• বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

কৃষ্ণচন্দ্র ও জগদ্ধাত্রী পুজো

গৌরবময় অতীত আর কিংবদন্তি। তার মাঝেই সাবেক জৌলুস আর আভিজাত্যে ভরা সেই পুজো। কৃষ্ণনগরের হাজারো পুজোর ভিড়ে সে পুজো আজও স্বতন্ত্র।

রাজবাড়ির তোরণ পেরিয়ে পঙ্খঅলঙ্কৃত নাটমন্দিরের দিকে পা বাড়াতেই পুরনো স্থাপত্য যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে ইতিহাসের অজানা কথা। এক দিন এই পুজোকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছিল বাঙালির জগদ্ধাত্রী আরাধনা। আর কালের স্রোতে কিংবদন্তি, জনশ্রুতি আর ইতিহাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে ‘বাংলার বিক্রমাদিত্য’ কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর প্রবর্তিত জগদ্ধাত্রী পুজো।

পুজোর প্রচলন নিয়েও রয়েছে একাধিক কাহিনি।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের উত্তরপুরুষ সৌমীশচন্দ্র রায় বলছিলেন, “প্রচলিত কাহিনি অনুসারে নবাব আলিবর্দি খানকে সে বার রাজকর দিতে না পারায় কারাগারে বন্দি হয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। সালটা ১৭৫৪। শোনা যায়, সময়টা ছিল দুর্গোৎসবের কাছাকাছি। নবাবের কারাগার থেকে অবশেষে তিনি যখন মুক্ত হয়েছিলেন তখন দুর্গোৎসব প্রায় শেষ। নৌকায় কৃষ্ণনগর ফেরার পথে রাজা বুঝলেন, সে দিন বিজয়া দশমী। সে বার পুজোয় উপস্থিত থাকতে না পারায় ক্লান্ত বিষণ্ণ রাজা নৌকার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। জনশ্রুতি সেখানেই কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নে দেখেছিলেন যে এক রক্তবর্ণা চতুর্ভুজা কুমারী দেবী তাঁকে বলছেন আগামী কার্তিক মাসের শুক্লানবমী তিথিতে তাঁর পুজো করতে।”

তবে অন্য এক কাহিনিও শোনা গেল সৌমীশবাবুর কাছে। ইংরেজদের বন্ধু এই সন্দেহে ১৭৬৪ সালে মীরকাশিম মুঙ্গেরের কারাগারে বন্দি করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর পুত্র শিবচন্দ্রকে। শোনা যায়, মীরকাশিম নাকি কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর দূত মারফত এই সংবাদ মেরতলার প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক কালীশঙ্কর মৈত্রের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এবং তাঁর প্রাণ রক্ষার প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। কারাগারেই কৃষ্ণচন্দ্র এক কুমারী দেবীর স্বপ্নাদেশ লাভ করেন এবং কারাগার থেকে মুক্তিলাভের প্রতিশ্রুতি লাভ করেছিলেন। জনশ্রুতি, কিছু দিনের মধ্যেই তিনি সত্যি কারামুক্ত হয়েছিলেন।

এর পরেই কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্র ও গোপালভাঁড়কে নিয়ে উপস্থিত হন মেরতলার প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক কালীশঙ্কর মৈত্রের কাছে। কৃষ্ণচন্দ্র এই স্বপ্নের কথা জানান এবং জানতে চান কে এই দেবী? কালীশঙ্কর তাঁকে জানান, এই দেবী স্বয়ং চণ্ডী। প্রাচীন কালে এই দেবীর পুজোর প্রচলন ছিল। রাজা তখন জানালেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি এই দেবীর পুজোর আয়োজন করতে চান। এর উত্তরে কালীশঙ্কর জানান, কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবীর পুজোর বিধান আছে। হাতে সময় কম থাকলেও কৃষ্ণচন্দ্র পুজোর সমস্ত আয়োজন করবেন বলে জানিয়েছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন পুজোয় পৌরোহিত্যের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। শোনা যায় কালীশঙ্কর রাজাকে যথাযথ সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

তবে, একটা সমস্যার কথা অনুমান করে কৃষ্ণনগরে না ফিরে সেখান থেকেই কৃষ্ণচন্দ্র সরাসরি গিয়েছিলেন চন্দননগরে তাঁর বন্ধু ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর কাছে। যাওয়ার আগে পুজোর সব দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন পুত্র শিবচন্দ্র ও গোপালভাঁড়কে। তাঁরাই জগদ্ধাত্রী পুজোর সব আয়োজন করেছিলেন। আর বলেছিলেন, পুজোর আগের দিন রাত্রে তিনি কৃষ্ণনগরে ফিরে আসবেন।

রাজপরিবারের কূলগুরু ছিলেন বৈষ্ণবাচার্য। তিনি নতুন এই শাক্ত দেবীর পুজোয় অনুমতি না দিলে পুজো করা সম্ভব হত না। তাই রাজা ঠিক করেছিলেন, পুজোর আগের দিন মধ্যরাত্রে কৃষ্ণনগরে ফিরবেন। আর পরের দিন সকালে অঞ্জলি দেবেন। তখন কূলগুরুর কোনও বাধাই কার্য্যকর হবে না।

ইতিমধ্যেই শিবচন্দ্র ও গোপালভাঁড় পুজোর সব আয়োজন করে রেখেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী পুজোর আগের দিন গভীর রাতে গোপনে কৃষ্ণনগরের প্রাসাদে ফিরে এসেছিলেন। এবং পর দিন সারা দিন উপবাসী থেকে পুজোয় অঞ্জলিও দিয়েছিলেন। সেই থেকেই শুরু হল রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজো। গবেষকদের মতে, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রই জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রবর্তক। অনেকেই মনে করেন, পরের বছর থেকে চন্দননগরে পুজোর প্রচলন হয়েছিল ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর উদ্যোগে।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বাংলার পাল-সেন যুগের বিভিন্ন তন্ত্র গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে সিংহবাহিনী জগদ্ধাত্রীর পুজোর। যেমন ‘মায়াতন্ত্র’-এ দেখা যায় ,‘প্রপূজয়েজগদ্ধাত্রীং কার্তিকে শুক্লপক্ষকে দিনোদয়ে চ মধ্যাহ্নে সায়াহ্নে নবমেহহন।’ এর অর্থ কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দিনের শুরুতে মধ্যাহ্নে এবং সায়াহ্নে জগদ্ধাত্রী পুজো করা যায়।

তবে কৃষ্ণনগরে বেশির ভাগ প্রতিমা যেখানে বিশাল আকারের, সেখানে রাজবাড়ির প্রতিমা অন্যান্য প্রতিমার চেয়ে আকারে ছোট। এর কারণ জানতে চাইলে সৌমীশবাবু বলেন, “স্বপ্নাদেশে কৃষ্ণচন্দ্র যে দেবীর দর্শন পেয়েছিলেন তিনি কুমারী রূপিনী। তাই দেবীর মূর্তি কুমারী বালিকার মতো। বর্তমানে প্রচলিত জগদ্ধাত্রী মূর্তির চেয়ে আলাদা রাজবাড়ির প্রতিমা। আড়াআড়ি ভাবে নয়, দেবী সোজাসুজি সিংহের উপর বসে। সিংহটি দেখতে দাবানলের ঘোড়ার মতো। সামনে ঝুলন্ত অভ্রধারা।

রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোর আচার অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে রাজপরিবারের বধূ অমৃতা রায় বলছিলেন, “এক দিনে তিন বার পুজো হয়। সকালে সাত্বিকি, দুপুরে রাজসিকি, সন্ধেবেলা তামসিকি রূপে। পুজোয় অন্নভোগ হয়। থাকে খিচুড়ি, ৯ রকম ভাজা, তরকারি, পোলাও, তিন রকম মাছ, চাটনি, পায়েস সুজি মিষ্টি ইত্যাদি।”

শুধু তাই নয়, রাজবাড়িতে পুজো শুরুর পরে ধীরে ধীরে কৃষ্ণনগরে শুরু হয়েছিল সর্বজনীন জগদ্ধাত্রী পুজো। সৌমীশবাবু জানালেন, এক সময় রাজবাড়ি থেকে মালোপাড়ার পুজোয় পনেরো টাকা অনুদান দেওয়া হত। সেই প্রথা আজও চলছে। রাজপরিবারের বধূ অমৃতা রায় প্রতি বছর প্রতিমা দর্শন করে অনুদান দিয়ে আসেন। অতীতের মতো আজও কৃষ্ণনগরের সব সর্বজনীন প্রতিমা রাজবাড়ির সামনে দিয়ে শোভাযাত্রা করে বিসর্জনে যায়। আগে রানিরা সেই সব প্রতিমা দেখে প্রথম-দ্বিতীয় নির্ধারণ করতেন। মিলত পুরস্কারও।

তবে সে দিন আর নেই। অতীতের অনেক কিছু হারালেও হারায়নি রাজবাড়ির পুজোর সেই নিয়ম নিষ্ঠা আর জৌলুস। সে পুজো যেন অতীত আর বর্তমানের মাঝে একটা সেতু।

ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন