×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৭ মে ২০২১ ই-পেপার

ভারতের এত শর্ট পিচ বৃষ্টি আনতে যাওয়ার কোনও দরকার ছিল না

গৌতম ভট্টাচার্য
ব্রিসবেন ২০ ডিসেম্বর ২০১৪ ০২:৪০

শিরোপাটা কেউ দেয়নি যদিও বকলমে তিনি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের মাইক ব্রিয়ারলি। স্থানীয় ক্রিকেটমহল অবশ্য ব্রিয়ারলির সঙ্গে তুলনায় প্রচণ্ড চটে যেতে পারে। তারা মনে করে, আধুনিক অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের রূপকার হিসেবে তাঁর অবদান ইংরেজ নেতার চেয়ে অনেক বেশি। বিধ্বস্ত একটা টিমকে তিনি ধারাবাহিক জয়ের রোড-ম্যাপ গড়ে দিয়ে যান। অস্ট্রেলিয়ার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও বছর দশেক আগে তাঁরই দখলে ছিল। সেই মার্ক টেলর শুক্রবার গাব্বায় বিশেষ সাক্ষাত্‌কার দিলেন এবিপি-কে।

প্রশ্ন: খেলাটা হঠাত্‌ই ঘুরে গেল।

Advertisement

টেলর: হ্যাঁ, পুরোটা ইন্ডিয়ার হাতেই ছিল। হাডিন আউট হওয়ার পর মনে হচ্ছিল ম্যাচটা ভারতের দিকে চলে গেল। সেখানে হঠাত্‌ করে ওরা কেন মাথা গরম করে অনবরত শর্ট পিচ করতে গেল কে জানে! এমনিতেই তো কাজ চলে যাচ্ছিল।

প্র: অ্যাডিলেডে ভারতীয় স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে আপনার কী মত? আকর্ষণীয় না খেলে ম্যাচটা ঘষটে ড্র করে দেওয়াই কি উচিত ছিল?

টেলর: না। অ্যাডিলেডে ড্র করতে গেলে ভারত উল্টে লাঞ্চের আগেই হেরে যেত। কোহলির অ্যাটিটিউডটা আমার দারুণ লেগেছে। আমি ওকে খেলার পর বলেও আসি, ভাই আজ অবধি যত বছর ক্রিকেট দেখছি, তোমার চেয়ে ভাল ফোর্থ ইনিংস নক আমি দেখিনি। আর কোহলির অ্যাটিটিউডটার জন্যই গাব্বায় ভারত এত ভাল লড়াই দিচ্ছে। আজ ভারতের হাত থেকে খেলা ঘুরে যাওয়ার কথা সবাই বলছে। আমায় বলুন তো, গত কুড়ি-তিরিশ বছরে গাব্বায় কবে ভারতকে এ বারের মতো জেতার সম্ভাবনা তৈরি করতে দেখেছেন? এই ছেলেগুলো যে এমন লড়াই দিচ্ছে আমি তো বলব তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব একা কোহলির। ও অ্যাডিলেডে দেখিয়েছে পজিটিভ খেলে জেতার চেষ্টা করব। অস্ট্রেলিয়ার মাঠে অস্ট্রেলিয়া তো কী! এই যে নতুন পেসারগুলোকে দেখছি ইন্ডিয়া টিমে। প্রায় প্রত্যেকে ঘণ্টায় ১৪০ কিমির ওপরে বল করে। এদের দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে হারাবার চেষ্টা করা ঠিক সিদ্ধান্ত, আগুনের বদলে আগুন। এ বার যদি বা না হয়, রাস্তা এটাই। আর সেটা দেখিয়েছে কোহলি। অ্যাডিলেডে ওদের ওই ৪৮ রানে হারার মধ্যেও এত বীরোচিত ভাব ছিল আমার আমৃত্যু মনে থাকবে।

প্র: এখানে সবার মুখে মুখে ঘোরে এক যে ছিল রিচি বেনো। আর তার পর হল এক মার্ক টেলর!

টেলর: বেনো মানে ভাষ্যকার বেনো যদি বলেন আমি বলব, উনি সবার আগে। কারও সঙ্গে কোনও তুলনাই হয় না। বেনোর পরে আমরা ছয়-সাত জন চ্যানেল নাইনের বাকিরা।

প্র: না, ক্যাপ্টেন হিসেবে বলছি।

টেলর: ক্যাপ্টেন হিসেবে তুলনাটা বাকিদের করাই ভাল। আমি ওটার মধ্যে ঢুকতে চাই না।

প্র: অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটমহল বলে ভাঙা একটা টিমকে তৈরি করে আপনি থালায় সাজিয়ে দিয়েছিলেন স্টিভ ওয়কে। আপনার ক্যাপ্টেন্সি মডেল কী ছিল? মাইক ব্রিয়ারলির বই?

টেলর: না, না। আর্ট অব ক্যাপ্টেন্সি আমি পড়িনি। ব্রিয়ারলির প্রভাব আমার ওপর সে ভাবে পড়েনি। উনি আমার সময়ের বেশ আগে। ওঁর সঙ্গে কয়েক বার কথা হয়েছে। ক্রিকেট ক্যাপ্টেনদের একটা অদ্ভুত অভ্যাস হল, নিজেদের মধ্যে দেখা হলেই তারা নোট এক্সচেঞ্জ করতে বসে যায়। অনেকের আবার অভ্যেস আছে খুঁটিয়ে লক্ষ করার— বিপক্ষ ক্যাপ্টেন কী করছে, দেখি তো! আমি এই দলে পড়ি। ভারতের সঙ্গে খেলার সময় খুব মন দিয়ে দেখতাম আজহার কী ভাবে ওর ফিল্ডিং সাজাচ্ছে। স্লো বোলারের জন্য স্লিপটা কোথায় সরালো? ব্যাট-প্যাড কখন আনছে? কোথায় রাখছে? এর পর নিজেকে ঠিক করতে হয় ওর কোনটা নেব? কোনটা ছাড়ব?

প্র: ভাবাই যায় না তো মার্ক টেলর যে অনুকরণ করছিলেন আজহার থেকে? যাঁকে অধিনায়ক হিসেবে কেউ নম্বরই দেয় না।

টেলর: ঠিক অনুকরণ করিনি। স্লো বোলারদের ব্যাপারে আসলে ছোটবেলা থেকেই আমার একটা রোম্যান্স ছিল। আসলে আশেপাশে অনেক স্পিনার ছিল যাদের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি। বারবার মনে হত এদের কী করে ঠিকঠাক কাজে লাগানো যায়? এর পর ওয়ার্নকে পেয়ে গেলাম।

প্র: ওয়ার্ন আজও বলেন আপনার সমর্থন ছাড়া ওঁর এত দ্রুত উত্থান সম্ভব ছিল না।

টেলর: ওয়ার্ন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এত রকম মশলা নিয়ে এসেছিল যে ওর ফুলকিটা চোখে পড়ার মতোই ছিল। সচিন ভার্সেস ওয়ার্ন আমি কখনও ভুলব না। চ্যাম্পিয়ন বোলার বনাম চ্যাম্পিয়ন ব্যাটসম্যান। কখনও এ জিতছে তো কখনও ও জিতছে।

প্র: ভারতে তো বারবার সচিনই জিতেছেন!

টেলর: ইন্ডিয়ার চ্যালেঞ্জটা মনে থাকবে। টেস্ট সিরিজের আগে বম্বেতে একটা ম্যাচ খেললাম। সচিন সেখানে ডাবল সেঞ্চুরি করল। আমি ওয়ার্নকে বললাম, কী করে কিছু করো টেস্টের আগে। কী মার মারল। বলল, স্কিপার দেখছি। চেন্নাইয়ে যখন ও ব্যাট করতে এল, আমি জানতাম শুরু থেকে চালাবে। চালানোর আগেই ওয়ার্ন ওকে নিয়ে নিল। সেকেন্ড ইনিংসে যখন নামছে আমি জানতাম আরও অ্যাগ্রেসিভ হবে। কিন্তু আমরা তো ওর জন্য তাস তুলেই রেখেছি। এ বার ওয়ার্ন আসবে রাউন্ড দ্য উইকেট। এসে রাফে বল ফেলবে। আর সচিনের দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য করে দেবে। তা ওয়ার্ন রাউন্ড দ্য উইকেট আসার পর সচিন দু’টো মারল গ্যালারির কুড়ি ফুট ওপরে। আমি গিয়ে ওয়ার্নকে বললাম, কী করে কী হচ্ছে? ও বলল, টেস্টটা হারব (হা হা)। ওয়ার্নের মুখ দিয়ে এমন কথা বেরনো ভাবাই যায় না।

প্র: ওয়ার্ন নিয়ে আর একটা বড় হার আপনার ছিয়ানব্বই বিশ্বকাপ ফাইনালে। আবার যদি জয়সূর্যদের বিরুদ্ধে ওই ম্যাচটা খেলতে হয়, কী কী জিনিস বদলাবেন?

