ভাটিয়ালি গান গেয়ে চমকে দেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই কেঁদে ভাসালেন স্বপ্না বর্মণ! তাঁর মায়ের জন্য। জলপাইগুড়ি থেকে মায়ের হার ছিনতাইয়ের খবরের ফোন পেয়ে কাঁদতে দেখা যায় তাঁকে। বলতে থাকেন, ‘‘আমার মা ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিল। দু’জন ছেলে বাইক নিয়ে এসে মা-র সোনার চেন ছিনতাই করে নিয়ে গিয়েছে। মার গলায় চোট লেগেছে। আমি এক্ষুণি বাড়ি যাব। আমার মা কাঁদছে।’’

চোট নিয়ে হেপ্টাথলনের মতো কঠিন ইভেন্টে সোনা জয়ই নয়, সোনার মেয়ে যে নিয়মিত বাউল ও ভাটিয়ালি গান চর্চা করেন সেটা হঠাৎ-ই ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার দক্ষিণ কলকাতার ক্যালকাটা রোয়িং ক্লাবের ‘এশিয়াডের সোনার ছেলে-মেয়েদের অভিবাদন’ নামাঙ্কিত অনুষ্ঠানে অন্যদের সঙ্গে এসেছিলেন স্বপ্নাও। শহরে এক মঞ্চে জাকার্তা এশিয়াডের সাত সোনাজয়ীকে নিয়ে হওয়া অভিনব এই অনুষ্ঠানের ঘোষক স্বপ্নাকে অনুরোধ করেন একটা গান গাইতে। প্রশ্ন শুনে লজ্জায় দু’হাতে প্রথমে মুখ ঢাকেন সোনার মেয়ে। তাঁর পর হঠাৎ-ই গেয়ে ওঠেন ‘ও কি ও কাজল ভ্রমরারে’। তিন-চার লাইন গেয়ে থেমে যেতে হয় তাঁকে, প্রবল হাততালির ঝড়ে। পরে একান্তে বলে দেন, ‘‘আমার খাতায় অন্তত আশি-নব্বইটা গান লেখা আছে। অনুশীলনের অবসরে এই গানগুলো গেয়ে টেনশন মুক্ত থাকি। মাঝে মধ্যে নেচেও ফেলি।’’

এ দিনের অনুষ্ঠানে এশিয়াডে রোয়িংয়ে চার সোনা জয়ী দাত্তু বি ভোকানল, স্বর্ণ সিংহ, সুখমিত সিংহ, ওম প্রকাশের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ব্রিজের দুই সোনা জয়ী বঙ্গসন্তান প্রণব বর্ধন ও শিবনাথ দে সরকারও। ছিলেন স্বপ্নার কোচ সুভাষ সরকারও। কিন্তু স্বপ্নাকে নিয়ে হইচই ছিল বেশি। তাঁকে প্রশ্ন করতে দেখা যায় দর্শকাসনে উপস্থিত প্রাক্তন টেস্ট ক্রিকেটার সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রাক্তন ফুটবলার বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে। সম্বরণ দু’টি প্রশ্ন করেন, তোমার দাঁতের ব্যথা এখন কেমন? কবে তুমি বাড়ি যাচ্ছ? স্বপ্না উত্তর দেন, ‘‘এখন আগের তুলনায় ভাল। তবে দাঁত তুলতে হবে মনে হচ্ছে। কাল (রবিবার) ডাক্তার দেখাব। দু’সপ্তাহ পরে বাড়ি থাকব।’’ বিশ্বজিৎ প্রশ্ন করেন, এত চোট-আঘাত নিয়ে কতটা কঠিন ছিল এশিয়াডের সোনা জেতা। নিজে উত্তর না দিয়ে স্বপ্না মাইক এগিয়ে দেন তাঁর কোচকে। স্বপ্নার দু’পায়ের ছয় আঙুল ও জুতো নিয়ে সমস্যার পাশাপাশি চোট-আঘাতকে হারিয়ে কী ভাবে সফল হয়েছিলেন তাঁর ছাত্রী, তা বলার পরে সুভাষবাবু বলেন, ‘‘সোনা জেতার পরে এখন অনেক কোম্পানিই এগিয়ে এসেছে স্বপ্নার বিশেষ জুতো বানিয়ে দেওয়ার জন্য। অলিম্পিক্সে যদি ওকে নামাতে পারি তা হলে হয়তো জুতো নিয়ে সমস্যা হবে না।’’ পাশাপশি সিআরসি-র পক্ষ থেকে স্বপ্নাকে ৭৫ হাজার ও তাঁর কোচকে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে রোয়িংয়ের সোনাজয়ী দলের সদস্য দাত্তু ভি ভোকানল বলে দেন, ‘প্রথম দিকে ব্যর্থ হওয়ার পর দাঁতে দাঁত চেপে সবাই লড়েছিলাম সোনা জিততে। যে দিন সোনা জিতি সে দিন আমার ১০৬ ডিগ্রি জ্বর ছিল।’’ রোয়িংয়ের প্রথম এশিয়াড পদক জেতার রসায়ন কী ছিল, দাত্তুকে সেই প্রশ্ন করেছিলেন দর্শকাসনে বসে থাকা বিলিয়ার্ডসের প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মনোজ কোঠারি। তিনি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর ছেলে বিলিয়ার্ডসের এশীয় সেরা সৌরভ কোঠারিকেও। ছিলেন প্রাক্তন টেস্ট ক্রিকেটার অশোক মলহোত্রও।

এশিয়ার অন্যতম পুরনো রোয়িং ক্লাবের অনুষ্ঠান। সেখানে রোয়িং প্রতিযোগীদের নিয়ে উচ্ছ্বাস তো থাকবেই। যে চার জনের দল জাকার্তায় সোনা জিতেছিল তাদের সম্মানে চারটি নতুন বোট নামানো হয় রবীন্দ্র সরোবরের জলে। রোয়িং বা হেপ্টাথলনের মাঝে তাস নিয়েও যে এমন মাতামাতি হবে তা কে জানত? ষাটোর্ধ প্রণব বর্ধন ও ছাপান্ন বছর বয়সি শিবনাথকে প্রশ্ন করা হয়, আপনাদের সোনা জয়ের পর ছোট ছেলেমেয়েদের কী বাবা-মায়েরা তাস খেলতে পাঠাবেন? প্রণববাবু বলেন, ‘‘তাস সম্পর্কে ভুল ধারণা বদলাবে। তাস খেলেও যে চাকরি পাওয়া যায় সেটার প্রচার দরকার।’’

এসবের মধ্যেই স্বপ্নাকে নিয়ে হঠাৎই হইচই শুরু হয়ে যায়। অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়েই ফোন পান দাদাদের। দৌড়ে বেরিয়ে যান বাইরে। মা বাসনা বর্মণের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই কাঁদতে থাকেন স্বপ্না। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তারা। ছিলেন বি ও এ প্রেসিডেন্ট অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ও।  তারা সবাই যোগাযোগ করেন জলপাইগুড়ি প্রশাসনের সঙ্গে। জেলার এস পি-সহ পুলিশ কর্তারা যান স্বপ্নার ঘোষ পাড়ার বাড়িতে। তখনও কেঁদেই চলেছেন সোনার মেয়ে।