সাক্ষাৎকার ঠিক নয় যেহেতু এই মুহূর্তে সাক্ষাৎকার দিতে চান না ভারতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত কেউ। তবু বিশ্বকাপে টিম ইন্ডিয়ার মনোভাবের যিনি মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন বলে প্রশংসিত হচ্ছেন সেই টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রী মুখ খুললেন কিছু জ্বলন্ত বিষয় নিয়ে ব্যাখ্যা করার ছিল বলে। মঙ্গলবার প্র্যাকটিসের আগে ভারতের টিম হোটেলে পাওয়া গেল তাঁকে...

 

প্রশ্ন: ভারতীয় মিডিয়ার সঙ্গে টিমের সম্পর্ক এমন তলানিতে পৌঁছেছে যে অকল্যান্ডে আপনারা ভারতীয় মিডিয়াকে টিম হোটেলে ঢুকতে পর্যন্ত দেননি। এমনকী রাস্তার উল্টো দিক থেকে ছবি তোলার সময় হোটেল সিকিওরিটি এসে বলেছে ইন্ডিয়ান টিমের বারণ আছে। নিউজিল্যান্ডের পাবলিক প্লেসে কী করে কারও দাঁড়িয়ে থাকা আপনারা আটকাতে পারেন?

শাস্ত্রী: আমরা আটকাইনি। হোটেল সিকিওরিটি আটকেছে।

 

প্র: হোটেল সিকিওরিটি বলেছে তাদের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু ইন্ডিয়ান টিম আপত্তি করছে। বলেছে ইন্ডিয়ান টিম ম্যানেজমেন্ট এই নির্দেশ দিয়েছে। তার মাথা তো আপনি।

শাস্ত্রী: শুনুন মশাই আমি হলাম টিম ডিরেক্টর। আমি মিডিয়া অ্যাক্রেডিটেশন ম্যানেজার নই। এটা লিখবেন।

 

প্র: কোট করব আপনাকে?

শাস্ত্রী: অবশ্যই করবেন যে রবি শাস্ত্রী মিডিয়া অফিসার নয়। সে টিমের ডিরেক্টর। কে হোটেলে ঢুকবে, মিডিয়ার কে ঢুকবে না এটা দেখা তার কাজের মধ্যে পড়ে না আর সেটা নিয়ে না সে কোনও নির্দেশ দিয়েছে, না মাথা ঘামিয়েছে।

 

প্র: তা হলে টিম এত ভাল খেলার সময়ও এমন যোগাযোগহীন অবস্থা তৈরি হচ্ছে কেন?

শাস্ত্রী: অনেক কারণ আছে। ছেলেদের দিক দিয়েও অনেক বক্তব্য আছে। আমি এ সবের মধ্যে এই মুহূর্তে ঢুকতে চাই না। তবে আর এক বার বলি অকল্যান্ডের হোটেলে আমাদের কোনও নির্দেশ ছিল না। এটা হোটেল সিকিওরিটি। এই যেমন আর্নল্ড সোয়ার্ৎজেনেগার এখানে কাল ছিলেন। ওঁকে তো ঘিরে ছিল হোটেল সিকিওরিটি। কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। তারা কি সোয়ার্ৎজেনেগারের নির্দেশের অপেক্ষা করেছে?


সতীর্থদের বাধা টপকে গোল করছেন। ছবি: এএফপি।

প্র: খেলার কথায় ফিরছি। অকল্যান্ডে রায়না দুর্ধর্ষ খেলার পর এবিপিতে আপনার কথা লেখা হয়েছে যে ইংল্যান্ডে চাপের মুখেও আপনি টানা রায়নার সঙ্গে ছিলেন।

শাস্ত্রী: ইয়েস এই সব বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা আমার কাছে ছোট ভাইয়ের মতো।

 

প্র: সে তো আপনি কমেন্টেটর থাকার সময়ও ছিল।

শাস্ত্রী: না এই পর্যায়ে ছিল না। এখন আমি ওদের রবি ভাইয়া। আর আমিও ছেলেগুলোকে ভালবেসে ফেলেছি। দারুণ ট্যালেন্টেড এরা। জাস্ট নিজেদের ক্রিকেটটাকে অন্য লেভেলে নিয়ে গিয়েছে।

 

প্র: এরা নাকি ফিটনেস নিয়ে এমন বিভোর যে আদ্ধেকে ভাত-রুটি খায় না?

শাস্ত্রী: অনেকে খায় না। সবাই নয়। হ্যাঁ ফিটনেস নিয়ে এরা কোনও কম্প্রোমাইজই করে না। কী ফিল্ডিং করে এক একটা ছেলে। আমি তো বলব ভারতের সর্বকালের সেরা ফিল্ডিং ইউনিট!

 

প্র: আপনাদের সেই বেনসন হেজেস কাপ জেতা দলের সঙ্গে এই টিমটার কোনও মিল পাচ্ছেন?

শাস্ত্রী: ওটা এত পুরনো সময়ের। আজ থেকে তিরিশ বছর আগেকার। কী মিল বলব— মাথায় আসছে না।

 

প্র: মনোভাবের কোনও মিল?

শাস্ত্রী: দু’টো টিমই খুব এনজয় করতে করতে টুর্নামেন্টটা খেলেছে—এটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় মিল।

 

প্র: এদের মনোভাবে আপনি তা হলে মুগ্ধ?

শাস্ত্রী: আরে বাবা কী ক্রিকেট খেলছে গোটা টিম! নবাব অব বেঙ্গল (শামি), হরিয়ানা এক্সপ্রেস (মোহিত শর্মা), তার পর বিদর্ভ এক্সপ্রেস (উমেশ যাদব)। এরা যা বোলিং করছে শেষ কবে একটা ইন্ডিয়া পেস বোলিং ইউনিটকে এ রকম বল করতে দেখেছেন?