টেলর: প্রথমত, টিম নিয়ে মাঠে তড়াতাড়ি পৌঁছব। জানতামই না যে গদ্দাফিতে খেলা ঠিক সময় শুরু হবে। আগের দিন বৃষ্টি হওয়াতে বলেছিল, খেলা শুরু হতে দেরি হবে। সেই মতো রিল্যাক্স করে মাঠ দেখতে এসেছিলাম। হঠাত্‌ আমায় বলা হল, না টাইম নেই। শুরু হবে। তখন তাড়াহুড়ো করে টিমকে ডাকলাম। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই আমাদের ফাইনালে নামতে হয়েছিল। ও ভাবে কাপ ফাইনাল সম্ভব নাকি! আর একটা জিনিস বদলাব, আমি ৭৩ করে আউট হয়ে যাব না (হাসি)। মানে ওই সময় সুইপ শটটা খেলব না...আর অর্জুনের জন্য প্রথম থেকেই স্লিপ রাখব। ম্যাকগ্রার ডেলিভারিটা ওর ব্যাট ছুঁয়ে প্রথম স্লিপ দিয়েই গিয়েছিল।

প্র: রণতুঙ্গা তো আপনাদের পিছনে পড়ে গিয়েছিলেন।

টেলর: হ্যাঁ। খেলা ছাড়ার পরে আমি বুঝেছি পুরো ব্যাপারটাই ওর চালাকি ছিল। ও ঠিক জানত, কী করলে আমরা উত্ত্যক্ত হব। অস্ট্রেলিয়াকে ও চটাতে জানত। আমরা মাথা গরম করে নিজের কাজটা ভুলে যেতাম। আর ও দিব্যি কাজ হাসিল করে চলে যেত। সেই সময় আমার ওকে ছোটখাটো গুণ্ডা মনে হত। খেলা ছাড়ার পর দেখলাম, মোটেও ও তেমন নয়। অর্জুন যথেষ্টই ভদ্র। তখন আমি বুঝলাম আমাদের বোকা বানিয়ে আড়ালে নিশ্চয়ই প্রচুর হেসেছে। অথচ ট্যাকটিক্যালি অর্জুন মোটেও আহামরি কিছু ছিল না। ওর পুরোটাই ছিল টিমকে টগবগে রাখা আর বিপক্ষকে জ্বালিয়ে রাখা বিরক্তিতে।



প্র: উপমহাদেশ থেকে রণতুঙ্গাই কি আপনার দেখা সবচেয়ে প্রভাবশালী অধিনায়ক?

টেলর: না, ইমরান খান। ইমরান অধিনায়ক হিসেবে দিশারি ছিল। শুধু ভাল নয়। সেই কবে বিরানব্বই বিশ্বকাপে ও বলেছিল, ওর ওয়ান ডে ম্যাচ জেতার আসল চাবিকাঠি হল বিপক্ষের উইকেট তোলা। যখন বলেছিল, তখন সব দেশ রান কমিয়ে ওয়ান ডে জেতার কথা ভাবত। ইমরান প্রথম আক্রমকে বলে, ওয়াইড, নো বল নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমার উইকেট চাই। আমিও সেই বিশ্বকাপে খেলছিলাম। আমার মনে হল তাই তো! এটা তো আমারও আগেই মাথায় আসা উচিত ছিল!

প্র: আপনি এত বিনয় করছেন কেন? অধিনায়ক হিসেবে আপনাকেও তো ক্রিকেট বিশ্ব দিশারি বলে জানে। মার্ক টেলরের অধিনায়কত্বের মূলমন্ত্রটা বলবেন প্লিজ?

টেলর: মূলমন্ত্র হল বিপক্ষ ঠিক যা চাইছে না, সেটাই তাকে দাও। বিপক্ষ ব্যাটসম্যান হয়তো বিশেষ কোনও বোলারকে ওই সময় খেলতে চাইছে না। ক্লোজ ইনে হয়তো লোক চাইছে না। ঠিক তখন তাকে সেটাই দিতে হবে। অধিনায়কের এটা বোঝার ঘ্রাণশক্তি থাকতে হবে যে, অন্য টিমটার কীসে কীসে কখন অরুচি।

প্র: অধিনায়ক হিসেবে যত ব্যাটসম্যান দেখেছেন, কঠিনতম কাকে মনে হয়েছে?

