হুগলি জেলায় নিয়মিত লিগের খেলা হয়। তিনটি মহকুমা শ্রীরামপুর, বলাগড় ও আরামবাগ মিলিয়ে ১৩০টি-র বেশি ক্লাব রয়েছে। একটা সময় এই জেলা থেকেই সুধীর কর্মকার, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, শিশির ঘোষ, তনুময় বসু, স্বরূপ দাস-সহ একাধিক তারকা ভারতীয় দলে খেলেছেন। এই মুহূর্তে জাতীয় দলে রয়েছেন প্রীতম কোটাল, নারায়ণ দাস। কিন্তু সাম্প্রতিক ছবিটা একেবারেই আশা জাগানোর মতো নয়। গত বছর অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে ভারতীয় দলে হুগলির একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন অভিজিৎ সরকার।

হুগলি থেকে কেন সে ভাবে প্রতিশ্রুতিমান ফুটবলার উঠে আসছে না? প্রাক্তন তারকা শিশির ঘোষ কাঠগড়ায় তুলছেন হুগলি জেলা ক্রীড়া সংস্থাকেই। তাঁর অভিযোগ, ‘‘হুগলি জেলা লিগ যে ভাবে চলছে, তাতে ফুটবলার উঠে আসা সম্ভব নয়।’’ কেন? মোহনবাগানের প্রাক্তন অধিনায়ক বললেন, ‘‘ক্লাবগুলো এখন ম্যাচ জেতার জন্য অন্য জেলা থেকে ভাল ফুটবলার নিয়ে আসছে। এর ফলে স্থানীয় ছেলেরা খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। তাই নতুন ফুটবলারও উঠছে না।’’ তিনি যোগ করলেন, ‘‘আমরা যখন খেলতাম, তখনও কিছু ক্লাব গোপনে অন্য জেলা থেকে ফুটবলার নিয়ে এসে খেলাত। এখন তো প্রকাশ্যেই সব কিছু চলছে। কারণ, বছর দশেক আগে জেলা ক্রীড়া সংস্থা লিয়েন চালু করেছে। ফলে বাইরের ফুটবলার খেলানোটা বৈধ হয়ে গিয়েছে।’’ 

হুগলি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি তনুময় বসু জাতীয় দলের প্রাক্তন গোলরক্ষক। শিশিরের প্রাক্তন সতীর্থও তিনি। তনুময় অবশ্য দাবি করলেন, ‘‘লিয়েনে ফুটবলার খেলানোর নিয়ম আমরা চালু করেছি বছর তিনেক আগে। কারণ, জেলা লিগের জনপ্রিয়তা তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল। লিগের আকর্ষণ ফেরাতেই আমরা লিয়েন চালু করেছিলাম। প্রথম বছর ছয় জন ফুটবলার নিতে পারত ক্লাবগুলো। পরের বছর তা কমে পাঁচ জন হয়েছে। এ বছর চার জন ফুটবলার লিয়েনে নিয়েছে ক্লাবগুলো। এর ফলে লিগের আকর্ষণও বেড়েছে।’’ জেলার লিগের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য লিয়েন চালু করাকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন শিশির। তাঁর কথায়, ‘‘যে ক্লাবের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তারা লিয়েনে ফুটবলার এনে ম্যাচ জিতছে। তাতে কী লাভ? জেলার প্রতিশ্রুতিমান ছেলেরা খেলার সুযোগ না পেয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। আমার মতে এই মুহূর্তে লিয়েন তুলে দেওয়া উচিত। জেলা ক্রীড়া সংস্থার উচিত ক্লাবকর্তাদের বলা— স্থানীয় ফুটবলারদের নিয়েই দল গড়তে হবে। বাইরে থেকে কাউকে আনা চলবে না।’’ 

তনুময় দাবি করলেন, ধীরে ধীরে লিয়েন প্রথা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। বললেন, ‘‘অধিকাংশ অভিভাবকই চান না যে তাঁদের ছেলে ফুটবল খেলুক। ফলে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তা পূরণ করতেই লিয়েন চালু করা হয়েছিল। আশা করছি, পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই জেলা থেকে অনেক ফুটবলার উঠে আসবে। তখন আমরা লিয়েন প্রথা তুলে দেব।’’ শিশিরের মতে অভিভাবকদের শুধু দায়ী করা ঠিক নয়। বললেন, ‘‘অশ্বিনীকুমার বরাট, দীপু গড়গড়ি, মুরারি শূরের মতো জহুরিরা ফুটবলার তুলে আনতেন। ওঁদের অভাব পূরণ করার মতো কেউ নেই।’’ প্রাক্তন সতীর্থের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন তনুময়।  তাঁর অভিযোগ, ‘‘জেলার তারকা ফুটবলারেরা নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ দিতে একেবারেই আগ্রহী নন।’’ তিনি যোগ করলেন, ‘‘শিশির জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যকরী সমিতির সদস্য। অথচ সময়ের অভাবে ও কোনও বৈঠক বা মাঠে আসে না।’’ 

শুধু লিয়েন প্রথা নয়, শিশির সরব জেলা লিগে ম্যাচ গড়াপেটা নিয়েও। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, ‘‘প্রচুর ম্যাচ গড়াপেটা হচ্ছে বলেই আকর্ষণ হারাচ্ছে লিগ। কোনও ফুটবলপ্রেমীই আগে থেকে ফলাফল ঠিক হয়ে যাওয়া ম্যাচ দেখতে চান না।’’ ম্যাচ গড়াপেটা যে হয়, স্বীকার করে নিলেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি। হতাশ তনুময় বললেন, ‘‘ক্লাবগুলো যদি গড়াপেটা করে, তা আমাদের পক্ষে প্রমাণ করা কঠিন।’’