 

প্র: আপনি যতই বলুন দু’টো ভিন্ন সময়, মেলবোর্ন এসে কি পঁচাশির কথা বারবার মনে পড়ছে না?

শাস্ত্রী: কিছুটা মনে পড়া তো অনিবার্য। এই তো সে দিন তিরিশ বছর পূর্তি হল। মনে আছে অডি জিতে সমর্থকদের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে হোটেলে ফিরেছিলাম।

 

 

প্র: হেঁটে?

শাস্ত্রী: ইয়েস হিল্টন অন দ্য পার্ক। এমসিজির একেবারে পাশেই তো।

 

প্র: শোনা যায় তার পর এক-আধ দিন আপনাকে আর পাওয়া যায়নি।

শাস্ত্রী: ইয়েস তার পর আমি একটু ব্যস্ত হয়ে পড়ি (হাসি)।

 

প্র: বাংলাদেশ ম্যাচ নিয়ে কী মনে হচ্ছে?

শাস্ত্রী: মনে হচ্ছে ওদের হালকা ভাবে নেওয়ার প্রশ্নই নেই। ওরা আমাদের দু’হাজার সাতে হারিয়েছে। এশিয়া কাপে সচিন সেঞ্চুরি করার পরেও হারিয়ে দিয়ে গিয়েছে।

 

প্র: রামিজ আর সিধু টিভিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে একটা বিশাল বাংলাদেশি জনতাকে চটিয়ে দিয়েছেন। শুনেছেন?

শাস্ত্রী: না তো।

 

প্র: হ্যাঁ ঢাকায় অনেকেই খুব উত্তেজিত।

শাস্ত্রী: দেখুন কে কী বলেছে সেটা নিয়ে আমি কিছু বলব না। আমি কেবল এটুকু বলতে পারি যে, টিমটা আমাদের দু’টো বড় টুর্নামেন্টে হারিয়েছে। নিউজিল্যান্ডের মতো টিমকে টানা সাত বার হারিয়েছে। এই টুর্নামেন্টে যারা এত ভাল খেলছে তাদের সম্মানের সঙ্গে দেখা ছাড়া কোনও উপায় খোলা নেই। আমি এর বেশি কিছু বলতে চাই না।

 

প্র: টিমের তরুণরা অনেকেই বলছে, তাদের সমস্যার কথা খোলাখুলি এখন আপনাকে জানাতে পারে। যেটা ফ্লেচার থেকেও হচ্ছিল না।

শাস্ত্রী: ওরা এক এক জন আমার ভাইয়ের মতো বললাম না। ও মনে পড়ে গেল, আপনি রায়নার প্রতি আস্থা রাখার কথা বলছিলেন। এমএসের ইনিংসটা দেখেছিলেন অকল্যান্ডে?

 

প্র: দারুণ ছিল।

শাস্ত্রী: দারুণ মানে চাবুক! বহুত বড়া প্লেয়ার হ্যায় ইয়ে। আমি আজ বলছি মহেন্দ্র সিংহ ধোনি চলে গেলে লোকে মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মর্ম বুঝবে। হোয়াট আ ক্রিকেটার। আমি তো বলব কপিল দেবের পরেই ধোনি হল ভারতের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার।

 

প্র: কেন?

শাস্ত্রী: কেন মানে? লোকটা দারুণ কিপিং করে। কালেভদ্রে ক্যাচ ফেলে কি না সন্দেহ। টানা এত ম্যাচ খেলে। ৯৩টা টেস্ট ম্যাচ এমন ভাবে নিঃশব্দে খেলে দিল যেন তিরিশটা টেস্ট খেলে উঠল। এত বড় ক্যাপ্টেন। দু’টো বিশ্বকাপ জিতেছে। সিএসকের হয়ে দু’বার আইপিএল পেয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ পেয়েছে। ওয়ান ডে-তে এত এত ম্যাচ জেতানো। ভাবা যায়? এত কিছুর পর ওকে অলরাউন্ডার তো বলতেই হবে।

 

প্র: এ বারের বিশ্বকাপে ধোনিকে খুব উদ্দীপ্ত দেখাচ্ছে।

শাস্ত্রী: ওহ হোয়াট আ লিডার! প্রত্যেক বার বড় টুর্নামেন্টের আগে নিজের খেলাটাকে বাড়িয়ে নেয়। বিশাল প্লেয়ার, ইন্ডিয়ার অল টাইম গ্রেটদের মধ্যেও প্রথম সারিতে। যে ভাবে ও মাথা ঠান্ডা করে রাখে, ড্রেসিংরুমটাকে অনুত্তেজিত থাকতে দেয়, দেখে শেখার মতো।

 

প্র: আপনি বলছেন কোহলিকে ধোনি হতে হলে অনেক খাটতে হবে?

শাস্ত্রী: ধোনি যা রেকর্ড আর খানদান রেখে যাবে সেটা ম্যাচ করা সত্যি কঠিন হবে। বললাম তো ধোনি একেবারে অন্য লেভেলের প্লেয়ার।

 

প্র: কমেন্ট্রি থেকে তা হলে এখন আপনার পুরো অবসর। এখন শুধুই ইন্ডিয়ান টিমের সঙ্গে?

শাস্ত্রী: কে বলেছে? আইপিএলেই তো আমি কমেন্ট্রি করব। এই তো কলকাতায় এপ্রিলের গোড়ায় উদ্বোধনী ম্যাচে পিচ রিপোর্ট করতে গিয়ে বাংলায় জিজ্ঞেস করব, কলকাতা তুমি কেমন আছ?