টেলর: আমি যা দেখেছি বা খেলেছি, তাতে সচিন এক। গ্রেগ চ্যাপেল দুই। লারা তিন।

প্র: একটু ব্যাখ্যা করুন।

টেলর: সচিন সবচেয়ে কমপ্লিট। কোনও সুযোগই দিত না। লারা দারুণ, কিন্তু সুযোগ দিত।

প্র: ভিভ আসবেন না প্রথম তিনে?

টেলর: না। আমি যখন খেলেছি বা দেখেছি এইট্টিজের সেই সময়টা ভিভের ফর্ম আহামরি ছিল না।

প্র: আপনার নিজের একটা ৩৩৪ রানের ইনিংস আছে যেখানে ব্রায়ান লারার তখনকার ৩৭৫ মাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকেও আপনি নেননি।

টেলর: ঠিক, পেশোয়ার টেস্টে। না, আমার মনে হয়েছিল টিমের জেতাটা আগে। ব্রায়ানের রেকর্ড ভাঙাটা জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় হতে পারে না। ওটা একক কীর্তি। কিন্তু তার চেয়ে অনেক জরুরি হল অস্ট্রেলিয়ার জেতা।

প্র: লারা আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন-টোন করেননি।

টেলর: নাহ্। ব্রায়ানের সঙ্গে ওটা নিয়ে কোনও দিন কথা হয়নি।

প্র: সে দিন আপনার নিজের অপরাজিত ৩৩৪ রানে ডিক্লেয়ার করে দেওয়ার পিছনে আর একটা কারণ শোনা যায়। আপনি নাকি ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড ভাঙতে চাননি। টেস্টে ব্র্যাডম্যানের সর্বোচ্চ রান যেহেতু ৩৩৪।

টেলর: এটা একটা কারণ তো নিশ্চয়ই। আমি ভেবেছিলাম পরের দিন ওদের একবার মাঠে নামাব, জাস্ট মাঠে নামাবার জন্য। একটু খাটান দিয়ে পাকিস্তান যাতে সেকেন্ড ইনিংস শুরু করে। তার পর দেখলাম ওটা করলে আমি কত রান আর যোগ করব? ১৫? তাতে আমার রান দাঁড়াবে ৩৪৫। কী লাভ তাতে? শুধুমুধু স্যর ডনের রেকর্ডটা ভাঙবে। এমন তো নয় যে জেতার জন্য ওই রেকর্ডটা আমায় ভাঙতেই হচ্ছে। সেটা এমনিতে হয়ে যাবে কারণ আমাদের ছ’শো রান লিড হয়ে গিয়েছে। তাই রেকর্ডটা আর ভাঙিনি।

প্র: আপনি কি বরাবর এমনই ক্রিকেট-রোম্যান্টিক?

টেলর: না, আমি বরঞ্চ প্র্যাকটিক্যাল। আমার মনে হল যখন দরকারই হচ্ছে না এত বড় কীর্তিকে ভাঙতে যাব কেন? ওর সঙ্গে যুগ্ম স্থানে আছি, এটাও তো কত সম্মানের।

প্র: ব্র্যাডম্যান রেগেটেগে যাননি তো যে কোথাকার কোন ছোকরা আমায় দয়া দেখালে?

টেলর: আরে, না না। ব্র্যাডম্যান খুব খুশি হয়েছিলেন। আমায় চিঠি লিখে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়িতে ডাকলেন। দু’ঘণ্টা সে দিন ওঁর বাড়িতে আড্ডা দিয়েছিলাম। ভাবাই যায় না। অনেক কথা বলেছিলেন। প্রথমেই বললেন, তোমার ক্যাপ্টেন্সিতে অস্ট্রেলিয়া যে ভাবে খেলছে আর জিতছে আমি খুব খুশি। তার পরই উনি গম্ভীর হয়ে গেলেন। বলো তো, এই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ব্যাপারটা কী হচ্ছে! তখন সেলিম মালিকের ব্যাপারটা নিয়ে মিডিয়ায় খুব চর্চা চলছে। ভাবিনি উনি সে সব খবর রাখেন। বারবার বললেন, ম্যাচ গড়াপেটা থামাতে না পারলে কিন্তু ক্রিকেটকে ধ্বংস করে দেবে। অবাক লেগেছিল ১৯৯৮ সালে বসেও মডার্ন ক্রিকেটের খুঁটিনাটি সব উনি খোঁজ রাখেন।

প্র: ওটাই শেষ দেখা?

টেলর: হ্যাঁ, উনি আরও দু’বছর বাদে চলে গেলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। ওই দু’ঘণ্টার আড্ডাটাই আমার কাছে ওঁর সেরা স্মৃতি।

Advertisement