তিরিশ দিন আগে তাঁর সদ্যোজাত কন্যাসন্তানের এক মাস পূর্ণ হয়েছিল। সে দিন জর্জ টেলিগ্রাফের বিরুদ্ধে গোল করে মোহনবাগানকে তিন পয়েন্ট এনে দিয়েছিলেন সেই দিপান্দা ডিকা। যে গোল তিনি উৎসর্গ করেছিলেন নিজের কন্যা ‘ফ্রান্স’কে।

এক মাস পরে মোহনবাগানের সেই ডিকা বুধবার কাস্টমসের বিরুদ্ধে গোল না করলেও, আট বছর পরে কলকাতা লিগ এনে দিয়েছেন সবুজ-মেরুন শিবিরে। যে দিন ডিকা-কন্যা পূর্ণ করল দুই মাস। মোহনবাগানের নয় নম্বর জার্সিধারী তাই এই সাফল্য সমর্থকদের সঙ্গে উৎসর্গ করছেন তাঁর কন্যাকেও। বলছেন, ‘‘আমার প্রিয় দল এ বার বিশ্বকাপ জেতায় সদ্যোজাত মেয়ের নাম রেখেছিলাম ফ্রান্স। আজ আমার মেয়ের দু’মাস পূর্ণ হল। সেই দিনেই লিগ পেলাম আমরা। এত দিন ভারতের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলে সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেও চ্যাম্পিয়ন কখনও হইনি। এই সাফল্য মোহনবাগান সমর্থকদের সঙ্গে উৎসর্গ করছি আমার মেয়েকেও।’’

মোহনবাগান ড্রেসিংরুমের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ডিকা যখন এ কথা বলছেন, তখন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর সতীর্থ হেনরি কিসেক্কা। এ দিন যাঁর জোড়া গোলে জেতার পরে লিগের রং হয়ে গিয়েছে সবুজ-মেরুন। মোহনবাগান সমর্থকরা বলছেন, ডিকা-হেনরি জুটিই আট বছর পর ঘরোয়া লিগ জয়ের কাণ্ডারি।

কলকাতা লিগে এ বার মোহনবাগান এখনও পর্যন্ত গোল করেছে ২৫টি। যার মধ্যে ১৬ টি গোলই করেছেন এই দুই আফ্রিকার ফুটবলার। ডিকার গোল দশটি। হেনরি ছ’টি। দু’জনেই আক্রমণ গড়া ও গোল করা এই দুই কাজেই দক্ষ। বিপক্ষের রক্ষণে সব সময় একে অপরকে সাহায়্য করতে কাছাকাছি থাকেন। ক্রস থেকে গোল করতে দক্ষ। কোনাকুনি দৌড়ে ঢুকে পড়েন বিপক্ষ রক্ষণে। বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট কিংবা বক্সের মধ্যে হেডে গোল করতে পারেন। গোলের জন্য সব সময় বক্সের আশেপাশে শিকারি বিড়ালের মতো ওঁত পেতে থাকেন। যার নিট ফল এই ১৬ গোল।

 হেনরি বলছেন, ‘‘ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে গোল করলেও, ছ’টি গোলের মধ্যে আমার সেরা গোল আজকের দু’টো। এই গোল দু’টো না হলে তো বুঝতেই পারতাম না এখানকার মানুষ ফুটবলকে কী অসম্ভব ভালবাসেন। এ রকম ফুটবল পাগল সমর্থক আমার দেশ উগান্ডাতেও দেখিনি। দারুণ লাগছে মোহনবাগানকে লিগ দিতে পেরে।’’ মোহনবাগানের দশ নম্বর সঙ্গে বলে দেন, ‘‘গত বছর প্রথম ভারতে এসে খেলেছিলাম কেরলের গোকুলম এফসি-তে। কেরল ও কলকাতা দু’জায়গার মানুষই ফুটবল পাগল। কিন্তু কলকাতার মোহনবাগান সমর্থকদের এই ভালবাসা জীবনেও ভুলব না। ওরাই এই ছ’টি গোল করতে ও গোটা লিগ জুড়ে ভাল খেলতে আমাদের টানা প্রেরণা দিয়ে গিয়েছেন।’’

উঠে আসে মোহনবাগান ক্লাব প্রশাসনের সাম্প্রতিক ডামাডোল এবং বেতন সংক্রান্ত জটিলতার প্রসঙ্গও। যা শুনে হেনরি বলে দেন, ‘‘আমরা তো ফুটবলার। ক্লাব প্রশাসক তো নই। তাই মোহনবাগান জার্সি গায়ে রোজ লক্ষ্য ছিল গোল করে ম্যাচ জেতানো। অন্য কিছুই আর মাথায় রাখিনি। সেটা ধারাবাহিক ভাবে আমি ও ডিকা করতে পেরেছি বলেই আমরা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি।’’

হেনরির কথা শুনে হাসতে থাকেন ডিকা। জানতে চাওয়া হয়, এই কলকাতা লিগে তাঁর সেরা গোল কোনটি। রজার মিল্লার দেশ ক্যামেরুনের এই স্ট্রাইকার দার্শনিকের মতো বলে দেন, ‘‘একজন লেখকের কাছে তাঁর সব লেখা যেমন মূল্যবান। ঠিক তেমনই আমার সব গোলই স্মরণীয়। কোনওটাকেই এগিয়ে পিছিয়ে রাখি না।’’

সামনেই আই লিগ। সেখানেও কি উড়বে সবুজ-মেরুন বিজয় পতাকা? যা শুনে হেসে ওঠেন ডিকা। বলেন, ‘‘দেখা যাক। আপাতত বিশ্রাম। তার পরে মিশন আই লিগ।’’ হেনরি বলে যান, ‘‘আই লিগে আমার ও ডিকার জুটি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। ডিকা অত্যন্ত বুদ্ধিমান। সেখানে আমাদের জুটি আরও ঝাঁঝালো হবে। কলকাতা লিগের পরে এ বার আমাদের লক্ষ্য আই লিগ। এ বার সেই লক্ষ্যেই ঝাঁপাতে হবে।’’

ডিকা, হেনরির মতোই লিগ জয়ের পরে উচ্ছ্বসিত মোহনবাগান অধিনায়ক শিল্টন পাল। শিল্টন বলছেন, ‘‘১৩ বছর পরে মোহনবাগানের আই লিগ জয় আর ৮ বছর পরে মোহনবাগানের কলকাতা লিগ জয়—দু’ক্ষেত্রেই আমি অধিনায়ক। এক জন ফুটবলারের কাছে এর চেয়ে গর্বের কিছু হয় নাকি।’’