বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লুকা মদ্রিচ, ইভান পেরিসিচদের অদম্য লড়াই দেখে আমার এক প্রাক্তন সতীর্থের কথা খুব মনে পড়ছিল। তখনও যুগোস্লাভিয়া ভেঙে ক্রোয়েশিয়া হয়নি। আশির দশকের শুরুর দিকে সাউদাম্পটন থেকে বোর্নমুথে লোনে সই করল যুগোস্লাভিয়া জাতীয় দলের স্ট্রাইকার ইভান গোলিয়াচ। পরের বছরেই অবশ্য চলে গিয়েছিল ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে। কিন্তু মাত্র একটা মরসুমেই ইভানের যে লৌহকঠিন মানসিকতার পরিচয় পেয়েছিলাম, তার প্রতিফলন দেখলাম বুধবার রাতে রাকিতিচদের খেলায়।

সাবেক যুগোস্লাভিয়া বা ক্রোয়েশিয়ার মানুষেরা অসম্ভব পরিশ্রমী ও লড়াকু। হার ওরা কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারে না। ইভান স্ট্রাইকার ছিল। কিন্তু অধিকাংশ ম্যাচে ও দলের প্রয়োজনে রক্ষণে নেমে আসত। ওর মতো নিখুঁত ট্যাকল অনেক ডিফেন্ডার করতে পারত না সেই সময়। ইভান বলত, ‘‘আমার পরিবারের প্রায় সবাই যোদ্ধা। যুগ যুগ ধরে সেনাবাহিনীতে রয়েছেন তাঁরা। তাই ফুটবলার হলেও লড়াই আমার রক্তে। যত ক্ষণ শরীরে প্রাণ থাকবে, লড়াই চালিয়ে যাব।’’ এই হার না মানা মানসিকতাই ক্রোয়েশিয়াকে প্রথম বার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে দিল বুধবার রাতে মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে। এ বার অপেক্ষা ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের।

ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ মিনিটে দুর্ধর্ষ ফ্রি-কিক থেকে কিয়েরান ট্রিপিয়ার এগিয়ে দেন ইংল্যান্ডকে। তার পরেও হ্যারি কেন-রা যে ভাবে একের পর এক গোলের সুযোগ তৈরি করছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল, ইংল্যান্ডকে থামানোর ক্ষমতা নেই ক্রোয়েশিয়ার। নিশ্চিত ছিলাম ৫২ বছর পরে বিশ্বকাপ জয়ের ব্যাপারে। আমার বন্ধুরা, যারা মস্কো পৌঁছে গিয়েছিল রাহিম স্টার্লিংদের হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি দেখবে বলে, ওদের সঙ্গেই কথা বলছিলাম খেলা দেখতে দেখতে। মস্কোয় পৌঁছে ওদের সঙ্গে কী ভাবে যোগাযোগ করব, কোথায় থাকব, জেনে নিচ্ছিলাম।

আমাকে বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখাতে বারণ করল ইস্টবেঙ্গলে খেলা যাওয়া অ্যান্ড্রু বরিসিচ। ওর বাবা-মা ক্রোয়েশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়ায় চলে এসেছিলেন। বরিসিচ অবশ্য জন্মেছে অস্ট্রেলিয়াতেই। ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পরে অ্যান্ড্রুকে টেক্সট করে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম, মন খারাপ কোরো না। ইংল্যান্ডকে আটকানো সম্ভব নয়। ও জবাব দিল, ‘‘ভুলে যেও না, ক্রোটরা যোদ্ধার জাত। খেলা এখনও শেষ হয়নি। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরেই তোমার সঙ্গে কথা বলব।’’

আরও পড়ুন: মোরিনহোর নজর নতুন করে সেই পেরিসিচে

অ্যান্ড্রুর কথাই মিলে গেল। দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া ক্রোয়েশিয়াকে দেখলাম। ইংল্যান্ডের কোচ গ্যারেথ সাউথগেট এই ম্যাচে রণনীতিতে সামান্য পরিবর্তন করেছিলেন। ৩-৫-২ ছকে গতি কমিয়ে খেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন হ্যারি কেন-দের। ইংল্যান্ডের এই ছকটা ধরে ফেলার আগেই ট্রিপিয়ার গোলে পিছিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। রাশিয়া বিশ্বকাপের শেষ দু’টো ম্যাচেই পিছিয়ে পড়ে দুর্দান্ত ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন মদ্রিচরা। শেষ ষোলোর ম্যাচে ডেনমার্ক এগিয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জিতে মাঠ ছেড়েছিলেন রাকিতিচরা। রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। পিছিয়ে পড়েও নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। এবং টাইব্রেকারে জিতে শেষ চারে পৌঁছয় ক্রোয়েশিয়া।

ইংল্যান্ডের রণনীতি ধরে ফেলার পরেই বদলে গিয়েছিল ক্রোয়েশিয়ার খেলার ধরন। মদ্রিচ ও রাকিতিচের দাপটে মাঝমাঠের দখল নিল ক্রোয়েশিয়া। আর ইংল্যান্ডের রক্ষণে চাপ বাড়াতে শুরু করলেন পেরিসিচ। ভুল করতে শুরু করলেন জন স্টোনস, কাইল ওয়াকারেরা। ৬৮ মিনিটে ওয়াকারের মাথার উপর দিয়েই গোল করে সমতা ফেরান পেরিসিচ। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের একেবারে শেষের দিকে পেরিসিচের পাস থেকেই জয়সূচক গোল করেন মারিয়ো মাঞ্জুকিচ। দু’টো গোলই অসাধারণ। ইংল্যান্ডের সমর্থক হয়েও স্বীকার করতে লজ্জা নেই— যোগ্য দল হিসেবেই ফাইনালে উঠেছে ক্রোয়েশিয়া। তবে ইংল্যান্ডের এই দলটার অধিকাংশ ফুটবলারই তরুণ। আমি বিশ্বাস করি, ইউরো কাপে ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম হারের নানা কারণ তুলে ধরছে! এক জায়গায় দেখলাম, গ্যারি নেভিল বলেছেন, ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে চোট নিয়ে খেলতে নেমেছিলেন হ্যারি কেন। এ তো নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ক্রোয়েশিয়ার জয়কে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা। ইংল্যান্ড যে দ্বিতীয়ার্ধে খেলতে পারেনি, তা স্বীকার করতে লজ্জা কীসের?