যে বার মারাদোনাকে মাঝমাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হল, সে বার সারা পৃথিবীর সমস্ত ছোট ছোট পাড়ায় আমরা অনেকে বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলাম। দু’চোখ ভর্তি গরম জল নিয়ে। বলতে দ্বিধা নেই, ৮৬-র বিশ্বকাপ আমাকে আর্জেন্টিনার জাদুবাস্তব নাগরিকত্ব পাইয়ে দিয়েছিল। লুকিয়ে স্কুলের ডায়রিতে প্রেমের নাম লিখতে শিখিয়েছিল— দিয়েগো। তার কয়েক বছরের মধ্যে সেই প্রেমের ভেঙে পড়া আমাকে একরাশ কান্না উপহার দিয়ে গিয়েছিল। আমি জানি, সকলকেই দিয়েছিল নিশ্চয়ই। মনে আছে, সেই মহানিষ্ক্রমণের দৃশ্য দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। গোপনে নয়, সক্কলের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। তখন বন্ধু বলতে বাবা, মা, আর পাড়ার কয়েক জন, যাঁদের সামনে অনায়াসে কাঁদা যেত। কেঁদেওছিলাম, ঝরঝর করে। টানা দু’দিন ভাত মুখে তুলিনি। বসার ঘরের আলমারিতে সাঁটা ছিল ’৮৬-র সেই বিখ্যাত ছবি, তার সামনে দাঁড়িয়ে বুক ঠেলে উঠে আসা কান্নাকে উগরে দিয়েছিলাম সারা রাত ধরে।

সেই কান্নাও এক দিন হাত ছাড়িয়ে চলে গেল দূরে। তার কথা ভারী মনে পড়ছিল, যখন ২০১৪-র ফাইনাল ম্যাচ থেকে খালি হাতে বাড়ি ফিরে গেল নীল-সাদা জার্সি। আমি তখন দেশ থেকে অনেক দূরে, এক সুহৃদের বৈঠকখানায় বসে ম্যাচ দেখছি।
খেলা শেষ হলে বেরিয়ে পড়েছিলাম বাড়ি থেকে। ছোট্ট সাজানো গোছানো পাড়ায় তখন বিকেল নেমে আসছে, অলিগলি ধরে বহু, বহু দূর পর্যন্ত হেঁটে, সন্ধের পরে ফিরে এসেছিলাম ভিন্‌দেশি ঠিকানায়। কিন্তু এক বারও কাঁদতে পারিনি। ইচ্ছে করছিল ভারী, এক বার অন্তত ডুকরে বা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠি, প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে অন্তত, কিন্তু পারিনি। দলা পাকানো কাগজের সাদা টুকরোর মতোই কান্নার দোমড়ানো মেঘ বুকের মধ্যে পোষ মানিয়ে নিতে হয়েছিল।

জাপান সমর্থকদের এমন কান্নার ছবিই ছড়িয়েছে নেট দুনিয়ায়। ছবি: গেটি ইমেজেস ও সোশ্যাল মিডিয়া

পরে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী ভাবে কান্না থেকে এতটা পথ দূরে চলে এলাম আমি? প্রিয় দলের পরাজয় তো অন্যতম ছুতো। কিন্তু জীবনের অন্যান্য হেরে যাওয়াও কি আমাকে কাঁদাতে পারে আর? উঁহু। বরং আমিই আমাকে বলি শান্ত হতে, স্থির হতে, সংযমী হতে, কান্নায় ভেঙে না পড়তে। কষ্টকে লুকিয়ে রাখতে রাখতে কখন যেন নিজের কাছ থেকেও তাকে আড়াল করতে শিখে গিয়েছি। আমি একা নই। আমরা সকলেই। বড় হয়ে ওঠার প্রত্যেকটা ব্যর্থ দুপুর আর নিষ্ফল রাতে যে ছিল আমাদের সকলের একমাত্র বন্ধু, বছরের পর বছর কেবলমাত্র যার সঙ্গে আমরা আমাদের বালিশ ভাগ করে নিয়েছি, সেই কান্নাকে কখন যেন বিদায় দিয়েছি। হয়তো আয়না শুকনো রাখার তাগিদেই।

