• রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

শ্রীলঙ্কা সিরিজ শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে বিস্ফোরণ

আমার নাম বিরাট বলে কি ব্যর্থ হতে পারি না

2
রবির আঁচে কোহলি। কটকে শনিবার। ছবি: পিটিআই

Advertisement

বিরাট কোহলির এখন আর এক চর্বিতচর্বণ শুনতে ভাল লাগে না। রোজ কাগজে এখন তাঁর ব্যর্থতার কাহিনি, নেট সেশনে ক্যামেরার ওঁত পেতে থাকা কখন উড়বে স্টাম্প, শাটারেও চাপ পড়বে তখন। মাঝে মাঝে বিরাট ধরতে পারেন না, কেন দেশজ মিডিয়া বোঝে না আর পাঁচ জন সাধারণের মতো তিনিও রক্তমাংসের মানুষ। জীবন যতটা তাঁর জন্য সাফল্য বরাদ্দ রাখে, ততটা ব্যর্থতাও।

 বিরাট কোহলি প্রশ্নগুলো শুনতে শুনতে এখন ক্লান্তও হয়ে পড়েন। বিগত চার মাস যে তাঁর ক্রিকেটজীবনের নিঃসন্দেহে সবচেয়ে দুর্বিষহ সময় ছিল, বুঝতে পারেন বিরাট। যখন ফর্ম বন্ধুত্ব ছেড়েছে, ইংরেজ পেসারকুল নিরলস অপেক্ষা করেছে অফস্টাম্পের বাইরে তাঁর একটা খোঁচার। ভারত শুধু নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটমহল নামজাদা সব বিশেষজ্ঞদের টেবলে বসিয়ে বিতর্কসভা চালিয়েছে তাঁর টেকনিকের ত্রুটি নিয়ে। কেউ ভাবেনি যে টেকনিক নিয়ে এত প্রশ্ন, সেই একই টেকনিক তাঁকে পরের পর সেঞ্চুরি দিয়েছে একটা সময়।

বিরাট কোহলি এখন জানেন যে, তাঁর মাথায় অধিনায়কের মুকুট মানে অবধারিত আসবে এশিয়া কাপ। সংক্ষেপে বললে, অধিনায়কত্বের ব্যর্থতা। জানেন যে, দেশের মাঠে তিনটে ওয়ান ডে ম্যাচে ক্যাপ্টেন্সি করতে নামলেও লোকে তুলনায় টেনে আনবে কোনও এক এমএসডি-কে। কেউ জানতেও চাইবে না, তাঁর অধিনায়কত্বের দর্শন কী? কেউ এটাও জানতে চাইবে না যে, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ধুরন্ধর এমএসডি-র ক্যাপ্টেন্সি থেকে ঠিক কোন জিনিসগুলো ধরার চেষ্টা করেন তিনি?

বিরাট কোহলি এত দিন সমালোচকদের বলতে দিয়েছেন। নিরন্তর রক্তাক্ত হয়েও তাঁর দিকটা কাউকে শোনাতে যাননি।

বিরাট কোহলি আজ ‘বদলা’-টা নিলেন। নিজের দিকটা বলে, সমালোচকদের আজকের মতো চুপ করিয়ে, পাল্টা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে। যা দেখে যে কোনও ক্রিকেট সাংবাদিকের মনে হবে, রবিবাসরীয় কলিঙ্গ-যুদ্ধে ভারতের বর্তমান ব্যাটিং-সম্রাটের প্রতিপক্ষ মোটেও শ্রীলঙ্কা নয়। জয়বর্ধনে-সঙ্গকারার যুগলবন্দি বা অ্যাঞ্জেলো ম্যাথেউজের মস্তিষ্ক কোনওটা নয়। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যুদ্ধটা অনেক বেশি কোহলি বনাম তাঁর কুখ্যাত সমালোচকের টিম, যার নাম ভারতীয় মিডিয়া। যারা এত দিন পরের পর ‘লাভ গেম’ কোহলিকে উপহার দেওয়ার পর আজ এসে স্ট্রেট সেটে উড়ে গেল!

“শুনুন, যে টেকনিকে পঁচিশটা সেঞ্চুরি এসেছে, সেই টেকনিকে কী পাল্টানো উচিত আমি জানি না!”

“আমি বিরাট কোহলি বলে কি ব্যর্থ হতে পারি না? আমাকে কি প্রত্যেক ম্যাচেই রান করে যেতে হবে?”

“কী বললেন, কী নিয়ে খাটছি? ফিটনেস, ফিটনেস। টেকনিক একদমই নয়।”

“যার যা ইচ্ছে বলুক। কিছু নিয়ে তো লোককে বলতে হবে। আমি জানি সেটা। তাই পাত্তা দিই না।”

শনিবার দুপুরে একটা সময় পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রীর আবির্ভাব এবং তাঁকে কেন্দ্র করে টিম কোহলির মধ্যে ‘প্রাণপ্রতিষ্ঠা’-র ছবিই একমাত্র বলার মতো ঘটনা। কারণ প্রতিপক্ষ নিয়ে বলার মতো কিছু পড়ে নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ ছেড়ে মাঝপথে দেশে ফিরে গেলে কী হবে, তারাও দু’একটা হুমকি দিয়েছে। সেখানে ম্যাথেউজের শ্রীলঙ্কা?

