Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৪ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

এক ফোনেই ইডেনের বিয়েবাড়ি শ্রাদ্ধবাসর

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় জীবনে এমন বিদঘুটে ঘটনা দেখেননি তো বটেই, শোনেনওনি। সিরিজের মাঝপথে একটা টিম দুম করে ‘খেলব না’ বলে চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে টাক

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ১৮ অক্টোবর ২০১৪ ০৩:৩৭
Save
Something isn't right! Please refresh.
তবু অনুষ্ঠান চলছে। ব্যাটে সই নেওয়া হল প্রাক্তন ক্রিকেটারদের। (বাঁ দিক থেকে) চুনী গোস্বামী, শ্যামসুন্দর মিত্র, সেলিম দুরানি, প্রণব রায় এবং সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার ইডেনে। ছবি: উত্‌পল সরকার

তবু অনুষ্ঠান চলছে। ব্যাটে সই নেওয়া হল প্রাক্তন ক্রিকেটারদের। (বাঁ দিক থেকে) চুনী গোস্বামী, শ্যামসুন্দর মিত্র, সেলিম দুরানি, প্রণব রায় এবং সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার ইডেনে। ছবি: উত্‌পল সরকার

Popup Close

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় জীবনে এমন বিদঘুটে ঘটনা দেখেননি তো বটেই, শোনেনওনি। সিরিজের মাঝপথে একটা টিম দুম করে ‘খেলব না’ বলে চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে টাকা-পয়সা নিয়ে সমস্যার কারণে— কী ভাবে যে ঘটে বুঝতে পারছেন না তিনি। সিএবি-র দোতলায় নিজের ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে সৌরভ বলছিলেন, “আনপ্রিসিডেন্ট। পেমেন্ট নিয়ে জটে কোনও টিম সিরিজই খেলবে না বলে চলে যাচ্ছে, আমি কখনও দেখিনি। ওদের খেলা উচিত ছিল।”

প্রবীর মুখোপাধ্যায় ক্ষিপ্ত। দৃশ্যত উত্তেজিত। ইডেনের অশীতিপর কিউরেটর গত কয়েক দিন অবিরাম বৃষ্টির মধ্যেও পিচ নিয়ে শেষ মুহূর্তের কাজকর্ম চালিয়ে গিয়েছেন। আচমকাই শুক্রবার দুপুরে খবর পান, যে কারণে এত খাটাখাটনি, সেই ম্যাচটাই হচ্ছে না! ওয়েস্ট ইন্ডিজ ধর্মশালা থেকেই দেশে ফিরে যাচ্ছে! সন্ধের ইডেন-অনুষ্ঠানে রীতিমতো ফুঁসছিলেন প্রবীরবাবু। “এরা ক্রিকেটার? ক্রিকেটার কাকে বলে জানে এরা? টাকার জন্য খেলতে নামো তো ক্রিকেটটা খেলো কেন ভাই? বাড়িতে বসে থাকলেই তো হয়। এত কষ্ট করে পিচ তৈরি করলাম, আর এক মুহূর্তে বলে দিল খেলব না!”

সেলিম দুরানি বিহ্বল। কিছুতেই যেন দু’টো প্রজন্মের মধ্যে মিল খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ বলতে বোঝেন, গ্যারি সোবার্স। রোহন কানহাই। রাজকীয় টিম, মহারাজকীয় মানসিকতা। ডোয়েন ব্রাভোদের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তাই অচেনা লাগে। “ওয়েস্ট ইন্ডিজ এটা করবে ভাবতে পারিনি। ওরা না হয় খেলে তার পর সিদ্ধান্তটা নিত,” সিএবি-অনুষ্ঠান থেকে বেরনোর সময় বলছিলেন দুরানি। বহু দিন পর শহরে এসেছিলেন। ইচ্ছে ছিল, মাঝের ক’টা দিন কাটিয়ে, ম্যাচটা দেখে ফিরবেন। ম্যাচ দূরের ব্যাপার, দুপুর নাগাদই তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল আপনার ট্র্যাভেল অ্যারেঞ্জমেন্ট তা হলে কী হবে? ফিরবেন কবে?

Advertisement

সিএবি কর্তারা স্তব্ধ। প্রেসিডেন্ট জগমোহন ডালমিয়া— দেখা গেল না। বাকি উচ্চপদস্থ কর্তাদের কেউ কেউ সন্ধের দিকে বেরিয়ে গেলেন। কেউ আবার রাত আটটা পর্যন্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে ক্রমাগত অভিশাপ-বর্ষণ করে চলেছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ডকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারদের।

আজ থেকে নাকি ইডেন দু’টো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মনে রাখবে। একটা টিমকে মনে রাখবে তাদের মহানুভবতার জন্য। ’৬৭-র গ্যারি সোবার্সের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ইডেন দর্শকদের উন্মত্ততা সহ্য করেও যারা প্রথমে খেলব না বলে পরে ম্যাচ শেষ করতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। ফ্র্যাঙ্ক ওরেল ও সোবার্স মিলে যে ম্যাচ টিমকে বাধ্য করেছিলেন শেষ করতে। আগুনে জ্বলতে থাকা ইডেন গ্যালারির উপরে চড়ে জাতীয় পতাকাকে বাঁচিয়েছিলেন এক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার—কনরাড হান্ট!

আর দ্বিতীয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ডোয়েন ব্রাভোর ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ইডেন তাদেরও মনে রাখবে। মনে রাখবে, ভারতের অন্যতম সেরা ক্রিকেটমাঠকে তার সার্ধশতবর্ষে অপমান উপহার দেওয়ার জন্য। টাকা-পয়সা নিয়ে নিজেদেরই আভ্যন্তরীণ ঝামেলার কারণে।

সিএবি-তে বিস্ফোরণটা ঘটে দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ। যখন বর্তমান ভারতীয় বোর্ডের অলিখিত প্রেসিডেন্ট নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসনের ফোন পান সিএবি কর্তারা। সকালের দিকে দিনব্যাপী এমন আসন্ন মহানাটকের কোনও আঁচও ছিল না। সিএবি কর্তারা বরং তখন ব্যস্ত ইডেনে ক্রিকেটের সার্ধশতবর্ষ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে আগামী সোমবার ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচকে কী ভাবে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, তা নিয়ে।

তখন বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা হচ্ছে যে, দু’দেশের দশ অধিনায়ক ইডেন ম্যাচের দিন থাকবেন। সুনীল গাওস্কর, কপিল দেব, রাহুল দ্রাবিড় থেকে শুরু করে ক্লাইভ লয়েড কেউ বাদ যাবেন না। দেড়শো লেখা বিশাল এক কেক কাটানো হবে যাঁদের দিয়ে। আইপিএল উদ্বোধনী ম্যাচ বা ফাইনালে যেমন আলোর ঝর্ণার মধ্যে দিয়ে হেঁটে মাঠে যান ক্রিকেটাররা, এখানেও সেটা করা হবে।

কিন্তু পরের দু’ঘণ্টায় পরিস্থিতির গতিমুখ নাটকীয় ভাবে পাল্টে যায়। শ্রীনি ফোন করে সিএবি কর্তাদের বলেন যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটাররা বোর্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে তিন বার কথা বলেও কোনও লাভ হয়নি। বাকি ওয়ান ডে সিরিজ, টেস্ট সিরিজ সমস্ত বাতিল করে দিতে হচ্ছে। ইডেনে সোমবার ম্যাচ হচ্ছে না। বরং ধর্মশালা থেকেই ফিরে যাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ!

এবং বিয়েবাড়ি আচমকা শ্রাদ্ধবাসর!

