Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২২ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

আনন্দবাজার এক্সক্লুসিভ

সংস্কার আর ইগো ভুলে দিয়েগোকে একটা ফোন করলেই তো পারত মেসি

গৌতম ভট্টাচার্য
রিও ডি জেনেইরো ১৩ জুলাই ২০১৪ ০৩:২৫
সিগার হাতে গয়কোচিয়া।

সিগার হাতে গয়কোচিয়া।

খুব নার্ভাস যে লাগছে সেটা ভারতীয় বন্ধু আপনার কাছে স্বীকার করে নিতে কোনও অসুবিধে নেই। এত হুল্লোড় দেখছি এখানে আর্জেন্তিনীয় সমর্থকদের। এক পা যেতে না যেতে লোকে ছবির আবদার করছে। অটোগ্রাফ নিচ্ছে। সে দিন রোমেরো টাইব্রেকারে জেতানোর পর আমার কাছে অন্তত পাঁচশো এসএমএস এসেছে। আর্জেন্তিনার বেশ কিছু কাগজ হেডিং করেছে ‘হিরোইকয়’। মানে গয়কো যেহেতু আমাকে ডাকা হয়, তার সঙ্গে হিরো যোগ করে হেডলাইনটা হয়েছে। লাতিন কাগজ ছেয়ে গিয়েছে সে দিন এই হেডলাইনে যেহেতু নব্বইয়ে আমিও এক রকম টাইব্রেকার বাঁচিয়ে দেশকে ফাইনালে তুলেছিলাম। দিয়েগো এসে তখন বলেছিল, গয়কো তোর কাছে সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকলাম রে! কিন্তু এ বার সত্যিই ভয় হচ্ছে ভেবে যে, জার্মানরা এমনিতেই শারীরিক দিক থেকে এত বড়সড়। চালিয়ে খেলে। তার ওপর গায়গতরে ওদের অনেক শক্তসমর্থ, আরও বেশি ফিট লাগছে। সেমিফাইনালে ওরা খেলল মাত্র ২৫ মিনিট। আমরা খেললাম একশো কুড়ি মিনিট আর তার পরে টাইব্রেকার। ওরা পঁয়ত্রিশ মিনিটেই জেনে গিয়েছিল ৫-০ এগিয়ে আছি। আর এনার্জি খরচ করে লাভ নেই। আমরা এক্সট্রা টাইমের পরেও একশো দশ ভাগ দিতে বাধ্য হয়েছি। তার তিন দিনের মধ্যে ফাইনাল। জানি না ওদের শরীরগুলো রিকভার করেছে কি না। মেসির করেছে কি না, আমার খুব সন্দেহ আছে। সে দিন চ্যানেলের হয়ে মেসির সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম। কেমন আছো জিজ্ঞেস করায় হেসে বলল, রিল্যাক্সড আছি। আমি জানি ও এতটুকু রিল্যাক্সড নয়। থাকা সম্ভবও নয়। গত ক’মাসে প্রচুর ঝড়ঝাপটা গিয়েছে ওর ওপর দিয়ে। একে তো চোট পেল। তার পর বার্সায় ওর মেন্টর টিটো মারা গেলেন। মধ্যিখানে ও বাবা হল। রোনাল্ডোর কাছে বর্ষসেরা ফুটবলারের মুকুটটা হারাল। এখানে ক্যাপ্টেন হয়ে এসে প্রথম দিককার ম্যাচে দলকে একা টেনে তুলল। কিন্তু এত ধকলের পর এ বার ওকে আমার যেন ক্লান্ত লাগছে। কী অমানসিক প্রত্যাশা আমার দেশের মানুষ ওর ওপর করতে শুরু করেছে, ভাবাই যায় না। এক সমর্থক এসে আমাকে বলল, মেসির শুধু ফাইনালে গোল করলেই হবে না। জার্মান গোলকিপারকে কাটিয়ে গোল করতে হবে। ভাবা যায় কী চাপ? দিয়েগোর ওপরও অমানুষিক চাপ থাকত কিন্তু ও অন্য টাইপের। দিয়েগো মানসিক ভাবে আরও ডাকাবুকো। মেসি সেখানে অন্তর্মুখী। আমার কাছে লিওনেল মেসি দেশকে বিশ্বকাপ দিতে পারল কী পারল না দিয়ে ওর শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে না। দেশকে এত দূর নিয়ে এসেছে। আমি জানি ফাইনাল হারুক বা জিতুক, মেসিই বিশ্বসেরা! কিন্তু ওর শরীর-মনের যা অবস্থা বুঝতে পারছি বলে ওর ভেতরকার চেহারাটাও বোধহয় ধরতে পারছি। শেষ দুটো ম্যাচে মেসিকে দেখে আমার মনে হয়েছে, ও গোটা খেলায় লেগে থাকার ঝুঁকি নিচ্ছে না। বরঞ্চ এনার্জি জমিয়ে রেখে কয়েক পশলা চেষ্টা করছে কিছু জাদু মুহূর্ত তৈরি করার। ফাইনালে মেসির এই জাদু মুহূর্ত তৈরি করতে পারাটাই আর্জেন্তিনার একমাত্র আশা! শুধু আমি আশা করব মুহূর্তটা যেন তাড়াতাড়ি আসে। কারণ জার্মানি যদি প্রথম গোল করে ফেলে তা হলে গেল। আর লকগেট খোলার নয়। টাইব্রেকার অবধি ফাইনাল গড়াবে বলে আমার তো মনে হচ্ছে না। খুব জরুরি হল আর্জেন্টাইন ডিপ ডিফেন্স আর মাসচেরানোর ভাল খেলাটা। রোমেরোকেও ভাল ফর্মে থাকতে হবে।


