ফেডারেশনের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে ১২৭ বছর পেরোনো ঐতিহ্যবাহী মোহনবাগানে যখন অস্তিত্বের সঙ্কট, তখনই প্রেসিডেন্ট পদ থেকে হঠাৎ-ই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন স্বপনসাধন (টুটু) বসু।

মঙ্গলবার বিকেলে ‘বন্ধু’ সচিব অঞ্জন মিত্রকে পাঠানো ইস্তফার চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘‘আপনি জানেন বহু দিন ধরেই আমি অসুস্থ। এই অবস্থায় আমি আর প্রেসিডেন্টের চেয়ারে থাকতে চাই না। অত্যন্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত হলেও এটা আমাকে নিতেই হচ্ছে।’’

আর এই কয়েক লাইনের চিঠি প্রকাশ্যে আসার পরই সবুজ-মেরুন শিবিরে উঠেছে ঝড়। বইতে শুরু করেছে আশঙ্কার চোরাস্রোতও। ঝড় ওঠার কারণ, গত তিন বছরের স্পনসরবিহীন মোহনবাগানকে টিম গড়তে টুটু প্রায় চল্লিশ কোটি টাকা   দিয়েছেন। এ বার সেই দায়িত্ব নেবেন কে? আর আশঙ্কা এই জন্যই যে, নতুন মরসুমের জন্য দলগঠনের সময় এখন। স্পনসরহীন ক্লাবে ফুটবলারদের বকেয়া এবং পরের মরসুমের চুক্তির টাকা দেবে কে?

 কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, ক্লাবের এই দুঃসময়ে টুটুর মতো মোহনবাগানী হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? চিঠির বাইরে টুটু বলে দিচ্ছেন, ‘‘দিল্লি, মুম্বই বা কলকাতায় আইএসএল বা আই লিগ নিয়ে এত সভা হচ্ছে, আমি যেতে পারছি না। সেটা যন্ত্রণা দিচ্ছে। দায়িত্ব না পালন করতে পারলে পদে থাকা ঠিক নয়। হুইল চেয়ার নিয়ে আমি ক্লাবে যেতে চাই না। অন্যরা এসে হাল ধরুক।’’

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ক্রিকেট এখন সকলের স্বপ্ন

 বছর তিনেক আগে এক বার মোহনবাগানের ব্যর্থতার জেরে অন্য তিন শীর্ষ কর্তার সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন টুটু। কিন্তু পরে আবার ফিরেও এসেছিলেন। এ বার অবশ্য সে রকম হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে। সচিব এবং প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রায় সাতাশ বছর ধরে মোহনবাগানের সঙ্গে যুক্ত টুটু।  ক্লাবের কোনও সিদ্ধান্ত তাঁকে ছাড়া হতো না। তিন সপ্তাহ আগেও তাঁকে দেখা গিয়েছে ফেডারেশন কাপ ফাইনালের আগের সকালে অনুশীলনে এসে ফুটবলারদের উৎসাহ দিতে। টুটুবাবুর ‘অসুস্থতার জন্য সরে যাচ্ছি’ ব্যাখ্যা  দেওয়ার পরও তাই জল্পনা থামছে না। মোহনবাগান ক্লাবের অভ্যন্তরীন রাজনীতির যা খবর, তাতে অবশ্য অন্য ইঙ্গিত মিলছে।

প্রয়াত সচিব ধীরেন দে-কে সরিয়ে ১৯৮৯-তে মোহনবাগানে ক্লাবে একসঙ্গে ক্ষমতায় এসেছিলেন দুই ‘বন্ধু’ টুটু এবং বর্তমান সচিব অঞ্জন মিত্র। অঞ্জনও অনেকদিন ধরে অসুস্থ। তিনিও ক্লাবে নিয়মিত আসতে পারেন না। যেতে পারেন না সভায়। ইদানিং নানা বিষয় নিয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে মত পার্থক্য বাড়ছিল। ক্লাব সূত্রের খবর, টুটু ছাড়াও নানা মহল থেকে চাপ সৃষ্টি হলেও অঞ্জন সচিব পদ ছাড়েননি। টুটুর পদত্যাগের পর অঞ্জন সরে দাঁড়ান কিনা সেটাই দেখার? অঞ্জন অবশ্য এ দিন ফোন ধরেননি। টুটুর পদত্যাগ নিয়ে তাঁর মন্তব্য তাই পাওয়া যায়নি। তবে ক্লাবের এক প্রভাবশালী কর্তা বললেন, ‘‘প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করেছেন। এ বার টিম গড়া এবং টাকা তোলার দায়িত্ব সচিব এবং অন্য কর্তাদের। তাঁরা এ বার দায়িত্ব নিক। না হলে সরে যাক।’’ সেই কর্তাটির আরও মন্তব্য, ‘‘দেখুন না কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।’’ জানা গিয়েছে, গতবার টিম গড়ার টাকা দিলেও এ বার আর সে ভাবে সাহায্য করতে রাজি নন টুটু। সরকারিভাবে মোহনবাগানের ক্লাব নির্বাচন সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা। ক্লাবের নিয়মানুযায়ী কর্মসমিতি নির্বাচনের পর বিজয়ীরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন। ফলে এখন টুটুর ছেড়ে যাওয়া পদ ফাঁকা থাকলেও সমস্যা নেই। কিন্তু এটা ঘটনা যে, টুটুর পদত্যাগে গঙ্গাপাড়ের ক্লাবে সঙ্কট তীব্রতর হল। নতুন মরসুমের দলগঠনের সময় বেকায়দায় বাগান।