শুধু তো ম্যাচ নয়, আরও দু’টো অনুষ্ঠান এক ঝটকায় ধাক্কা খেয়ে গেল। কলকাতায় পটৌডি-স্মৃতি বক্তৃতা— ‘পোস্টপন্ড’। ভবিষ্যতে হবে, ম্যাচ হলে।

কলকাতায় আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিল বৈঠক— ‘ক্যানসেল্ড’।

প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে তিনটে কাজ করে সিএবি। প্রথমত শ্রীনিকে বলা হয় যে, ইডেনের দেড়শো বছর পূর্তির কথা মাথায় রেখে আউট অব টার্ন গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ান ডে কলকাতায় আনা হয়েছিল। তাই এ বছরই ইডেনে ওয়ান ডে দিতে হবে। শোনা গেল, শ্রীনি তখনই বলে দেন যে, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। যদি তারা দু’টো ওয়ান ডে-ও খেলতে রাজি হয়, তার একটা নাকি ইডেন পাবে (শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ওয়ান ডে হচ্ছে পাঁচটা)। দ্বিতীয়ত, ম্যাচ সংক্রান্ত সমস্ত কর্মকাণ্ড বাতিল করা শুরু হয়ে যায়।

কলকাতা পুলিশের ইডেন পরিদর্শনের কথা ছিল এ দিন। তাঁদের বলা হয়, ম্যাচ হচ্ছে না। আপনারা আসবেন না। ম্যাচ সংক্রান্ত সমস্ত পেমেন্ট বন্ধ করতে বলা হয়। আর তৃতীয়ত, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ইডেনে ক্রিকেটের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষ্যে যা যা অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সব হবে। কোনও এক টিমের ইচ্ছেমতো ইডেন-অনুষ্ঠানের নির্ঘণ্ট পাল্টানো হবে না।

তাতেও উত্‌সবের হারানো সুর ফিরল কোথায়?

বিকেল থেকে পাগলের মতো সিএবি কর্তাদের ফোন করে গেলেন কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত। জানতে, শনিবার তিনি আসবেন কি না? ইডেন-স্মৃতিতে টসের স্বর্ণমুদ্রা উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে কি না? দীপক শোধনের সঙ্গে তাঁরও তো আসার কথা। বোর্ডের দুর্নীতিদমন টিম পৌঁছে গেল, ম্যাচের চতুর্থ আম্পায়ার চলে এলেন, চলে এল ব্রডকাস্টিং টিমও কারও কাছেই তো খবর ছিল না যে, ম্যাচ বাতিল।

তার মধ্যেই সিএবি চেষ্টা করেছে। এ দিন সন্ধেয় সিএবি-র প্রথম দেড়শো জীবিত সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হল। বাজি ফাটানো হল। শনিবারও শ্রীকান্তদের নিয়ে স্বর্ণমুদ্রার উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে।

কিন্তু রবিবার? ভিভিএস লক্ষ্মণের পটৌডির উপর স্মৃতি বক্তৃতার দিন?

কিছু হবে না।

সোমবার? যে দিন ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল!

ধু-ধু শূন্যতা।

রাতে এক সিএবি কর্তা মেনে নিলেন তালটা কেটে গিয়েছে। বলার চেষ্টা করলেন, শ্রীলঙ্কা ম্যাচ পাবে ইডেন। নভেম্বরের শুরুতেই। সেই ম্যাচকেই কেন্দ্র করে আবার সব করতে হবে। টিকিট নিয়ে জট থেকে গেল, সেগুলো মেটাতে হবে। মাঝের দিনগুলোয় বাংলা, কর্নাটক, মুম্বই, বাংলাদেশের ‘এ’ টিম নিয়ে টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা, সেটা করতে হবে। কিন্তু শ্রীলঙ্কা ম্যাচ হলে নিয়ম অনুযায়ী ইডেনে ওই টুর্নামেন্ট হওয়া সম্ভব নয়। করতে হবে অন্য মাঠে। প্রতিশ্রুতি মতো ফ্লাডলাইটেও হবে না। মানে, আকর্ষণ কমবে।

ইডেন আসলে জেনে গিয়েছে, তার হাতে এখন শুধু কাঠামো পড়ে আছে। মূর্তিটা আর নেই!





Something isn't right! Please refresh.

আরও পড়ুন

Advertisement