চড়া পড়ে নাব্যতা কমে যাচ্ছে দিঘা উপকূলের শঙ্করপুর মৎস্য বন্দরের সমুদ্র খাঁড়ির। তাই জোয়ারের সময়টুকু ছাড়া শঙ্করপুর সমুদ্র খাঁড়ি দিয়ে কোনও মাছ ধরার ট্রলার দিঘা মোহনার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও শঙ্করপুর মৎস্য বন্দরে ঢুকতে পারছে না। ফলে অস্তিত্ব সঙ্কটের আশঙ্কায় ভুগছেন দিঘা মোহনা ও শঙ্করপুর মৎস্য বন্দরের কয়েক হাজার মৎস্যজীবী ও তাঁদের পরিবার। সমস্যার কথা স্বীকার করে শঙ্করপুর মৎস্য বন্দরের আধিকারিক প্রদ্যোৎ পাহাড়ি বলেন, “শঙ্করপুর মৎস্য বন্দরে নথিভুক্ত ট্রলারের সংখ্যা প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি। মাছ ধরার মরসুমে নথিভুক্ত ট্রলারের ৬০-৮০ শতাংশ মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এই চড়ার সমস্যায় একসাথে এই সংখ্যক ট্রলার বন্দরে ঢুকতে পারছে না। জোয়ারের সময়গুলোতে ভাগে ভাগে ট্রলারগুলি ঢুকছে। ফলে ক্ষতির মুখে পড়ছেন শঙ্করপুরের মৎস্যজীবীরা।” তবে নাব্যতা বাড়ানোর জন্য ড্রেজিং-এর একটি পরিকল্পনা পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য উন্নয়ন নিগমের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

খাঁড়ির নাব্যতা কমে যাওয়ায় সমস্যায় শুধু শঙ্করপুর মৎস্য বন্দর নয়, দিঘা মোহনার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রও অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে। দিঘা মোহনার মৎস্যজীবী ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের অন্যতম সংগঠন দিঘা ফিশারমেন অ্যান্ড ফিশ ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান প্রণবকুমার কর বলেন, “অবিলম্বে শঙ্করপুর সমুদ্র খাঁড়ি ও দিঘা মোহনার খনন বা ড্রেজিং না করলে দিঘা মোহনার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কাজ স্তব্ধ হয়ে যাবে। অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা।”

দিঘা ফিশারমেন অ্যান্ড ফিশ ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গিয়েছে, দিঘা মোহনায় বর্তমানে ১৪০০টি ট্রলার ছাড়াও আড়াইশোর বেশি ভুটভুটি রয়েছে। এতে চেপেই মৎস্যজীবীরা সমুদ্র থেকে মাছ শিকার করে আনেন। শঙ্করপুর ও পাশ্ববর্তী অন্যান্য ছোট ছোট উপকূল জায়গা যেমন জুনপুট, শৌলা, জলধা ও নিউ জলধা থেকে মৎস্য শিকারি ও ওড়িশা উপকূলের প্রায় ৬০ শতাংশ সামুদ্রিক মাছ দিঘা মোহনার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কেনাবেচার জন্য আসে। প্রতিদিন গড়ে ৪৫০-৫০০ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় তিন কোটি থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা। এর ৮০ শতাংশ মাছই বিদেশের বাজারগুলিতে রফতানি করা হয়। বছরে বিদেশে মাছ রফতানি করে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আমদানি হয়ে থাকে। বাকি কুড়ি শতাংশ মাছ রাজ্যের ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারে বিক্রি করা হয়। কিন্তু চড়ার ফলে জোয়ারের সময় ছাড়া কোনও ট্রলারই শঙ্করপুর ও দিঘা মোহনায় ঢুকতে পারে না। ফলে দৈনিক তিন কোটির লেনদেন এই সময় দাঁড়ায় প্রায় অর্ধেকে। 

দিঘা ফিশারমেন অ্যান্ড ফিশ ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান প্রণবকুমার কর জানান, ২০০৪ সালে মৎস্য দফতরের পক্ষ থেকে শঙ্করপুর খাঁড়িতে ড্রেজিং করা হয়। সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের জলসম্পদ ও শক্তি দফতরের নিয়ন্ত্রণাধীন পুনের সেন্ট্রাল ওয়াটার পাওয়ার রিসার্চ সেন্টারের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ‘গ্রোয়েন’ পদ্ধতিতে দিঘা মোহনায় সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত ৫০০ মিটার চওড়া কংক্রিটের প্রাচীর তৈরি করা হয়। এর ফলে জোয়ারের জলোচ্ছ্বাস আটকে মোহনায় ভাঙন ঠেকানো গেলেও মোহনার পূর্ব দিকে ভাঙনের ধারা অব্যাহত। দিঘা সৈকতের পশ্চিমে ওড়িশার তালসারির কাছে বঙ্গোপসাগরে সুবর্ণরেখা নদীর মোহনায় বালুচর সৃষ্টি হয়ে ক্রমেই তা বাড়তে বাড়তে নিউ দিঘার দিকে সরে আসছে। ফলে সমুদ্রের জোয়ারের জলের স্রোত পশ্চিম থেকে পুবের দিকে সরে আসছে।

 প্রণববাবু বলেন, “তারপর থেকে দিঘা মোহনা ও শঙ্করপুর খাঁড়ির নাব্যতা বজায় রাখা নিয়ে রাজ্য মৎস্য দফতর কোনও সক্রিয় ভূমিকা নেয়নি। ফলে নাব্যতা কমতে কমতে চরার সৃষ্টি হয়েছে। ২০১২ সালে মৎস্য দফতর ২ কোটি টাকা ব্যয়ে শঙ্করপুর খাঁড়ি ও মোহনার চড়া সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সমুদ্র বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধি করতে যে ধরনের ড্রেজার ব্যবহার করা দরকার তা ব্যবহার না করে জেসিপি মেসিন দিয়ে খাঁড়ির মাটি তোলা হয়। ফলে ৪০০ মিটার জুড়ে খাঁড়ির মাটি তুলতে ২ কোটি টাকা খরচ হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি।”

সামনেই মাছের ভরা মরসুম। সারা বছর ধরে মৎস্যজীবী ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা এই মরসুমের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু চড়ার ফলে জোয়ারের সময় ছাড়া কোনও ট্রলার না ঢোকায় কোটি কোটি টাকা লেনদেনের মৎস্য ব্যবসা মার খাওয়ার আশঙ্কায় মৎস্যজাবীরা। প্রাক্তন বিধায়ক ও শঙ্করপুর ফিশারমেন অ্যান্ড ফিশ ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক স্বদেশরঞ্জন নায়ক সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, “সমুদ্র খাঁড়িতে চড়া পড়ায় ইতিমধ্যেই চড়ায় ধাক্কা লেগে বেশ কিছু ট্রলারের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।” ড্রেজিৎ নিয়ে অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য নিগম তেমন কোনও আশার কথা শোনাতে পারেনি। নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অমিতাভ বন্দ্যোপাধায় বলেন, “নাবার্ডের আর্থিক সহযোগিতায় শঙ্করপুর খাঁড়ি ও মোহনার ড্রেজিং নিয়ে নিগমের পক্ষ থেকে একটি পরিকল্পনা তৈরি করে ইতিমধ্যেই মৎস্য দফতরে পাঠানো হয়েছে। মৎস্য দফতর থেকে এ ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত পাওয়া গেলেই ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু হবে।”