• গৌতম ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পাঁচ তিরে কলকাতা বৈঠক নিঃসঙ্গ করে গেল শ্রীনিকে

Bharat Raman
ভরত রামন: তোপের মুখে শ্রীনির দূত। রবিবার। ছবি: শঙ্কর নাগ দাস।

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠমহলের খবর অনুযায়ী, তিনি হতে চেয়েছিলেন ভারতীয় কোচ! ঘটনাচক্রে হয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় কোচের অন্যতম নিয়োগকারী! সৌরভ সহ তিন সদস্যের ক্রিকেট পরামর্শদাতা প্যানেল বোর্ড চূড়ান্ত করবে আগামী সপ্তাহখানেকের মধ্যে। সেই নতুন পরামর্শদাতা কমিটিই ঠিক করবে ভারতীয় কোচ কে হবেন? দেশের সামগ্রিক ক্রিকেটনীতিও বা কী হবে? এই কমিটিতে সৌরভের সঙ্গে থাকার সম্ভাবনা যে সচিন এবং রাহুলের, রোববারের আনন্দবাজারেই সেই খবর বেরিয়েছে। কিন্তু তিনি সচিন তেন্ডুলকর— কোনও কিছুতেই এত সহজে ঢুকে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি বোর্ডের কাছ থেকে প্রস্তাবটা লিখিত ভাবে চান। পুরো ব্যাপারটা ভাল করে বুঝতে চান। দেখতে চান। পরামর্শদাতা কমিটির কাজকর্মের পরিধি কী, সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খ জেনে তবেই ঢুকবেন। ধরে নেওয়া যায় আগামী কয়েক দিনে বোর্ড সচিব অনুরাগ ঠাকুর লিখিত ভাবে সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।

সৌরভ ভারতীয় কোচ হতে পারেন খবর রটে যাওয়ায় এরই মধ্যে টেস্ট দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলিকে আগ বাড়িয়ে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে ফেলেন, হলে কেমন হয়? কোহলি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল রবি শাস্ত্রী সম্পর্কে। তবু জনশ্রুতি হল, জবাবে নাকি বলেছেন, ‘‘দাদা হলেও ভালই হয়।’’

ভারতীয় ক্রিকেটমহলে অনেকের ধারণা সৌরভ কোচ/টিম ডিরেক্টর হলে ২০১৬-র টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতীয় অভিযান বাড়তি গতি পেতে পারে। কোচ হিসেবে তিনি অবশ্যই যোগ্য। কিন্তু বঙ্গজ ক্রিকেট-সমাজের বাইরে বোর্ডের প্রভাবশালী মস্তিষ্করা সৌরভকে কোচ নন, বৃহত্তর প্রশাসনিক ভূমিকায় দেখতে চান।

এঁদের অগ্রগণ্য শশাঙ্ক মনোহর। রবিবাসরীয় দুপুরে যিনি বলছিলেন, ‘‘আরে, কোচ তো বোর্ডের বেতনভুক কর্মচারী। বোর্ড সদস্যরা পদে পদে তার কাছে জবাব চাইতে পারে। যে কেন অমুকটা হল না, কেন তমুকটা হল না। সৌরভের মধ্যে যে প্রশাসনিক সম্ভাবনা, তাতে কোন দুঃখে ও নিজেকে এই অবস্থায় নিয়ে ফেলবে। ওর বরঞ্চ জবাব দেওয়া নয়, জবাব চাইবার অবস্থায় থাকা উচিত।’’ জনশ্রুতি, শশাঙ্ক নাকি সৌরভকে সেটা বুঝিয়েওছেন। বোর্ডের আরও কোনও কোনও কর্তাও মনে করেন, পূর্বাঞ্চল থেকে ভবিষ্যতে বোর্ড সচিব হওয়ার পর্যাপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে সৌরভের মধ্যে। আজ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে কোনও ক্রিকেটার সচিব হননি। প্রেসিডেন্টও না। বোর্ড কর্তাদের মতে, সৌরভের বরঞ্চ এই চ্যালেঞ্জটা নেওয়া উচিত।

রোববারের সভা অবশ্য আনুষ্ঠানিক ভাবে সৌরভ এবং তাঁর বন্ধুদের নাম ঘোষণা করেনি। আলগা কতগুলো নাম উঠেছিল কপিল, সচিন, দ্রাবিড়, সৌরভ। তার পর ঠিক হয় এ ভাবে আলগা নাম না বলে প্যানেলটা প্রেসিডেন্ট আর সচিবই চূড়ান্ত করবেন।

শ্রীনি-বিহীন রোববারের বোর্ড বৈঠকে অবশ্য সৌরভরা কেউ নন। কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন সেই একমেবদ্বিতীয়ম নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসন। অদ্ভুত পরিবেশের মধ্যে শুরু হল জগমোহন ডালমিয়ার নতুন বোর্ডের অধীনে প্রথম ওয়ার্কিং কমিটি সভা। দুপুর পৌনে একটা নাগাদ অতর্কিত ভূমিকম্প আর কাছাকাছি সময়ে ঢিলছোড়া দূরত্বে নিউ এম্পায়ারের কাছে দাউদাউ করে আগুন। সভাতেও কি সে রকম কিছু ঘটবে? রিখটার স্কেল উঠে যাবে সাতের উপর? নাকি দেখা দেবে দাউদাউ করা আগুন? পরে দেখা গেল, সভায় দু’টোর কোনওটাই ঘটেনি। ঘটল দু’টোর মাঝামাঝি কিছু। ভারতীয় ক্রিকেটের মালিকানা শ্রীনিবাসনের থেকে নতুন জমানায় যেন কতকটা নিঃশব্দেই আনুষ্ঠানিক ভাবে স্থানান্তরিত হয়ে গেল।

সভা শুরুর আগে দেখা গেল গ্র্যান্ড হোটেলের সুইমিং পুলের ধারে মনোহর-পত্নী বর্ষাকে নানান কিছু বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন আইপিএল সিওও সুন্দর রামন। আবার সভা শেষের ঘণ্টাদেড়েক  বাদেও শশাঙ্ক মনোহরের চার তলার ঘরে সেই সুন্দর। শ্রীনির দূত হিসেবে যিনি সম্যক পরিচিত। এই দু’টো মিলেজুলেই রোববারের বিপন্ন শ্রীনি।

মনোহরের ঘর থেকে যখন সুন্দর বেরোচ্ছেনই না, তখন একই ফ্লোরে তিনটে ঘর ওপাশে পশ্চিমাঞ্চলের জনাকয়েক ক্রিকেট কর্তা আক্ষেপ করছিলেন, জগমোহন ডালমিয়া যদি দশ বছর আগের মেজাজে থাকতেন তা হলে আজকের সভা অনেক আক্রমণাত্মক চেহারা পেত। তবু প্রবল প্রতাপান্বিত শ্রীনি যে বোর্ডমহলে ক্রমশ নির্জনতার অন্ধকারে ঢুকে যাচ্ছেন তা এ দিনের সভায় বারবার ধরা পড়েছে।

সিএসকের শেয়ার ট্রান্সফার অনুমোদন করেনি ওয়ার্কিং কমিটি। বরং তীব্র ধিক্কার জানিয়েছে।

শেয়ার ট্রান্সফার পদ্ধতিকে পরিষ্কার প্রতারণা আর ধাপ্পাবাজি আখ্যা দিয়েছে।

শেয়ার ট্রান্সফার ও বিক্রয় মূল্যের সর্বসম্মত পদ্ধতি নেওয়ার জন্য নতুন আইনি পরামর্শ নেবে ঠিক করেছে।

কোষাধ্যক্ষ অনিরুদ্ধ চৌধুরিকে বলে দেওয়া হয়েছে তাঁর অফিস চেন্নাই থেকে মুম্বই সরিয়ে আনতে হবে। সব কিছু চেন্নাইয়ে হবে কেন? বোর্ডে শ্রীনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনিরুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ কমিটির মনোনয়নে বোর্ড প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারির সঙ্গে একই প্যানেলে থাকতে চেয়েছিলেন। যেমন ফিনান্স। যেমন আইনি। যেমন ক্রিকেটারদের কমিটি গড়া। অথচ দু’বার অনুরোধ করেও এ দিনের সভার কাছে তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। কোষাধ্যক্ষর এমন প্রত্যাখ্যান অভূতপূর্ব।

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরেও ইন্ডিয়া সিমেন্টসের সঙ্গে যুক্ত সতীশ লজিস্টিকস ম্যানেজার হিসেবে কী ভাবে ভারতীয় দলের সঙ্গে বিশ্বকাপে থাকলেন, তা নিয়েও সভায় তীব্র অসন্তোষ ব্যক্ত হয়েছে। ঠিক হয়েছে এ নিয়ে অবিলম্বে অনুসন্ধান হবে।

সভার এক নম্বর টিআরপি অবশ্য ছিল টিএনসিএ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভরত রামনের সঙ্গে সভার আমন্ত্রিত সদস্য শশাঙ্ক মনোহরের তীব্র বাদানুবাদ। যা বিতর্কসভার চেহারা এনে দিয়েছিল এবং যা পৌনে এক ঘণ্টারও বেশি চলে।

টিএনসিএ ভাইস প্রেসিডেন্ট রামন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন অ্যাডভোকেট জেনারেল ছিলেন। তিনি এ দিন আনন্দবাজারকে বললেন, ‘‘জোর জবরদস্তি আর মিথ্যে প্রচার হচ্ছে আমাদের ব্যাপারে। বোর্ডের আইনে আছে যদি নিজস্ব গ্রুপ অব কোম্পানিজের মধ্যে শেয়ার ট্রান্সফার করা হয়, তা হলে শেয়ার ক্যাপিটালের ফেস-ভ্যালুর পাঁচ শতাংশ টাকা বোর্ডকে দিলেই চলে।’’ রামন দাবি করলেন, ‘‘সিএসকের শেয়ার ক্যাপিটালের ফেস-ভ্যালু হল পাঁচ লক্ষ টাকা। সিএসকের বিক্রয়মূল্য কোন দুঃখে পাঁচ লাখ হতে যাবে? আমরা তেমন কথা বলিইনি। মিডিয়া না বুঝেই অনর্থক এটা নিয়ে হইচই করছে। এর আগে ডেকান ক্রনিক্যালও একই পদ্ধতিতে  মালিকানা ট্রান্সফার করেছিল। সেটা যদি অবৈধ না হয়, তা হলে এটা কেন?’’ যা শুনে রাতে আবার গর্জে উঠলেন শশাঙ্ক মনোহর। বললেন, ‘‘একদম মিথ্যে কথা বলছে। ডেকান ক্রনিক্যালের শেয়ার ট্রান্সফারের সময় এক টাকাও ট্রান্সফার ফি বোর্ডকে দেওয়া হয়নি। কারণ ওটা অভ্যন্তরীণ ট্রান্সফার ছিল। এরা তা হলে পঁচিশ হাজার টাকা দিতে রাজি হল কেন?’’ শশাঙ্কের দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘‘যদি শেয়ার নিজের গোষ্ঠীর মধ্যেই ট্রান্সফার করে, তা হলে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছিল শ্রীনিকে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেটা আর হল কোথায়? এ তো শ্রীনির শেয়ার শ্রীনির কাছেই থাকল।’’

রোববার রাতে হোটেল থেকে চেকআউট করার সময় সেই মন্তব্যে তীব্র সমর্থন জানিয়ে গেলেন মুম্বই ক্রিকেট সংস্থার রবি সবন্ত। এক সময় ইনি শ্রীনিবাসনের নর্মসহচর ছিলেন। সবন্ত বললেন, ‘‘শ্রীনির দু’কুলেই সমস্যা। যদি বলেন নিজের লোককে শেয়ার দিচ্ছি, তা হলে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট সেই থেকেই গেল। শ্রীনি আর বোর্ডে ফিরতে পারবে না। আর যদি বলে নিজের লোককে ট্রান্সফার করিনি তা হলে লোকে বলবে সেলিং প্রাইসের পাঁচ শতাংশ দিলে না কেন? কীসের শেয়ার ক্যাপিটালের গল্প ফাঁদছ?’’

শ্রীনি জমানা যে তীব্র ভাবে আক্রান্ত। একেবারে খাদের পাশে যে দাঁড়িয়ে সেটা কিন্তু কলকাতার বৈঠক বুঝিয়ে দিয়ে গেল।

ভূমিকম্প না ঘটিয়ে। আগুন না লাগিয়েও। 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন