এটাই কি সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ! চায়ের পেয়ালায় তুফানের ইন্ধন জুগিয়েছেন খোদ ফিফা প্রেসিডেন্টই। ফ্রান্সের হাতে কাপ ওঠার আগেই, মহা-উত্তেজক ফাইনালের আগেই, রাশিয়া বিশ্বকাপকে তিনি চিহ্নিত করেছেন ‘বেস্ট ওয়ার্ল্ড কাপ’ বলে!

বিশ্বকাপের শুরুর পর্বে বলা হচ্ছিল— এটা অঘটনের বিশ্বকাপ। ক্রমশ ‘অঘটন’ শব্দটা নেপথ্যে চলে গেল। খেলা যত এগলো, তত আলোচনায় উঠতে শুরু করল এ বারের বদলে যাওয়া ফুটবল। ‘বড়’-‘ছোট’র ফারাক ঘুচিয়ে দেওয়া ফুটবল। এবং অবশ্যই, মহাতারকাদের ছাপিয়ে যাওয়া দলগত সংহতির ফুটবল। এমন এক ফুটবল, যেখানে মাঠের প্রত্যেকটা স্পটের নিখুঁত হিসেব করে খেলতে নামছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম, সুইডেন, সুইত্জারল্যান্ডের মতো দলগুলোও। সমানে সমানে পাল্লা দিয়ে স্ট্র্যাটেজিতে আর টিম ফুটবলে লড়ে যাচ্ছে এত দিনকার ‘বড়’ দলগুলোর সঙ্গে। কখনও জিতছে, কখনও হারছে। কিন্তু লড়াই চলছে সমানে সমানে।

ফুটবলে হেভিওয়েট দল হিসেবে যাদের ধরা হয়— তাদের মধ্যে ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, স্পেন সেমিফাইনালের আগেই বিদায় নিয়েছে। ইতালি, নেদারল্যান্ডস আবার উঠতেই পারেনি মূলপর্বে। শেষ চার দলের মধ্যে বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ জেতার ইতিহাস নেই। বাকি দুই দল এর আগে বিশ্বকাপ জিতেছিল, তবে মাত্র এক বার করে। তার মধ্যে ইংল্যান্ড আবার ৬২ বছর আগে।

বেলজিয়ামের ফুটবলের মতো নজর কেড়েছেন সমর্থকরাও। ছবি: এএফপি।

তবে কি ভরকেন্দ্র পালটাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের!

এ বারের বিশ্বকাপ তেমন ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন। দুই মহাতারকা লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা আর ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগাল বিদায় নিয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। নেমারের ব্রাজিল আরও একধাপ এগিয়ে ছিটকে গিয়েছে। জার্মানির মতো দল গ্রুপেই শেষ। প্রশ্ন উঠছে, টিম ফুটবলের এই অসাধারণ উন্নতি, একসঙ্গে অনেক নতুন শক্তির উত্থান, দলে-দলে ফারাক কমে আসা কি বিশ্ব-ফুটবলে তারকা জমানার অবসান ঘটাতে চলেছে? একক স্কিলের ঝলকানিতে কাপ জেতা কি আর সম্ভব নয়?

প্রাক্তন ফুটবলাররা অনেকে কিন্তু তাই মনে করছেন। শিশির ঘোষ যেমন আনন্দবাজারকে বললেন, “মানতেই হবে, স্কিলের কোনও বিকল্প হয় না। কিন্তু, একটা মেসি দিয়ে এখন আর বিশ্বকাপ আসবে না। একটা রোনাল্ডো বা নেমার নিয়েও হবে না। এটা ঘটনা, স্কিলে মেসির ধারেকাছে কেউ আসবে না। তবে একা কেউ আর জেতাতে পারবে না। বরং পাঁচটা মদরিচ দরকার। তবে সাফল্য আসবে। ফুটবল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দলগত খেলা হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত স্কিলের ঝলকানি কমেছে অনেক। রাশিয়া বিশ্বকাপ সেটাই দেখাল।”