চার বছরের ফাঁকতালে এক-একটা বিশ্বকাপ আসলে অনুভূতির পারদকাঠি। সে বুঝিয়ে দিয়ে যায়, দুনিয়া জুড়ে আমরা আদতে কতখানি পাল্টালাম, কতখানি বদলে গেল আমাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এ বার যেমন বেশির ভাগ মানুষকেই দেখলাম, রেগে যেতে। যাঁরা ব্রাজিলে জন্ম নিয়ে ব্রাজিলেরই সমর্থক বা যাঁরা ফ্রান্সের নাগরিকত্ব নিয়ে ফ্রান্সের জয় চান, তাঁদের তো চিনি না। চিনি বাঙালিকে। তা সেই বাঙালিকেই দেখলাম, প্রিয় দলের পরাজয়ে অন্যের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিতে। রাগ ছিটকে দিতে। এমনকি, গালিগালাজ করতেও দেখলাম। কিন্তু কাঁদতে দেখলাম না। হয়তো কেঁদেছেন কেউ কেউ, কিন্তু সামনে টাঙিয়ে রেখেছেন শক্ত থাকার মুখোশখানা। ফেসবুক তো এখন বাঙালির বৈঠকখানার দেওয়াল, সেখানে আর যা-ই হোক, আয়না টাঙানো যায় না। আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণ, ট্রোল করা, মিম বানানো, এমনকি খেউড় পর্যন্ত আছে। কান্নার কথা নেই কোথাও। হতাশা আছে, ক্ষোভ আছে, অভিমানও হয়তো বা আছে কিছুটা, কান্না নেই। কান্নাও কি তা হলে কোনও বাজি ধরা লাতিন আমেরিকান টিম, যে নাকি শেষ চারে কোয়ালিফাই করতে পারেনি? কে জানে...

সারা বিশ্বের অনেকখানি কান্না বাজেয়াপ্ত করে লাতিন আমেরিকা বিদায় নিয়েছে মাঠ থেকে। দু’হাতে মুখ ঢাকা সমর্থকদের চেহারায় নিভে এসেছে গ্যালারি। চোখের জল কিন্তু চোখে পড়ছে না তেমন। না খেলোয়াড়দের চোখে, না সমর্থকদের চোখে। তাই হঠাৎ কেউ এক জন সমস্ত নিয়ম ভেঙে কেঁদে ফেললে সব ক’টা ক্যামেরার লেন্স ঘুরে যাচ্ছে তার দিকে। কেননা, পরাজয়ের চেয়েও বড় খবর এখন কান্না নিজে। যেমন বড় খবর এ-ও যে, জাপানের খেলোয়াড়েরা পরাজয়ের পরেও ড্রেসিং রুম পরিষ্কার করে দিয়ে গিয়েছেন, মনখারাপ নিয়ে সমর্থকেরাও সাফসুতরো করে গিয়েছেন গ্যালারি। কেননা, মানুষের এই প্রবৃত্তি এখন অকল্পনীয়। তেমনই, জাপানের এক সমর্থককে কাঁদতে দেখা গিয়েছে। এ-ও খবর। কারণ, আর কিছুই নয়, কান্নাও, বহু দুষ্প্রাপ্য পাখির মতো, মিলিয়ে যাচ্ছে এই গ্রহ থেকে।

অথচ, কাঁদতে পারা কতই না ভাল ছিল। আমাদের ভিতরের গ্যালারিও তো জঞ্জালে ভরে থাকে, তাকে ধুয়েমুছে নেওয়ার এর চাইতে ভাল পন্থা আর দুটো নেই। কিন্তু ওই যে, ছোট থেকে আমাদের শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়া হল, কান্না আসলে দুর্বলের রাস্তা, অসহায়তার পোস্টকার্ড। আমরাও সে কথা বিশ্বাস করে নেমে পড়লাম অশ্রুহীন পৃথিবী তৈরির কাজে। এ কথা ভুলে গিয়ে যে, সমক্ষে হোক বা আড়ালে, কান্না আসলে আমাদের জোরের জায়গা, অনুভূতির মাঝমাঠ। তাকে এড়িয়ে পেনাল্টি বক্সে পৌঁছনো অসম্ভব। কান্নার জন্য সাহস লাগে, দুর্বলতা নয়। এই মরুশহরে ছেয়ে যাওয়া গ্রহের কিনারে দাঁড়িয়েও আমি তাই ছাড়তে পারি না কান্নার আস্তিন। কেননা, কান্না আমার অন্তিম জুয়ার রাত, আমার প্রথম শয্যাসঙ্গী। এই শুকনো হাসির পৃথিবীতে কান্না আমার শেষ চ্যাপলিন। আমি ছাড়া যার আর কেউ নেই।