখনও ব্রেথওয়েটকে টানা থ্রো-ডাউন করিয়ে যাচ্ছেন তো পরক্ষণে টিম হাডলে পেপ টক দিচ্ছেন। ইডেন দ্রাবিড়কে অনেক কিছু দিয়েছে। স্টিভের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৮০ কে ভুলেছে? আইপিএলের বিদায়ী ম্যাচও তাঁর এখানে। রবিবারের ইডেনও কি প্রিয় কর্নাটকীকে আশীর্বাদ করবে?

বেলিস কে, কে বেলিস: কেকেআরকে দু’বার ট্রফি জেতানো কোচ ট্রেভর বেলিস এ বার নেই। তাঁকে কতটা মিস করবেন আপনারা? তেড়েফুঁড়ে উঠে গম্ভীরের স্টেপ আউট, ‘‘এক লাইনে উত্তরটা দিচ্ছি। একটা সফল টিমের জন্যই কিন্তু সফল কোচ তৈরি হয়। ড্রেসিংরুমে যারা আছে, তাদের জোরে টিম জেতে। কোচের জন্য নয়।’’ মর্মার্থ— বেলিস আপনার সার্ভিসের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু কেকেআরে প্লেয়ার ছাড়া কেউ অপরিহার্য নয়।

ফ্যান হো গয়া: ক্রিকেটারের লোকে ফ্যান হয়। কিন্তু ক্রিকেটারই যদি লোকের ফ্যান হন? কেকেআর অধিনায়কের সঙ্গে তো ‘ফ্যান’ কিংগ খানের কোনও তফাত পাওয়া গেল না। এই যে দশ মাস পর কলকাতায় আসেন গম্ভীর, শহরের যে জিনিসটা ফিরে পেতে তাঁর সবচেয়ে ভাল লাগে তা হল—ক্যালকাটা ফ্যানস। যাঁদের তিনি সবচেয়ে ভালবাসেন। যাঁদের মধ্যে ফিরতে তাঁর সবচেয়ে ভাল লাগে। কৃতজ্ঞতাবোধ জন্মায় আপনাআপনি কারণ খারাপ করলেও কলকাতা কখনও তাঁদের ছুড়ে ফেলে দেয় না।

সব মিলিয়ে ট্রেলার জমজমাট। রবিবারের ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো কেমন হয়, এখন তার অপেক্ষা। আজ জিতবেন কে? গম্ভীর না ব্রেথওয়েট? কালিস না দ্রাবিড়?

ইডেন বক্স অফিস খুলছে রাত আটটায়।

 

আজ আইপিএলে

কলকাতা নাইট রাইডার্স : দিল্লি ডেয়ারডেভিলস (ইডেন, ৮-০০)