Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৯ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

আকস্মিক সিদ্ধান্তে বেনজির মেরুকরণ

তাঁর হেলিকপ্টার শটগুলো ব্যাটে সংযোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবধারিত মাঠের বাইরে চলে যায়। অথচ এটা হতে হতেও সংশয়াতীত ভাবে মাঠের বাইরে পৌঁছল না! বরঞ্

গৌতম ভট্টাচার্য
কলকাতা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ ০৩:০৩

তাঁর হেলিকপ্টার শটগুলো ব্যাটে সংযোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবধারিত মাঠের বাইরে চলে যায়। অথচ এটা হতে হতেও সংশয়াতীত ভাবে মাঠের বাইরে পৌঁছল না!

বরঞ্চ মহেন্দ্র সিংহ ধোনির স্ট্রোকের ভাগ্য যেন থার্ড আম্পায়ারের এজলাসে। যেখানে নিষ্পত্তি হওয়া বাকি থেকে গেল, সত্যিই স্পেশ্যাল স্পেশ্যাল ছক্কা? না ধৈর্য হারিয়ে লাইনের ওপর ক্যাচ?

তাঁর জীবনের সব চেয়ে বড় স্ট্রোকে নজিরবিহীন বিভাজন এনে দিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেটের দশ বছর পুরনো অধিনায়ক। গরীয়ান সেনাপতির স্ব-ইচ্ছায় এ রকম শরশয্যায় চলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত দেশজ ক্রিকেটে এই নিয়ে ঘটল চার বার।

Advertisement

লয়েডের দলের কাছে ২-৩ সিরিজ হেরে টাইগার পটৌডি। বেনসন অ্যান্ড হেজেস চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠে সুনীল গাওস্কর। ২০০৭-এর ইংল্যান্ড সিরিজ জিতে রাহুল দ্রাবিড়। রাহুলেরটা এর মধ্যে সব চেয়ে রোমহর্ষক। কেন ছাড়লেন, আজও কোথাও বলেননি। গ্রেগ চ্যাপেলের বলার জন্য মুখ নিশপিশ করছে। কিন্তু রাহুল অনুমতি দেননি।

চিত্রনাট্য হিসেবে রাহুলেরটা সব চেয়ে জমজমাট হয়েও মনোযোগী দর্শক কখনওই তেমন উৎসাহ দেখায়নি। কেউ জানতে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, চলে যাচ্ছেন কেন? আর স্বপ্নেও কখনও সেটা নিয়ে মঙ্গলবারের মতো তীব্র মেরুকরণ হয়নি যে, ধোনি নিজে ছেড়ে দিলেন? নাকি ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন? ক্রিকেট-সততার ডাক? নাকি মস্তিষ্কের চতুর ছলাকলার?

ভারতের সর্ব কালের সফলতম অধিনায়ক সম্পর্কে তাঁর বিরোধীদের সর্ব শেষ এমআরআই রিপোর্টটি হল, ‘ও ছিল এক রকম। ২০১১ সালের দোসরা এপ্রিল, বিশ্বকাপ ফাইনালের রাত থেকে হয়ে গেল আর এক রকম।’

এঁরা ধোনি-টু-র যাবতীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে প্যাঁচপয়জার আর ফন্দি-ফিকির দেখেন। দেখেন একনায়ক-সুলভ মনোভাব। দেখেন এক কালের বন্ধু ক্রিকেটারদের প্রতি ন্যূনতম সহমর্মিতার অভাব। এত বড় বটগাছ আচমকা স্ব-ইচ্ছায় ভূপতিত টেস্ট ক্রিকেট থেকে। অথচ বারো ঘণ্টা পরেও তাঁর পুরনো সহকর্মীদের অর্ধেকের কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। কী হরভজন, কী সহবাগ, কী জাহির, কী যুবরাজ, কী গম্ভীর।

আজহার বাদ দিয়ে আর কোন ভারত অধিনায়কের এই পরিমাণ তাচ্ছিল্য আর ঘৃণা জুটেছে?



চিন্তার তীব্র মেরুকরণ এ জন্যই যে, একই সিদ্ধান্তে ধোনি আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছেন ভারতীয় ড্রেসিংরুম। এমনকী সতত কাঠখোট্টা টিম ডিরেক্টরকেও। এত বড় সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই আগাম ঠিক করা ছিল। অথচ পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে মার্ক নিকোলাসকে একটা কথাও বলেননি। অস্ট্রেলিয়া দেরিতে ডিক্লেয়ার করল কি না, এই প্রশ্নেরও জবাব দিতে অস্বীকৃত হলেন। যা ঘোরতর আশ্চর্য, কারণ তখন তো জেনে গিয়েছেন তাঁর আর কিছু হারানোর নেই। সাবধানী হওয়ারও নেই। যা হোক, এর পর গেলেন সাংবাদিক সম্মেলনে। সেখানেও কোনও কথা নয়। ভারত অধিনায়ক হিসেবে যেমন রেকর্ডের পরীক্ষায় তাঁর পাশে কেউ নেই, তেমন আজকের পর থেকে সংযমের পরীক্ষাতেও কেউ পাশে নেই। পৃথিবীর কোনও দেশে কেউ কখনও শোনেনি তার অধিনায়ক সরে গিয়েছে মিডিয়াকে এমন সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রেখে।

আর যে কেউ হলে হিসেব করত, দশটা টেস্ট হলেই শততম খেলব। মোট রান নিয়ে যাব পাঁচ হাজারে। পরের বছরটা উপমহাদেশের বাইরে সিরিজ নেই। দেশে আরামে ক্যাপ্টেন্সি করব আর জিতব। আমার জন্য একটা ফেয়ারওয়েল ম্যাচ করিয়ে নেব। গোটা দেশ আর মিডিয়া আমাকে নিয়ে ছয়লাপ থাকবে। আমার বিজ্ঞাপনের বাজার আরও তেজি হয়ে থাকবে।

তিনি মহেন্দ্র সিংহ ধোনি এ সব ভাবেনইনি। অনেকের মনে হচ্ছে, মুদগল কমিটির রিপোর্ট বার হলে ভয়ঙ্কর চাপ তৈরি হতে পারে অনুমান করে আগাম নায়ক হয়ে সরে গেলেন ধোনি। মনে হচ্ছে, পুরো ব্যাপারটা স্রেফ ডিজাইন।

এমএসডিকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা কিন্তু একমত হওয়ার কোনও কারণই দেখবেন না। বরং তাঁদের মনে হবে, চিন্তায়-মননে-কর্মে এমন অ-নাটুকে থাকাটাই বারবার অভ্যেস করে এসেছেন ধোনি। তাঁর বিদায়ী ম্যাচ চাই না। সংবর্ধনা চাই না। রঙিন বিদায় চাই না। আজ পর্যন্ত বলেননি ওয়াংখেড়ের কাপ ফাইনালে ম্যাচ জেতানো ইনিংসের মাঝে ঠিক কী ভাবছিলেন? আসলে ভারতীয় ক্রিকেটে একেবারেই তাঁর কোনও প্রোটোটাইপ নেই। কোনও পূর্ব-দৃষ্টান্ত নেই যে, তারকা ক্রিকেটার হয়েও বাহুল্যের প্রতি তার এমন বিকর্ষণ। কাদম্বরী যেমন মরিয়া প্রমাণ করিয়াছিল সে মরে নাই। তেমনই নীরবে নিজের অধিনায়কত্ব হাড়িকাঠে দিয়ে ধোনি যেন প্রমাণ করে গেলেন, তিনি সত্যিই রংহীন, আবেগহীন দর্শনে বিশ্বাসী।

অনেকে মনে করেন, ক্যাপ্টেন হওয়ার পর ধোনি আমূল বদলেছেন। যেমন বদলেছেন বিশ্বকাপ জেতার পর। হতেই পারে। কিন্তু যেটা বদলায়নি সেটা হল তাঁর বেপরোয়া মনোভাব। আমি এ ভাবে ভেবেছি, অতএব এ ভাবেই দেখব। নিজের মতে চলব সে আমার অবস্থান যা-ই হোক না কেন।

অ্যাডাম গিলক্রিস্টও একই ভাবে একটা টেস্টে দু’টো বল মিস করেই সিরিজের মধ্যে অবসরে চলে যান। ধোনি তখন বিপক্ষ দলে খেলছেন। সেই সিদ্ধান্ত তাঁকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয় না। তিনি শুধু বরাবরের বেপরোয়া নন, কখনও কখনও গোঁয়ার।

সাত বছর আগে যখন তিনি টিম চ্যাপেলের জুনিয়র এক সৈনিক এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে, তখনও তো অভাবিত মনোভাব দেখিয়েছিলেন! টেস্টের মধ্যে ক্যাস্ট্রল পুরস্কার বিতরণ ছিল। যেখানে সচিন তেন্ডুলকর থেকে শুরু করে টিম ম্যাসিওর অবধি সবাই হাজির। একে তো টিম হোটেলে অনুষ্ঠান হচ্ছে। তার ওপর বকলমে সুনীল গাওস্করের অনুষ্ঠান। কার ঘাড়ে ক’টা মাথা আছে, যাবে না? শেষ পর্যন্ত একটা পুরস্কার নিতেই তার প্রাপক আসেননি। বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিমান ক্রিকেটারের পুরস্কার।

পরের দিন বিকেলে প্রাপককে তাঁর হোটেলের ঘরে না আসার কারণ জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, “ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! তা ছাড়া অ্যাওয়ার্ড দিয়ে কী হবে?” গাওস্করের দেওয়া পুরস্কার নেবেন না? এর তো অন্য ব্যাখ্যা হবে। আরও অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন, “মিস্টার গাওস্করের সঙ্গে আমার কখনও আলাপ হয়নি!”

বক্তা অবশ্যই এমএসডি। আর যখন বলছেন আলাপ হয়নি, ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর তিন বছর কাটানো হয়ে গিয়েছে।

ঝাড়খণ্ডীর মিডিয়ার প্রতি বীতরাগ প্রকাশ এবং কার্যত বয়কট করে রাখাও ক্যাপ্টেন হওয়ার অনেক আগে শুরু। ক্যাপ্টেন হয়ে সেটাকে তিনি একটা পূর্ণাঙ্গ টেমপ্লেট বানিয়ে ফেলেন।

মিডিয়ার সামনে মুখ না খুললেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধোনি বারবার বলেছেন, টেস্ট ক্রিকেট অধিনায়কত্ব তিনি দারুণ কিছু উপভোগ করেন না। আভাস দিয়েছেন, তিন ফর্ম্যাটের মধ্যে প্রথমে টেস্ট ক্রিকেটই ছাড়বেন। সেই আলোচনার শ্রোতারা এ দিনের আচমকা অবসরের সিদ্ধান্তে যতটা না আশ্চর্য, তার চেয়ে বরং বেশি আশ্চর্য টেস্ট জীবনকে তিনি এত লম্বা করলেন দেখে।

আর একটা কথাও বলে এসেছেন অনেক বড় বড় প্লেয়ারকে দেখেছি। ছেঁচড়ে পড়ে আছে। যদি আবার টিমে ফিরতে পারে। আমি কখনও এই অবস্থার মধ্যে নিজেকে নিয়ে যাব না। আমাকে কেউ পিঠে হাত দিয়ে বলবে না, “এই, এ বার যাও।” আমি নিজেই চলে যাব। সেই চলে যাওয়াটা এমন মর্মান্তিক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে যাবে তখন কারও হৃদয়াঙ্গম হয়নি। আসলে কেউ ভাবেইনি ভারতীয় ক্রিকেটে এই জিনিস ঘটতে পারে। কেউ এই পরিমাণ সাহস দেখাতে পারে!

আবার কারও কারও মনে হচ্ছে, সাহস যদি তোমার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যই হয়, সেটা দেখাতে এত দেরি করলে কেন বাবা? ধোনিকে যিনি অধিনায়ক বানিয়েছিলেন, মঙ্গলবার সকালে তাঁর সঙ্গে অপ্রত্যাশিত দেখা হয়ে গেল পূর্ব কলকাতার পাঁচতারা হোটেলে!

“ধোনির ক্যাপ্টেন্সিটা দেখছি অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছে। কী সব বিদঘুটে ফিল্ড সাজাচ্ছে। টেল-এন্ডারদের কী করে আউট করবে, কোনও মাথামুণ্ডুই নেই। হঠাই যেন খেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে,” এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন দিলীপ বেঙ্গসরকর। সেই আমলের নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যানের মতোই অনেকের মনে হচ্ছিল, বিদেশে ষষ্ঠ সিরিজ হারের পরেও কি ধোনির অপসারণ হবে না?

ধোনি নিশ্চয়ই এমন বিদায়ী অভ্যর্থনা চাননি। এটাও তো ক্রিকেট-সমাজের মনশ্চক্ষে এক রকম ছেঁচড়ে থাকা যে, যত দিন টানা যায় টানব। এমন আলোচনাও তাঁর অসহ্য হওয়া উচিত যে, ভারতীয় ড্রেসিংরুম আবেগে মূহ্যমান হওয়ার দিনেই (সূত্র রবি শাস্ত্রী) টুইট বার হচ্ছে, ‘আপনি যদি তরবারির মস্তানি করে জীবন কাটানো মনস্থ করেন, তা হলে সেই তরবারিই আপনার মৃত্যু ডেকে আনবে।’

আজকের পর থেকে এমএসডি-সম্পর্কিত কোনও কিছুই আর ক্রিকেটজনতাকে অবাক করবে না। যদি বিশ্বকাপ খেলে উঠেই ওয়ান ডে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন, তা হলেও না।

মহেন্দ্র সিংহ ধোনি বোধ হয় এখনকার মতো ভারতীয় ক্রিকেটে থেকে গেলেন যুগ্ম-অবস্থানে। আধুনিক ভারতীয় ক্রিকেটের সেরা পুরস্কার। আবার সেরা প্রহেলিকাও।

মেলবোর্নের স্কোর

অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ৫৩০
ভারত প্রথম ইনিংস: ৪৬৫

অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস (আগের দিন ২৬১-৭)

মার্শ রান আউট ৯৯
হ্যারিস ক ধোনি বো শামি ২১
লিয়ঁ ন.আ. ১
হ্যাজলউড ন.আ. ০
অতিরিক্ত ২০
মোট ৩১৮-৯ ডি.


পতন: ৫৭, ৯৮, ১৩১, ১৬৪, ১৭৬, ২০২, ২৩৪, ৩০৩, ৩১৭।
বোলিং: উমেশ ২২-৩-৮৯-২, শামি ২৮-৪-৯২-২, ইশান্ত ২০-৫-৪৯-২, অশ্বিন ২৮-৪-৭৫-২।

ভারত দ্বিতীয় ইনিংস

বিজয় এলবিডব্লিউ হ্যাজলউড ১১
ধবন এলবিডব্লিউ হ্যারিস ০
রাহুল ক ওয়াটসন বো জনসন ১
কোহলি ক বার্নস বো হ্যারিস ৫৪
রাহানে ক মার্শ বো হ্যাজলউড ৪৮
পূজারা বো জনসন ২১
ধোনি ন.আ. ২৪
অশ্বিন ন.আ. ৮
অতিরিক্ত ৭
মোট ১৭৪-৬

পতন: ২, ৫, ১৯, ১০৪, ১৪১, ১৪২।
বোলিং: জনসন ১৫-৩-৩৮-২, হ্যারিস ১৬-৮-৩০-২, হ্যাজলউড ১৫-৩-৪০-২, লিয়ঁ ১২-০-৩৬-০, ওয়াটসন ৬-১-১৪-০, স্মিথ ২-০-১০-০।

আরও পড়ুন

Advertisement