টিমটা এখনও গজগজ করছে ইংল্যান্ড সফর নিয়ে খাটাখাটনির মধ্যে থেকে দুম করে তুলে এনে ভারতে ছেড়ে দেওয়ায়। ভারতে পা দেওয়ার সময় থেকে টিমের কেউ না কেউ বলে যাচ্ছেন, কোনও প্রত্যাশা না রাখতে। অধিনায়ক ম্যাথেউজের কাছে আবার সফরের উদ্দেশ্যটাই পরিষ্কার নয়! মালিঙ্গার চোট আছে বলে আসেননি। কিন্তু বাঁ হাতি স্পিনার রঙ্গনা হেরাথ? তাঁর শোনা গেল সবই ঠিক ছিল। কিন্তু অদ্ভুত কারণে আনা হয়নি। জুনিয়রদের নাকি সুযোগ দিতে হবে! কটকে লঙ্কা সংসারের সারমর্ম: সিরিজ থেকে খুব বেশি হলে আত্মবিশ্বাস পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু উল্টোপাল্টা কিছু হলে টিমের ইন্টেন্সিটি লেভেলের সাড়ে বারোটাও বাজবে! বলে দেওয়া হচ্ছে, যে টিম প্রায় দু’মাস নেট সেশনের বাইরে ছিল, স্রেফ ফিটনেস ট্রেনিং করে কাটিয়েছে, তাদের পক্ষে সাত দিনের প্র্যাকটিসে অবিশ্বাস্য কিছু ঘটিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এবং সবই বলা হচ্ছে, মাহেলা-সঙ্গকারার মতো দুই মহারথীর উপস্থিতি সত্ত্বেও। 

প্রতিপক্ষের এই অবস্থায় শাস্ত্রীয় ক্লাসে বিরাটের ঢুকে পড়াকে উল্লেখ্য মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিরাট অন্তত এটা পরিষ্কার করে দিচ্ছিলেন, ভারতীয় ড্রেসিংরুমে এখন আসল ‘বস’ কে? পিচ দেখতে গেলেন, সঙ্গে শাস্ত্রী। শ্যাডো করলেন, সামনে শাস্ত্রী। ডানকান ফ্লেচার বলে কাউকে তো খুঁজে পাওয়া গেল না! তখনও বোঝা যায়নি, কিছুক্ষণের মধ্যে মিডিয়াকেও ‘অ্যানাইহিলিনে’র মুখে ছেড়ে দেবেন!

কী কুক্ষণে বিরাটকে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ধর্মশালার সেঞ্চুরির পর আত্মবিশ্বাসটা ঠিকঠাক ফেরত এল কি না। টিম ইন্ডিয়ার মিডিয়া ম্যানেজার ডক্টর বাবা আটকাতে গেলেন, কিন্তু লাভ হল না। “না, আমাকে বলতে দিন। আমি উত্তরটা দেব।” এবং সাংবাদিকের দিকে তাকিয়ে বাকিটা, ‘‘যে আত্মবিশ্বাস আগে ছিল, সেটাই এখন আছে ভাই। বেড়েছে না কমেছে, ঠিক বলতে পারব না। আমি জানি না আমার খারাপ সময়কে নিয়ে এত লম্ফঝম্ফ কেন করছেন আপনারা? কিছু সমস্যা হয়েছিল। সেগুলো শুধরোনোর চেষ্টাও করেছি। কিন্তু নিজের ব্যাটিংকে পাল্টে ফেলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” এশিয়া কাপকে তুলে ‘আপনি আবার অধিনায়ক’ বলে খোঁচা দেওয়ার চেষ্টা হল এবং সেকেন্ডে সেটা ব্যর্থ, “হ্যাঁ। এশিয়া কাপ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আমি আবার ক্যাপ্টেন্সিটা খুব এনজয় করি। বিশেষ করে টিমে যখন অভিজ্ঞতা কম থাকে, তখন। ক্যাপ্টেন্সি দিয়ে আমি নিজে নিজেকে পরীক্ষায় ফেলি আসলে। আর হ্যাঁ, ধোনির থেকে আমি অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করি। কোনও পরিস্থিতিতে ও কোনও একটা মুভ নিলে গিয়ে আমি জিজ্ঞেস করি, কেন এটা করলে? বোঝাও আমাকে।”

সমবেত নৈঃশব্দ।

এবং ম্যাথেউজ না পেলেও ভারত অধিনায়ক আসন্ন সিরিজে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে পাচ্ছেন। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সিরিজ থেকে তিন-চার জন নতুনকে পাওয়া যাবে যারা শেষ পর্যন্ত যাবে বিশ্বকাপ খেলতে। সঠিক কম্বিনেশনটা এখন থেকে বার করা গেলে বিদেশে বিশ্বকাপে অসুবিধে হবে না। তরুণ টিম কোনও ফ্যাক্টরই হবে না তখন।

বছর বারো আগে বেহালার কেউ একজন তো একই কাজ করে দেখিয়েছিলেন!

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন