দীপা কর্মকারদের আখড়ায় নাম লেখালেন বাংলা এবং ভারতের অন্যতম সেরা প্রতিশ্রুতিমান মহিলা জিমন্যাস্ট প্রতিষ্ঠা সামন্ত।

অনুশীলনের পরিকাঠামোর অভাবে বাংলা ছেড়ে ত্রিপুরায় চলে গেলেন হাওড়া সাঁতরাগাছির মেয়ে। অভিযোগ, সাই থেকেও উপযুক্ত সাহায্য পাননি তিনি। দীপার মতোই অলিম্পিক্সে নামার স্বপ্ন নিয়ে আপাতত বাবা-মাকে নিয়ে আগরতলায় থাকবেন প্রতিষ্ঠা। সেখানে আধুনিকতম ‘ফোম পিটে’ দীপার কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দীর কাছে অনুশীলন করছেন তিনি। 

এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ফলের অপেক্ষায় থাকা ১৬ বছরের প্রতিষ্ঠা আগরতলা থেকে ফোনে বললেন, ‘‘আমি জুনিয়র বিভাগে এশিয়ায় বারো নম্বর হয়েছি। এশিয়াড পদকের পাশাপাশি অলিম্পিক্সে নামাই আমার লক্ষ্য। বাংলায় সেই সুযোগ পাচ্ছিলাম না বলেই রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হলাম। দীপা দিদির মতো হতে চাই।’’

প্রতিষ্ঠার প্রতিভা নিয়ে অনেকেই উৎসাহী। সাব-জুনিয়র এবং জুনিয়র বিভাগে এখন দেশের সেরা। সম্প্রতি ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায় চারটি সোনা জিতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন। দু’বার এশিয়া জুনিয়র জিমন্যাস্টিক্সে ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন জয়প্রকাশ চক্রবর্তীর এক সময়ের  ছাত্রী। ২০১৬ সালে ব্যাঙ্ককে কিছু না করতে পারলেও, দু’বছর পরে  জাকার্তায় এশীয় জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে দ্বাদশ স্থান পান প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিযোগিতা থেকে যুব অলিম্পিক্সে যাওয়ার সুযোগ ছিল তাঁর। নবম স্থান পেলেই সেই সুযোগ এসে যেত শিবপুর হিন্দু বিদ্যালয়ের ছাত্রীর। প্রতিষ্ঠার কথায়, ‘‘পরীক্ষা ছিল সামনে। অনুশীলন নিয়ে নানা সমস্যা ছিল। না হলে যুব অলিম্পিক্সে সুযোগ পেতে পারতাম।’’

টুম্পা দেবনাথ, প্রণতি দাশ, প্রণতি নায়েকদের মতো দেশের সেরা জিমন্যাস্টরা বাংলার হয়ে প্রচুর পদক জিতেছেন। এঁরা সবাই সাইয়ের ছাত্রী ছিলেন বা এখনও আছেন। বাংলায় জিমন্যাস্টিক্সের কোনও পরিকাঠামো না থাকায় ভাল ছাত্রীদের বেছে সাইতে পাঠান কোচেরা। প্রতিষ্ঠাও ছিলেন সাইয়ের ছাত্রী। সেখানেই অনুশীলন করে বেড়ে ওঠা তাঁর। কিন্তু বছর খানেক আগে হঠাৎ সমস্যা তৈরি হয়। সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা থাকায় প্রতিষ্ঠার বাবা সল্টলেক সাইয়ের আধিকারিকদের কাছে অনুরোধ করেন, খেলার পাশাপাশি মেয়েকে পড়াশোনাও করাতে চান। 

প্রতিষ্ঠার বাবা বেসরকারি সংস্থার কর্মী সুমন সামন্ত বলছিলেন, ‘‘আমরা চেয়েছিলাম মেয়ে বাড়ি থেকে নিয়মিত সাইতে অনুশীলন করুক। সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা ছিল। বাড়িতে না থাকলে পড়াশোনা হতো না। কারণ সাই থেকে শনি-রবিবারও ছুটি পাওয়া যেত না। ফলে পড়াশোনার জন্য সাই ছেড়ে দিতে হয় মেয়েকে। শুধু তাই নয়, ওর বিশেষ অনুশীলনও হচ্ছিল না। আমরা চেয়েছিলাম ওর ছোটবেলার কোচের কাছে অনুশীলন করুক। দু’টো ক্ষেত্রেই সাই আমাদের অনুমতি দেয়নি।’’ 

বাধ্য হয়েই প্রতিষ্ঠা সাই ছাড়েন। ছোটবেলার কোচ জয়প্রকাশ চক্রবর্তীর কাছে বিভিন্ন ক্লাবে ঘুরে ঘুরেঅনুশীলন করতে থাকেন তিনি। ফোনে বাংলা ছেড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠা বলছিলেন, ‘‘পুণেতে খেলো ইন্ডিয়ায় চারটে সোনা জিতেছি ঠিকই, কিন্তু তার আগে সে ভাবে অনুশীলনের পরিকাঠামোই পাইনি। ফোম পিট তো সাই ছাড়া বাংলার কোথাও নেই। যা পেয়েছি তাতেই অনুশীলন করেছি।’’ খেলো ইন্ডিয়ায় ভল্ট, বিম, ফ্লোর ইভেন্ট ছাড়াও অল রাউন্ডেও সোনা জিতেছেন প্রতিষ্ঠা। পারফরম্যান্স দেখে দিল্লির বিশ্বকাপ শিবিরে তাঁকে ডেকে নেন দীপার কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী।  

এ দিন বিশ্বেশ্বর বলছিলেন, ‘‘আরও দু’মাস গেলে বুঝতে পারব কতটা এগোতে পারবে মেয়েটা। ভল্ট ও বিমে বেশ ভাল। দীপার সঙ্গে অনুশীলন করছে। দীপা ওকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু আমরা যেখানে অনুশীলন করাই, সেটা তো রাজ্য সরকারের। ফলে ওকে বাংলা থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট না আনলে এখানে নিতে পারতাম না। এ বার থেকে জাতীয় জিমন্যাস্টিক্সে ও ত্রিপুরার হয়েই নামবে।’’     

দীপা কর্মকার সাফল্য পাওয়ার পর ত্রিপুরা সরকার আরও অনেক নতুন ছেলে-মেয়ে তুলে আনার জন্য একটি আধুনিকতম স্টেডিয়াম তৈরি করেছে। সেখানে এখন ১৩০ জন ছাত্র-ছাত্রী অনুশীলন করেন। প্রতিষ্ঠাও এখন তাদের সঙ্গী। ত্রিপুরার পাশাপাশি করুণ ছবি হয়ে থাকছে বাংলা। রিয়ো অলিম্পিক্সে  দেশ জুড়ে জাগরণের পরেও ঘুম ভাঙেনি এ রাদ্যের অলিম্পিক সংস্থা (বিওএ) বা বিভিন্ন খেলার সংস্থাগুলির। প্রতিষ্ঠার মতো প্রতিভা রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছেন আর কর্তারা ব্যস্ত কাজ না করে পদ আগলে বছরের পর বছর 

পড়ে থাকতে!