মনে আছে, দু’বছর আগে এই উইম্বলডনেই নোভাক জোকোভিচ তৃতীয় রাউন্ডে ছিটকে যাওয়ার পরে খুব হইচই হয়েছিল। গ্র্যান্ড স্ল্যামে টানা ৩০ ম্যাচ জেতার দৌড় থেমে গিয়েছিল এই হারে।  জোকোভিচের হারের চেয়েও বেশি কথা উঠেছিল তাঁর প্রতিক্রিয়া নিয়ে। ম্যাচের পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে এসে জোকোভিচকে নাকি বিধ্বস্ত লাগছিল। সেটা স্যাম কুয়েরির কাছে সে বার হারের চেয়েও বেশি ছিল অন্য একটা কারণে। সেটা পরে বোঝা যায়।

জোকোভিচ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি ব্যক্তিগত একটা সমস্যায় আছেন। সেটাই তাঁর খেলায় বেশি প্রভাব ফেলছে। কী সেই কারণ? অনেকে মনে করেন কারণটা, পারিবারিক সমস্যা। এর পরে সময়টা জোকোভিচের ভাল যায়নি। চোট-আঘাত, কনুইয়ে অস্ত্রোপচার, কোচের সঙ্গে বিচ্ছেদ। সেই জোকোভিচ কী ভাবে উইম্বলডনে এমন দুরন্ত প্রত্যাবর্তন করলেন? গত এক বছরে একটাও টুর্নামেন্ট জিততে পারেননি যে খেলোয়াড়, তিনিই কি না উইম্বলডনে ১২ নম্বর বাছাই হিসেবে নেমে চ্যাম্পিয়ন! তাও ফাইনালে স্ট্রেট সেটে জিতে। রবিবার ফাইনালে কেভিন অ্যান্ডারসনকে ৬-২, ৬-২, ৭-৬ (৭-৩) হারিয়ে টেনিস বিশ্বে সার্বিয়ান তারকা সগর্বে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা করে দিলেন।

জোকোভিচের এই ফিরে আসার পিছনে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা মিটে যাওয়াই হয়তো নয়, পাশাপাশি আরও একটা কারণ রয়েছে— সার্ভিসটা আরও উন্নত করে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া।

যে কোনও খেলায় সর্বোচ্চ স্তরে প্রত্যাবর্তন ঘটানো ভীষণ কঠিন। চোটের ধাক্কায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়া তারকা যখন দেখেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা একের পর এক ট্রফি জিতছেন, অথচ তিনি কিছুই করতে পারছেন না, তখন আত্মবিশ্বাস হারাতে থাকেন। সমস্যাটা কিন্তু শরীরের চেয়েও অনেক বেশি মানসিক। তাই সেখান থেকে উঠে আসতে তাঁকে যাঁরা দীর্ঘদিন তাঁকে চেনেন, তাঁরাই সব চেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারেন।

এ দিক থেকে দেখলে, আন্দ্রে আগাসির সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে জোকোভিচের পুরনো কোচ মারিয়ান ভাজদাকে ফিরিয়ে আনাটা আমার মতে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। ভাজদা ফিরে আসার পরে জোকোভিচের সার্ভিস আরও উন্নত হয়েছে। আসলে অস্ত্রোপচারের পরে জোকোভিচ নিজের সার্ভিস নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। আগের মতো সার্ভিসে জোর পাবেন কি না নিশ্চিত ছিলেন না। সার্ভিসের অ্যাকশনও বদলাতে হয়েছিল। ধীরে ধীরে সার্ভিসে উন্নতি করেন। উইম্বলডনে নামার পরে তো দেখা গেল তাঁর সার্ভিস আগের চেয়ে অনেক উন্নতি করেছে। এর জন্য কৃতিত্ব প্রাপ্য ভাজদারই।

তবে, ফাইনাল দেখে আমি কিছুটা হতাশই হয়েছি। একটা সাড়ে ছ’ঘণ্টা আর একটা প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার সেমিফাইনালের পরে ভেবেছিলাম ফাইনালে আরও একটু লড়াই দেখতে পারব। কিন্তু সেটা হল কোথায়! আসলে সাড়ে ছ’ঘণ্টায় সেমিফাইনাল জেতার পরে এই অ্যান্ডারসনকে সেই রজার ফেডেরারকে হারানো অ্যান্ডারসন মনে হয়নি। বেশ ক্লান্ত লাগছিল। জোকোভিচেরও একই সমস্যা ছিল। যদি তৃতীয় সেটে জোকোভিচের বিরুদ্ধে ২-৩টে সেট পয়েন্ট কাজে লাগাতে পারতেন অ্যান্ডারসন, তা হলে ম্যাচের ফল অন্য রকম হতেও পারত। কারণ, জোকোভিচকে ম্যাচের শেষের দিকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। টানা তিন দিন ম্যাচে নামা কোনও খেলোয়াড়ের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক।

এ বার উইম্বলডনে গরম আর আর্দ্রতা খুব বেশি। কলকাতার মতো গরম এখন লন্ডনে। তাই কোর্টে বল বাউন্সও হচ্ছে বেশি। যে সুবিধাটা পাচ্ছেন অ্যান্ডারসনের মতো লম্বা খেলোয়াড়রা। জোকোভিচ জানতেন পাঁচ সেটে গড়ালে তাঁর পক্ষে জেতা সমস্যার হবে। তাই অঙ্ক কষেই নেমেছিলেন রবিবার। অঙ্কটা খুব সহজ। স্লাইস শট বেশি ব্যবহার করে অ্যান্ডারসনকে নিচু হয়ে খেলতে বাধ্য করা। যাতে বাউন্সের সুযোগ না নিতে পারেন দক্ষিণ আফ্রিকার ছ’ফুট আট ইঞ্চি লম্বা খেলোয়াড়। সেই পরিকল্পনায় সফল বিশ্বের প্রাক্তন এক নম্বর।

যে ভাবে জোকোভিচ ফিরে এলেন, এই ফিটনেস ধরে রাখতে পারলে, আমার তো মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র ওপনেও ট্রফি জেতার দৌড়েও তিনিই এগিয়ে থাকবেন। অনেকে বলবেন, আলেকজান্ডার জেরেভ, দমিনিক থিমের মতো নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রাও তো রয়েছেন। তাঁদের বলব,  এ বছর প্রথম তিনটে গ্র্যান্ড স্ল্যামের দিকে এক বার তাকান। তিনটে ট্রফি জিতেছেন কারা? রজার ফে়ডেরার, রাফায়েল নাদাল এবং নোভাক জকোভিচ। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের কোথাও দেখা
যাচ্ছে কি!