নিজের হাতে বাংলায় লেখা ট্যাটু দেখাচ্ছেন মারাদোনার ম্যানেজার।

Advertisement



রোমেরো ছেলেটা খুব বিনয়ী। টাইব্রেকার বাঁচানোর পর সবাই যখন ওকে আমার সঙ্গে তুলনা করছে, তখন ও বলেছে গয়কো এক জনই! আমার সঙ্গে তুলনাই হয় না। ফাইনালে রোমেরোর ওপর জার্মানরা চাপ তৈরি করতে চাইবেই। আমজনতা মেসি মেসি করে লাফাচ্ছে। কিন্তু এই জায়গাগুলোও খুব জরুরি। আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন ফাইনালের আগে টিম কেন এক বার দিয়েগোর সঙ্গে কথা বলল না? একই শহরে ও বসে আছে। সত্যিই তো টিমকে চাগিয়ে দিতে পারত। দিয়েগো নিজে থেকে যাচ্ছে না। কারণটা আমি বুঝতে পারি। ও প্রাক্তন কোচ। এখন এক জন কোচ রয়েছে। নাক গলাতে যাবে কেন? কেউ যদি কিছু বলে বসে? কিন্তু টিমের ওর কাছে যাওয়া উচিত ছিল। আর্জেন্তিনীয়দের একটা সমস্যা হল, আমাদের বড্ড ইগো। আর দু’নম্বর, আমরা বড্ড সংস্কারগ্রস্ত। সাফল্য এক রকম ভাবে গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে আসছে তো সেটাকেই আঁকড়ে থাকো! ফাইনালের আগে হঠাৎ করে সেটা বদলাতে যেও না। কেউ কেউ বলছেন মেসি তো পারত দিয়েগোকে একটা ফোন করতে। আমি তো দেখি দু’জনেই দু’জনের সম্পর্কে খুব ভাল ভাল কথা বলে। সম্পর্কটা ভালই। তা বলে দারুণ ঘনিষ্ঠ বলে মনে হয় না। আমি দিয়েগোর সঙ্গে এত সময় কাটাই। কোনও দিন তো ইনবক্সে দেখিনি মেসির কোনও মেসেজ এসেছে বলে! আমাদের সেই নব্বইয়ের টিমের তিন-চার জন বোধহয় এখানে আছে। ক্যানিজিয়া এসে দেশে ফেরত গিয়েছে। বুরুচাগাও তো চলে গেল। তবে যারাই এসে বা না এসে থাকুক, সবাই কিন্তু মনে মনে টিভির সামনে বসে নব্বইয়ের ইতালিতে ফিরে যাবে। আমার কাছে ওই ম্যাচটা জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত! পেনাল্টিটা ছিল না। দিয়ে দিল। তার পর যখন ব্রেহমে মারতে যাচ্ছে, আমি শিওর ছিলাম বাঁচিয়ে দেব। সে বার দুটো ম্যাচে আমি পেনাল্টি বাঁচিয়ে টিমকে পার করেছিলাম। সে দিন স্নাইডারের পেনাল্টিটা রোমেরোর বাঁচানো দেখে আমার ছ্যাঁক করে নব্বইয়ের ব্রেহমেকে মনে পড়ে গেল। আমি জানতাম আমার ডান দিকে মারবে। ঝাঁপিয়েও ছিলাম সে দিকে। কিন্তু হাইটটা বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম সে দিনের স্নাইডারের মতো বলটা বুঝি ওপরে থাকবে। হাইটটা নিচুতে ছিল। রেফারিটাকে মারতে চেয়েছিলাম। আজও পাইনি। আশা করব জীবন যেখানেই কাটাক, ওর খুব একটা ভাল কাটছে না। মারাকানা ফাইনালে পরিষ্কার ফেভারিট জার্মানি। তবু ঈশ্বরের কাছে একটা ছোট প্রার্থনা যে, একটা বাজে লোকের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমরা করেছি চব্বিশ বছর ধরে। এ বার কি আপনার মনে হচ্ছে না যে বেচারিদের দিকে আমার মুখ তুলে তাকানোর সময় হয়েছে...

ছবি: গৌতম ভট্টাচার্য

শেষ দুটো ম্যাচে মেসিকে দেখে আমার মনে হয়েছে, ও গোটা খেলায় লেগে থাকার ঝুঁকি নিচ্ছে না। বরঞ্চ এনার্জি জমিয়ে রেখে কয়েক পশলা চেষ্টা করছে কিছু জাদু মুহূর্ত তৈরি করার। ফাইনালে মেসির এই জাদু মুহূর্ত তৈরি করতে পারাটাই আর্জেন্তিনার একমাত্র আশা! শুধু আমি আশা করব মুহূর্তটা যেন তাড়াতাড়ি আসে। কারণ জার্মানি যদি প্রথম গোল করে ফেলে তা হলে গেল। আর লকগেট খোলার নয়। টাইব্রেকার অবধি ফাইনাল গড়াবে বলে আমার তো মনে হচ্ছে না।

সে দিন স্নাইডারের পেনাল্টিটা রোমেরোর বাঁচানো দেখে আমার ছ্যাঁক করে নব্বইয়ের ব্রেহমেকে মনে পড়ে গেল। আমি জানতাম আমার ডান দিকে মারবে। ঝাঁপিয়েও ছিলাম সে দিকে। কিন্তু হাইটটা বুঝতে পারিনি।

আরও পড়ুন

Advertisement