আরও পড়ুন: বিশ্বসেরা ফ্রান্সের এই স্ট্রাইকার একটাও গোল পেলেন না বিশ্বকাপে

ব্যাপারটা কি তবে ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়েছে আবেগ’-এর মতোই? উন্নতির সঙ্গে প্রাণের কি বিপরীত সম্পর্ক? কেউ কেউ সেই প্রশ্নও তুলছেন। এই বিশ্বকাপে ড্রিবল হয়ে উঠেছে মরুভূমিতে মরুদ্যানের মতোই মরীচিকা। সত্যজিত্ চট্টোপাধ্যায় যেমন বলেই দিলেন, “ড্রিবল হল জন্মগত প্রতিভা। ফুটবলের নান্দনিকতার সঙ্গে জড়িত। এ বারের বিশ্বকাপে মেসি, রোনাল্ডো, গ্রিজম্যান, হ্যাজার্ড ছাড়া কাউকে ড্রিবল করতে দেখলাম না। আমাকে তো অনেকেই বলল যে,বিশ্বকাপ দেখে মন ভরছে না। যত জমজমাট লড়াই হোক না কেন, যতই বড় দলের সঙ্গে ছোট দলের ফারাক কমুক, দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে না ফুটবল।” অর্থাত্,ফের বিরোধ। লড়াকু মানসিকতার সঙ্গে সৌন্দর্যের। ফুটবল তো শুধুই খেলা নয়। ফুটবল মানে হৃদয়ে সযত্নে সাজিয়ে রাখা কিছু স্মৃতি। যা ভাল লাগার।বিশ্বকাপ ফুটবল মানে সবুজ গালিচায় শিল্পের ফুল ফোটা। ক্যানভাসে রং-বেরঙের তুলির টান। নতুন কোনও ছবির জন্ম নেওয়া।

ব্রাজিল সমর্থকদের হতাশ করেছেন ফুটবলাররা। ছবি: এএফপি।

সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপ এনেছে অনেক চমক। গতবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি বিদায় নিয়েছে গ্রুপেই। যা ১৯৩৮ সালের পর এই প্রথম ঘটল। দক্ষিণ কোরিয়াও হারিয়েছে তাদের। এশিয়ার আর এক দল, জাপান উঠেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। মানস ভট্টাচার্যের চোখে এ বারের বিশ্বকাপ এশিয়ার উত্থানের ইঙ্গিতবহ হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, “এশিয়ার দেশগুলোকে তো ধর্তব্যের মধ্যে রাখা হয় না। বেশি গোল দিয়ে গোল-পার্থক্য বাড়িয়ে রাখার কথাই ভাবা হয়। এ বার কিন্তু জাপান,কোরিয়া বুঝিয়ে দিয়েছে, হালকা ভাবে নিলে ভুল হবে।”

ট্যাকটিক্সের ক্ষেত্রেও নতুনত্ব চোখে পড়েছে তাঁর। প্রাক্তন উইঙ্গার মানসের কথায়, “এ বার দেখলাম, অনেক দল ৩-৪-২-১ ছকে খেলছে। তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার নিয়ে নামছে। দুটো উইং হাফকে ব্যবহার করছে দারুণ ভাবে। ফ্রান্স যেমন পাভার্ড আর হার্নান্দেজকে এ ভাবেই ব্যবহার করল। বেলজিয়ামের মতো দল এক স্ট্রাইকার হিসেবে সামনে লুকাকুকে রাখল। আর আক্রমণের সময় হ্যাজার্ড, দি ব্রুইনরা যোগ দিল। আক্রমণে ত্রিভূজ-চতুর্ভুজ গড়ে উঠছে।” সত্যজিতের আবার এখানেই আক্ষেপ। এমন ভাবে গোলের সামনে ভিড় হয়ে থাকছে যে রক্ষণচেরা থ্রু হয়ে উঠেছে বিলুপ্ত প্রজাতির মতোই। প্রাক্তন মিডফিল্ডার বললেন, “এখন তো পেনিট্রেটিভ পাস বিশেষ দেখাই যাচ্ছে না। ফাঁকা জায়গাই মিলছে না। থ্রু তো দেওয়া হয় অ্যাটাকিং থার্ডে। সেখানে এখন আটজন ভিড় করে থাকছে!”

আরও পড়ুন: মাঠ থেকে ফ্রান্সের জয়ের উৎসব পৌঁছল লকার রুমে​

ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়ের অবশ্য মনে ধরেছে শক্তির ফারাক ঘুচে যাওয়া। তিনি সাফ বললেন, “এ বারের মতো লড়াই আগে কখনও দেখিনি। আমার তো এটা বেশ ভাল লেগেছে। এখন আর ছোট দল, বড় দল নেই। সব দেশের ফুটবলাররাই ইউরোপে খেলছে। ফলে সেরাদের বিরুদ্ধে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজের ওপর বিশ্বাস বাড়ছে।” ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবেই এখন বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা খেলেন। ফলে, সেখানে খেলে কেটে যাচ্ছে মানসিক প্রতিবন্ধকতা। ভাস্করের যুক্তি, “আঙুলে গোনা কয়েকটা দেশই শুধু দাপট দেখানোর জায়গায় নেই। রাশিয়ায় প্রত্যেক ম্যাচে লড়াই হয়েছে। কে জিতবে, আগাম বোঝা যাচ্ছিল না। এখন আর রোনাল্ডো একা ফারাক গড়তে পারবে না। পাশে উন্নত মানের সতীর্থও চাই।” উদাহরণ হিসেবে আইসল্যান্ড, সুইত্জারল্যান্ড, রাশিয়ার উদাহরণ টানছেন তিনি। এশিয়ান অলস্টার দলের একদা গোলরক্ষক বলেই দিলেন, “আমি তো বিশ্বকাপে এত লড়াই কখনও দেখিনি। সব দলের সম্মিলিত লড়াই ধরলে এটাই সেরা বিশ্বকাপ।”

 

লড়াইয়ের ইস্যুতে একমত শিশিরও। প্রাক্তন স্ট্রাইকারের দাবি, “আসলে হীনমন্যতা কেটে গিয়েছে। এখন প্রত্যেক দলে ফুটবলারের থেকে স্টাফের সংখ্যা বেশি। সারা বছর ধরে চলছে অঙ্ক কষা। জাপানও ছয় ফুটের ফুটবলার খেলাচ্ছে। বড় দলগুলো আবার একসঙ্গে অনুশীলনের সময়ই পাচ্ছে না বেশি। ক্লাবের হয়ে এত ব্যস্ত থাকছেন ফুটবলাররা। এক সময় বিশ্বকাপের জন্য লম্বা প্রস্তুতি নিত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। এখন তা না হওয়ায় বোঝাপড়ার সমস্যা হচ্ছে। ক্রোয়েশিয়া কিন্তু প্রায় মাস দুয়েক ধরে খাটাখাটনি করেছে।”

ফুটবলে কি তা হলে ফারাক আরও কমবে? মেসি-রোনাল্ডো-নেমারদের দিন কি তা হলে শেষ? ছিয়াশির দিয়েগো মারাদোনার মতো একক দক্ষতায় কাপ জেতা কি আর কখনই ফিরবে না? মানস দ্বিধাহীন, “না, ফিরবে না। ব্যক্তিগত দক্ষতায় বাজিমাতের দিন শেষ। মারাদোনার মতো আর হবে না। একায় হবে না,এখন দলই আসল। টোটাল ফুটবলই জাঁকিয়ে বসবে। আর এখন তো অনেক বেশি পজিটিভ ফুটবল দেখা যাচ্ছে।”এটা ঘটনা, মেসি বা রোনাল্ডো পাশে একঝাঁক দুর্দান্ত ফুটবলার পাননি। সতীর্থদের সঙ্গে এই দুই তারকার মানেও বিস্তর ফারাক ছিল। কিন্তু, ছিয়াশিতে মারাদোনাও তেমন প্রতিভাধরদের পাননি পাশে। তাতেও আটকানো যায়নি। একাই ছিনিয়ে এনেছেন কাপ। তবে কি আজকের টোটাল ফুটবলের চক্রব্যুহে মারাদোনার মতো জিনিয়াসও থমকে যেতেন? কে জানে! উত্তরটা ভবিষ্যতের জন্যই তোলা থাক। খেলাটার নাম ফুটবল, শেষ কথা কে কবেই বা বলতে পেরেছে...

আরও পড়ুন: জুভেন্টাসে পা রাখলেন রোনাল্ডো