দ্রৌপদীর থালার শাকান্ন খেয়েই তৃপ্ত হয়েছিলেন কৃষ্ণ। তাতে তৃপ্ত হয়েছিলেন দুর্বাসা। আর তাতেই ঋষির রোষ থেকে সে যাত্রায় বেঁচে যান পাণ্ডবেরা।

সেই মহাভারতের যুগ থেকেই তাই শাকের গৌরব যথেষ্ট। তবে সংস্কৃত সাহিত্যে তা তেমন সাতকাহন করে বলা নেই। কিন্তু আঞ্চলিক সাহিত্যে শাকের মর্যাদা কতটা তা টের পাওয়া যায় প্রাকৃত পৈঙ্গলেই। বাংলা রচনার অন্যতম আদি নিদর্শন প্রাকৃত পৈঙ্গলেই রয়েছে শাকের কথা। সুখী দাম্পত্যের সেই কথায়, বলা আছে, ‘ওগ্‌গর ভত্তা রম্ভঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সংযুক্তা। মোইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা পুনবন্তা।’ অর্থাৎ, কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মাছ আর নলচে শাক যে স্ত্রী পরিবেশন করেন, তাঁর স্বামী পুণ্যবান। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’-এর আদি পর্বে প্রাকৃত বাঙালির খাওয়াদাওয়া প্রসঙ্গে জানাচ্ছেন, সেকালে গ্রামের গরিব লোকের প্রধান খাবারই ছিল শাক আর নানা সব্জি। ষোড়োশ শতকে চৈতন্যচরিত কাব্যগুলিতে বাঙালির জীবনের যে রূপ পাওয়া যায়, তাতেও শাকের স্থান রয়েছে। চৈতন্য নিজেও নানা রকম শাক খেতে ভালোবাসতেন। তার মধ্যে ছিল কচু শাকও।

পুজোতেও শাক দেওয়া হত। কিন্তু কালীপুজোর সঙ্গে যে কবে থেকে চোদ্দো শাকের সম্পর্ক তৈরি হল, তার কোনও স্পষ্ট হিসেব নেই। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এই প্রথার সঙ্গে শস্যদায়িনী দেবী ভাবনার যোগ রয়েছে। শরতে নতুন ফসল উঠত। ফসলের পাশাপাশি পাওয়া যেত নানা শাকও। ভেষজবিজ্ঞানী ছন্দা মণ্ডল অবশ্য জনান, এই সময়ে ঋতু বদলের ফলে যে নানা রোগ ছড়ায়, তারই দাওয়াই ছিল এই শাকগুলি। এই চোদ্দো রকম শাক রোগ প্রতিরোধে অব্যর্থ। যদিও বাজারে ঝুড়ির মধ্যে যেটা ডাঁই করে রাখা থাকে তার মধ্যে চোদ্দোটা দূরের কথা, বড় জোর চার রকমের শাক মেলে। এখন আর ভেষজগুণ সম্পন্ন শাক মেলে না। বরং পুষ্টিকর শাকই মেলে।  

 

চোদ্দো শাক

ওল —কচিপাতা এবং ডগা খাওয়া হয়। বেটুমিলিক অ্যাসিড, স্টেরলিক যৌগ থাকে। অর্শ, রক্ত আমাশা, বাত, চর্মরোগ, গ্যাস-অম্বল সারাতে সাহায্য করে।

কেও—ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় জন্মায় কেও শাক। পাতা খাওয়া হয়। হজম করায়, খিদে বাড়ায়। কৃমিনাশক।

বেতো—আগাছার মতো জন্মায় এই শাক। পাতা আর কচি ডগা খাওয়া হয়। প্রচুর পরিমাণে জৈব অ্যাসিড থাকে। কৃমিনাশক, কোষ্ঠবদ্ধতা, অম্বল সারায়। পেপটিক আলসারে শাক খাওয়া বারন হলেও বেতো শাক খাওয়া যায়।

কালকাসুন্দা—গ্রামাঞ্চলে রাস্তার ধারে এই শাক জন্মায়। কোষ্ঠবদ্ধতা, অর্শ, ফিসচুলা, হুপিং কাশি, দাদের   জন্য উপকারি। অ্যান্টি-অ্যালার্জি উপাদানও রয়েছে।

নিম — ভেষজ শাস্ত্রে নিমকে বলা হয় সর্বরোগহর। কচি পাতা খেতে হয়। কুষ্ঠ, যে কোন চর্মরোগ, জণ্ডিস, বহুমূত্র, একজিমা সারায়।

সরষে— তেতো নয় বলে চোদ্দোশাকের মধ্যে বেশি করে সরষে শাক রাখা হয়। পেট পরিস্কার করে। বিটা ক্যারোটিন থাকায় অ্যান্টি অক্সিডেন্টের কাজ করে। চামড়া, লিভার, চোখের পক্ষে উপকারি।

শালিঞ্চা বা শাঞ্চে— ফাইটোস্পেরল থাকে। খিদে বাড়ায়। হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

জয়ন্তী —  কৃমি নাশক। ডায়রিয়া, বহুমূত্র, শ্বেতী এবং জ্বর সারাতে কাজে আসে। সদ্য প্রসূতিদের জন্য এই শাক খুব উপকারি।

গুলঞ্চ— গ্লাইকোসাইড, প্রোটিন, উপক্ষার ইত্যাদি জৈব রাসায়নিক থাকে। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ। বাত, রক্তচাপ, একজিমা, জন্ডিস সারায়। পরিপাকে সাহায্য করে।  

পলতা— চলতি কথায় পটলপাতা। এতে বিভিন্ন অত্যাবশ্যক ফ্যাটি অ্যাসিড, জৈব আসিড, খনিজ লবণ প্রচুর পরিমাণে থাকে। যে কোন শ্বাসের রোগে কার্যকরী। রক্তবর্ধক।  লিভার ও চামড়ার রোগ সরাতে অব্যর্থ।

ঘেঁটু বা ভাঁট— ফ্ল্যাভোনয়েড সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি ক্যানসার দমনে সহায়ক বলে দাবি করা হয়। এছাড়া কৃমি, কোলেস্টেরল, ব্লাড সুগার ও ডায়রিয়া নিরাময়ে সাহায্য করে।

হিঞ্চে— কথামৃতে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, হিঞ্চে শাকমাত্র নয়। হিঞ্চে খেলে পিত্তনাশ হয়। এর পাতা এবং কচি ডগা খাওয়া হয়। এতে থাকে ফাইটোস্টেরল-সহ বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক। রক্তশোধন করে। হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ায়। ক্ষুধাবর্ধক। জ্বর সারায়।

শুষনি— স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক অস্থিরতা কমায়। নিদ্রাকারক। মেধা এবং স্মৃতিবর্ধক।

শুলকা— শুলকা শাক সুগন্ধি। এতে থাকে টাবপিনয়েড। হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে, মায়েদের দুধের পরিমাণ বাড়াতে এবং ছোটদের পেটের রোগ সারাতে দারুণ কাজ করে।

ভেষজ গুণ বুঝে বেছে চোদ্দোটা শাকের এই তালিকা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মূলত মাঠে-ঘাটে জন্মানো এই শাকগুলোর অধিকাংশই দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে।