Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২১ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বিরাট-অজিঙ্করা জানে দল মানে একটাই সংসার: একান্ত সাক্ষাৎকারে সচিন তেন্ডুলকর

সুমিত ঘোষ
কলকাতা ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৬:৪৭
নজরে: অধিনায়ক কোহালি ও সহ-অধিনায়ক রাহানে। আসন্ন সিরিজে দু’জনকে ঘিরে থাকবে কৌতূহল।

নজরে: অধিনায়ক কোহালি ও সহ-অধিনায়ক রাহানে। আসন্ন সিরিজে দু’জনকে ঘিরে থাকবে কৌতূহল।
ফাইল চিত্র।

অস্ট্রেলিয়ায় ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের পরে এ বার মিশন ইংল্যান্ড। সিরিজ শুরু হচ্ছে আজ, চেন্নাইয়ে। সেই চেন্নাই, যেখানে বহু আবেগপূর্ণ, চিরস্মরণীয় সব ইনিংস রয়েছে তাঁর। অধিনায়কত্ব নিয়ে জোরাল চর্চায় তাঁর কী প্রতিক্রিয়া? সিরিজ জিততে পরামর্শই বা কী? আনন্দবাজারের সঙ্গে খোলামেলা, একান্ত আলাপচারিতায় সচিন তেন্ডুলকর কথা বললেন অস্ট্রেলিয়া জয় থেকে শুরু করে আসন্ন ইংল্যান্ড দ্বৈরথ নিয়ে। রিভার্স সুইং সামলানোর নতুন টোটকাও তুলে দিলেন বিরাট কোহালিদের হাতে।

প্রশ্ন: যখন সকলে বলছিলেন, অস্ট্রেলিয়ায় বিরাট কোহালির অনুপস্থিতিতে ভারত গো হারান হারবে, আপনি বলেছিলেন কারও অনুপস্থিতি মানে নতুন কারও জন্য সুযোগ। বলেছিলেন, বিরাট চলে এলেও অজিঙ্ক রাহানের ভারত পারবে। কী দেখে আপনার এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল?

সচিন তেন্ডুলকর: দেখুন, এটা ঠিক যে, বিরাট কোহালির মতো ক্রিকেটার ফিরে আসাটা বিশাল একটা ধাক্কা। সেটা আমি তখনই বলেছিলাম। কিন্তু আমি সব সময় বিশ্বাস করে এসেছি, ক্রিকেট একটা দলগত খেলা। এবং, সবাই মিলে যদি দলবদ্ধ ভাবে, ঐক্যবদ্ধ ভাবে খেলা যায়, তা হলে ভাল ফল আসবেই। নিশ্চয়ই ব্যক্তিগত নৈপুণ্য গুরুত্বপূর্ণ, ব্যক্তির বিশেষ দক্ষতা বাড়তি শক্তি যোগ করতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেই ব্যক্তিটি না থাকলে দলটাই অকেজো হয়ে পড়বে। আমি এটাই মেনে এসেছি। সেই চিন্তাধারা থেকেই বলেছিলাম, বাকি তিনটি টেস্টেও ভারতকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। বাকি দলটাও একেবারে ফেলনা নয়।

Advertisement

প্র: অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে কী বলবেন?

সচিন: অসামান্য, অসাধারণ! গোটা সিরিজে চোটের জন্য একটার পর একটা ক্রিকেটার হারিয়েছে দলটা। তার পরেও ওদের উদ্যম কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত দল হিসেবে লড়ে গিয়েছে ওরা। এটাই বলতে চাইছি। যখন তুমি জেতো, টিম হিসেবে জেতো। হারলে টিম হিসেবে হারো। ব্যক্তি নয়, ক্রিকেট দলগত খেলা। দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়েই হয়তো একটা ভাল টিম হয়। দিনের শেষে তবু ব্যক্তি নয়, দলের নাড়িটাই স্পন্দিত হয়! ব্যক্তি আসবে-যাবে কিন্তু দল থেকে যায়। ব্রিসবেনে শেষ টেস্টে কী দল নিয়ে খেলতে নেমেছিলাম আমরা! সিরাজ প্রথম টেস্ট সিরিজ খেলছে। শার্দূল ঠাকুর প্রথম সিরিজ খেলছে। নটরাজন প্রথম সিরিজ খেলছে। ওয়াশিংটন সুন্দরের টেস্টে অভিষেক হচ্ছে। অবিশ্বাস্য! এত ঝড়-ঝাপ্টা, এমন প্রাণান্তকর চাপ সামলে সিরিজ জিতে ফিরে এল ওরা। এবং, নতুনদের নিয়ে। অবিশ্বাস্য!

প্র: এ বার নতুন সিরিজ। ক্রিকেট ফিরছে দেশের মাটিতে। সামনে ইংল্যান্ড। জিততে গেলে কোন কোন ব্যাপারগুলো ঠিক হতে হবে?

সচিন: আমার পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ২০০৮-এ মুম্বইয়ে যখন জঙ্গি হানার ঘটনাটা হল, তার পরে ইংল্যান্ড খেলতে এসেছিল। চেন্নাইয়ে টেস্ট ম্যাচ হয়েছিল। সেই মাঠ, সেই প্রতিপক্ষ। এখানে ক্রিকেট ফিরছে অতিমারির হানায় প্রায় এক বছর দেশের মাঠে খেলা বন্ধ থাকার পরে। আমরা সেই টেস্ট জিতেছিলাম। আশা করছি, জয় দিয়েই দেশের মাটিতে ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তন যাত্রা শুরু হবে। আর জেতার ফর্মুলা যদি জিজ্ঞেস করেন, তা হলে আমার কাছে সেটা খুব পরিষ্কার। নিজেরা বড় রান করো, প্রতিপক্ষকে বড় রান করতে দিয়ো না (হাসি)। তবে আমার বলে দেওয়া লাগবে না। এই টিম যথেষ্ট যোগ্য, তাই ওরা নিশ্চয়ই উপযুক্ত পরিকল্পনা করে ফেলেছে। নিশ্চয়ই এত ক্ষণে ব্যাটসম্যানদের মিটিং হয়ে গিয়েছে, বোলারদের মিটিং হয়ে গিয়েছে।


১৫-২০ ওভার থেকে বল রিভার্স করা শুরু করে আর ৫৫-৬০ ওভার পর্যন্ত ভাল মতো কার্যকরী থাকে। তার পরেও হয়তো রিভার্স হতে থাকে কিন্তু বল নরম হয়ে যায় বলে অতটা বিপজ্জনক হয় না। বলটা শক্ত থাকলে ব্যাটসম্যানেরা রিভার্স সামলানোর জন্য সময় অনেক কম পায়। বল নরম হয়ে গেলে অত উচ্চ গতিতে রিভার্স সুইং করে না। রিভার্স সামলানোর জন্য তাই ১৫ থেকে ৬০ ওভার, এই সময়টা সতর্ক থাকতে হবে।

- সচিন তেন্ডুলকর


প্র: তবু যদি প্রথম টেস্ট নিয়ে আপনার মতামত চাই, কী বলবেন?

সচিন: আমি মনে করি, প্রথম টেস্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে কারণ, এই চেন্নাইয়েই হবে দ্বিতীয় টেস্ট। প্রতিপক্ষ দল পিচ, আবহাওয়া, পরিবেশ বুঝে ওঠার আগেই ওদের ব্যাকফুটে নিয়ে যেতে হবে। প্রথম টেস্ট পকেটে ভরে নাও। দু’টো ব্যাপার বলব। প্রথমে আমরা ব্যাট করলে বড় রান তুলতে হবে যাতে প্রতিপক্ষের উপরে চাপ তৈরি করা যায়। আর যদি ওরা ব্যাট করে, বড় রান করতে দেওয়া চলবে না। তা হলে ওদের বোলাররা ম্যাচে থাকার সুযোগ পাবে। যদি জো রুটরা বড় স্কোর তুলে ফেলে, তা হলে ওদের বোলাররাও আমাদের ব্যাটিংয়ের উপরে চাপ তৈরি করার সুযোগ পাবে। টেস্ট ক্রিকেটে পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে, কী ভাবে প্রতিপক্ষের উপরে চাপ বাড়াব আর নিজেদের উপর চাপ হাল্কা করব।

প্র: রিভার্স সুইং সামলানো নিয়ে কী ধরনের পরিকল্পনা করা দরকার?

সচিন: আমি লক্ষ্য করেছি, ১৫-২০ ওভার থেকে বল রিভার্স করা শুরু করে আর ৫৫-৬০ ওভার পর্যন্ত ভাল মতো কার্যকরী থাকে। তার পরেও হয়তো রিভার্স হতে থাকে কিন্তু বল নরম হয়ে যায় বলে অতটা বিপজ্জনক হয় না। বলটা শক্ত থাকলে ব্যাটসম্যানেরা রিভার্স সামলানোর জন্য সময় অনেক কম পায়। বল নরম হয়ে গেলে অত উচ্চ গতিতে রিভার্স সুইং করে না। রিভার্স সামলানোর জন্য তাই ১৫ থেকে ৬০ ওভার, এই সময়টা সতর্ক থাকতে হবে। আমি নিশ্চিত এগুলো নিয়ে দলীয় বৈঠকে ওরা আলোচনা করেছে।

প্র: ইংল্যান্ডের জিমি অ্যান্ডারসন আছেন, ভাল রিভার্স করাতে পারেন।

সচিন: ওদের জিমি অ্যান্ডারসন আছে, আমাদের হাতেও রিভার্স সুইংয়ে দক্ষ ভাল পেসার আছে। আমাদের বোলিং আক্রমণ যে কোনও পরিবেশেই যথেষ্ট যোগ্য। সেটা বার বার ওরা প্রমাণও করছে।

প্র: চেন্নাইয়ে স্পিনাররাই তুরুপের তাস হন। ইংল্যান্ডের স্পিন আক্রমণকে কি সামান্য অনভিজ্ঞ মনে হচ্ছে? ভারতের কি তিন স্পিনার নিয়ে নামা উচিত? চায়নাম্যান কুলদীপ যাদবকে কি খেলানো উচিত?

সচিন: তিন স্পিনার খেলানো যেতেই পারে। আমি চেন্নাইয়ে কী রকম পিচ হচ্ছে জানি না। তবে আমি মনে করছি, ভারত পাঁচ বোলারে খেলতে চাইবে। এই মুহূর্তে আমাদের দলের যা শক্তি, তাতে পাঁচ বোলারে খেলা যেতেই পারে। এই দলের অনেক বোলার ব্যাটও করতে পারে, তাই এটা সম্ভব। তবে প্রথম একাদশে কাকে খেলানো উচিত, সেই সিদ্ধান্তটা আমি টিম ম্যানেজমেন্টের উপরেই ছাড়তে চাই। মুম্বইয়ে বসে বলা ঠিক হবে না, চেন্নাইয়ে কাকে খেলানো উচিত। অশ্বিন ফিট হয়ে গিয়েছে শুনেছি। তাই মনে হয় ও খেলবে। তার পরে কুলদীপ আছে, অক্ষর পটেল আছে, ওয়াশিংটন সুন্দর আছে। সকলেই নিশ্চয়ই তৈরি। সম্ভবত এই তিন জনের মধ্যে দু’জন খেলবে যদি পাঁচ বোলারে দল খেলে।

প্র: এই ইংল্যান্ড দল কতটা শক্তিশালী বলে মনে করেন?

সচিন: ভাল দল। সব চেয়ে বড় কথা, জো রুটরা শ্রীলঙ্কায় সিরিজ জিতে এসেছে আর জয়ী দলের আত্মবিশ্বাস সব সময় বেশি থাকে। ওরা ঝুঁকি নিতে ভয় পাবে না। পরিবেশ, প্রতিপক্ষ হয়তো আলাদা ঠিকই। দল হিসেবে আমরা অনেক ভাল, তাই ইংল্যান্ডের সামনে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ থাকছে। অস্ট্রেলিয়ায় এত ভাল করে আসার পরে আমাদের ছেলেরাও চাইবে, দারুণ ভাবে দেশের মাটিতে ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তন সিরিজকে শুরু করতে। ইংল্যান্ডের জন্য এটা নিশ্চয়ই শ্রীলঙ্কা সফর নয়। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে, সেশনগুলো জেতার দিকে মন দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার মিশ্রণে এই ইংল্যান্ড দল কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে। জো রুট আছে, অ্যান্ডারসন-ব্রড আছে, জফ্রা আর্চার আছে। হাল্কা ভাবে একদমই নেওয়া যাবে না কারণ, ওদের দলে প্রতিভার অভাব নেই।

প্র: ভারতীয় অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রচুর কথা হচ্ছে। বিরাট কোহালি ফিরছেন নেতা হিসেবে কিন্তু অজিঙ্ক রাহানে অস্ট্রেলিয়ায় দারুণ করে এসেছেন। আপনি অধিনায়কত্ব নিয়ে আলোচনাকে কী ভাবে দেখছেন?

সচিন: সব চেয়ে ভাল ব্যাপার হচ্ছে, দলের ভিতরে কোনও প্রতিযোগিতা নেই। বাইরে যে যাই বলুক না কেন, দলের অন্দরে কার কী ভূমিকা, তা ওদের কাছে খুব স্পষ্ট। রাহানে বলেও দিয়েছে, বিরাটই ফের অধিনায়ক, ও পিছনের সারিতে থাকবে খুব খুশি মনেই। খুবই পরিণত মন্তব্য। অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজের আগে আপনাকেই বলেছিলাম, রাহানের মধ্যে খুব পরিণত, নিয়ন্ত্রিত মনোভাব দেখতে পাই। তাই বিরাট চলে আসার পরে অধিনায়ক হিসেবে ও যে অস্ট্রেলিয়াতে খারাপ করবে না, সেই বিশ্বাস আমার ছিল। সেটা মাথায় রেখেই আপনাকে বলেছিলাম, রাহানে অধিনায়কত্বের চাপ সামলাতে পারবে। এখানেও দেখুন, এত বড় একটা সিরিজ জিতে আসার পরেও কী অসম্ভব নিয়ন্ত্রণ নিজের উপরে। বিরাট ফিরে এসেছে, ও-ই আসল অধিনায়ক, তাই আমি আবার সহ-অধিনায়ক। অসাধারণ স্পোর্টিং স্পিরিট। রাহানে পুরোপুরি টিমম্যান। চব্বিশটা কমপার্টমেন্ট নয়, একটাই ট্রেন। সেটাই এগিয়ে চলবে। একটাই সংসার। আমরা সকলে তার সদস্য। সংসারের ভাল সবার আগে। রাহানের মন্তব্যে আমার সব চেয়ে প্রিয় সেই ‘ব্যক্তি নয়, দলই সব’ ফুলটা আবারও ফুটতে দেখলাম।

আরও পড়ুন

Advertisement