রঞ্জি ট্রফিতে ঘরের মাঠে মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে চলেছে বাংলা। সেই ম্যাচের দল নির্বাচন হয়ে গেল বৃহস্পতিবার। কিন্তু দল নির্বাচন সেরে ফেললেও সিনিয়র নির্বাচক কমিটিতে থাকা চার নির্বাচকের মধ্যে দু’জন নতুন গঠনতন্ত্রের শর্তই পূরণ করছেন না। নিয়মকানুন বা সংস্কারের তোয়াক্কা না করেই সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়দের সিএবি এমন ব্যক্তিদের নির্বাচক করে বসিয়ে রেখেছে, যাঁরা কমিটিতে থাকতে পারেন কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। 

বিচারপতি আর এম লোঢা কমিটির ক্রিকেট সংস্কারের সুপারিশ মেনে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এবং তাদের অনুমোদিত সব রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সিএবি-র নতুন গঠনতন্ত্র তাদেরই বিশেষ সাধারণ সভায় পাশ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু নির্বাচক কমিটির জন্য যে শর্তাবলী সেখানে দেওয়া আছে, তা মানা হচ্ছে কোথায়?

সিএবি-তে সদস্যদের পাশ করা গঠনতন্ত্রে বলা আছে, সিনিয়র নির্বাচক কমিটিতে থাকা প্রাক্তন ক্রিকেটারদের অন্তত এক) ৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলতে হবে অথবা দুই) ৩০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলতে হবে অথবা তিন) ১০টি ওয়ান ডে এবং ২০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলতে হবে। এই শর্তাবলী মানলে বাংলার বর্তমান সিনিয়র নির্বাচক কমিটিতে দু’জন থাকতেই পারেন না। এঁরা হলেন মিন্টু দাস এবং কল্যাণ চৌধুরী। বাংলার প্রাক্তন উইকেটরক্ষক মিন্টু সব মিলিয়ে ২৩টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন। কখনও ভারতের হয়ে এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেননি। কল্যাণ চৌধুরী খেলেছেন আরও কম— ১৯টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। প্রশ্ন উঠছে, গঠনতন্ত্র পাশ হয়ে যাওয়ার পরেও কী ভাবে এঁদের কমিটিতে রেখে নির্বাচনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সিএবি?

জুনিয়রে পরিস্থিতি আরও সাংঘাতিক। রাতারাতি সিনিয়র থেকে এনে জুনিয়র নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে মদন ঘোষকে। তাঁর চয়ন নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক চলেছে কারণ, সিএবি অনুমোদিত একটি ক্লাবের প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি সংস্থার অনেক সভায় যোগ দিয়েছেন। যা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে স্বার্থ সংঘাতের অভিযোগ রয়েছে। আজ পর্যন্ত সেই স্বার্থ সংঘাতের প্রশ্নের জবাব সিএবি তাদের ওয়েবসাইটে দেয়নি। তার মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, নতুন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জুনিয়রে নির্বাচক হতে গেলে ন্যূনতম ২৫টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলতেই হবে। কিন্তু মদন ঘোষ খেলেছেন মাত্র ১৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। বাংলার জুনিয়র নির্বাচক কমিটির আর এক সদস্য, প্রাক্তন ক্রিকেটার মলয় বন্দ্যোপাধ্যায় খেলেছেন আরও কম— ৯টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ এবং ২টি ‘লিস্ট এ’ (অর্থাৎ ঘরোয়া এক দিনের ম্যাচ) ম্যাচ। তা হলে তাঁদের দু’জনকে কী করে কমিটিতে রাখা হল? মদন ঘোষকে চেয়ারম্যান করার ক্ষেত্রেও নিয়মের তোয়াক্কা করেননি সিএবি কর্তারা। কমিটিতে থাকা চার সদস্যের মধ্যে অন্য দু’জন বেশি ম্যাচ খেলেছেন। সব চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন ইন্দুভূষণ রায়। তিনি মোট ৩১টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ এবং ৯টি ‘লিস্ট এ’ ম্যাচ খেলেছেন। এর পরেই আছেন অভীক মিত্র (২৬টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ, ১২টি লিস্ট এ)। অথচ সব চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ইন্দুভূষণকে নির্বাচক-প্রধান না করে মদনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। সিনিয়র নির্বাচক কমিটিতে যদিও সব চেয়ে বেশি খেলা পলাশ নন্দীকেই (৫৭টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ) চেয়ারম্যান করা হয়েছে। 

বাংলার দল নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে ইতিমধ্যেই নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অধিনায়ক মনোজ তিওয়ারির পরামর্শ ছাড়া রঞ্জিতে প্রথম ম্যাচের দল গঠন করে ফেলা হয়েছিল। তা নিয়ে অপমানিত মনোজ নেতৃত্বের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। অন্য দিকে, সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্স (সিওএ) তাদের স্টেটাস রিপোর্টে জানিয়ে দিয়েছে, সিএবি-র গঠনতন্ত্র সব নিয়ম মেনে হয়নি। যেমন, সিএবি চেয়েছিল, দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে শেষ কথা বলবেন সংস্থার প্রেসিডেন্ট। তাদের বলে দেওয়া হয়েছে, প্রেসিডেন্ট দল নির্বাচনে নাক গলাতে পারবেন না। উপযুক্ত রদবদল করে সিএবি-কে গঠনতন্ত্র তৈরি করতে হবে। এর মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল যোগ্যতামান পূরণ না করেও নির্বাচকের বরাত পাওয়ার ঘটনা! সিনিয়র-জুনিয়রে দুই নির্বাচক কমিটি মিলিয়ে আট জনের মধ্যে চার জনই শর্ত পূরণ করছেন না! নির্বাচকদেরই অবৈধ নির্বাচন!