• সুরবেক বিশ্বাস
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

শহরে আল কায়দার কারা, তদন্তে গোয়েন্দা

ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়দার শাখা খোলার ঘোষণা সম্বলিত আয়মান আল জাওয়াহিরির ভিডিও টেপটির অস্তিত্ব জানা গিয়েছে গত সপ্তাহে। কিন্তু ইনটেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) ও কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এর সন্দেহ, ওই জঙ্গি সংগঠনের একটি ‘ঘুমন্ত’ শাখা কলকাতায় রয়েছে বেশ কিছুদিন ধরেই।

ওই শাখার সদস্যেরা কোনও এলাকার মানুষের মধ্যে এমন ভাবে মিলেমিশে থাকে যে, তাদের জঙ্গি হিসেবে চেনার উপায় থাকে না। জঙ্গি সংগঠনের রোজকার কার্যকলাপ বলে তাদের কিছু নেই, এমনিতে তারা ‘ঘুমন্ত’। কিন্তু কোথাও হামলা চালানো বা কোথাও অস্ত্র কিংবা বিস্ফোরক পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পেলে তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। গোয়েন্দা পুলিশের পরিভাষায় এই ধরনের শাখাকে বলে ‘স্লিপার সেল’।  

গোয়েন্দারা মনে করছেন, বর্তমানে জেলে থাকা মেটিয়াবুরুজের হারুন রশিদ, বসিরহাটের মিজানুর রহমানদের মতো হুজি (হরকত-উল-জেহাদ-ই-ইসলামি)-র কয়েক জন পুরনো চাঁইয়ের সাঙ্গপাঙ্গরা আল কায়দার ওই ‘ঘুমন্ত’ শাখার সদস্য। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলে কলকাতার আমেরিকান সেন্টারের সামনে জঙ্গি হামলায় অন্যতম অভিযুক্ত খুররম খৈয়াম ওরফে নাটা-র মতো হুজি নেতা। যাকে ১২ বছর ধরে খুঁজছে পুলিশ।

গোয়েন্দাদের দাবি, ২০০৫-এর জুলাই-অগস্ট মাসে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ-সহ কয়েকটি তল্লাটে ‘মুজাহিদিন আল কায়দা প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল’-এর নামে কুপন ছাপিয়ে টাকা তোলা হয়েছিল। বহু মানুষ ২৫ এবং ৫০ টাকা দামের ওই কুপন কিনেওছিলেন। ওই কুপনের সঙ্গে হুজি-র উস্কানিমূলক প্রচারপত্রও বিলি করা হয়েছিল মহল্লায় মহল্লায়। আইবি কর্তাদের একাংশের মতে, আল কায়দার নজরে যে কলকাতা রয়েছে, সেটা তখনই বোঝা গিয়েছিল।

এসটিএফের সন্দেহ, কলকাতা তথা এই রাজ্যে আল-কায়দার ‘ঘুমন্ত’ শাখা তৈরি করার পিছনে শওকত নামে এক জনের বড় অবদান রয়েছে। এসটিএফ সূত্রের খবর, মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা, লস্কর-ই-তইবার জঙ্গি জইবুদ্দিন আনসারি তথা আবু জুনদলের জন্য ২০০৬ সালে এই শওকতই হাওড়া স্টেশনে অপেক্ষা করছিল। হাওড়া স্টেশন থেকে জইবুদ্দিনকে নিয়ে সে তুলেছিল রবীন্দ্র সরণির একটি হোটেলে। পরিচয় ভাঁড়িয়ে ওই হোটেলে থাকার জন্য উত্তর ২৪ পরগনার এক বাসিন্দার সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রও জইবুদ্দিনকে দিয়েছিল শওকত। শুধু তা-ই নয়, পর দিন সকালে জইবুদ্দিনকে নিয়ে সে বেআইনি ভাবে পেট্রাপোল সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। শওকতই জইবুদ্দিনকে করাচি পৌঁছে দিয়েছিল বলে জেনেছেন গোয়েন্দারা।

এসটিএফ-এর এক কর্তার কথায়, “করাচির কন্ট্রোল রুমে বসে ২৬/১১-র হানাদারদের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ রেখে চলেছিলেন জইবুদ্দিন। আমরা মুম্বই গিয়ে আবু জুনদলকে জেরা করে শওকতের কথা জানতে পারি।” ওই অফিসারের মতে, “যত দূর মনে হচ্ছে, এই শওকত পশ্চিমবঙ্গেরই বাসিন্দা। কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে আল কায়দার ঘুমন্ত শাখা তৈরি করার পিছনে শওকতের ভূমিকা থাকতে পারে বলে আমাদের তখনই মনে হয়েছিল।”

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইবি-র বক্তব্য, এই ধরনের ঘুমন্ত শাখার সদস্যেরা একে অপরের কথা জানবে না, সেটাই স্বাভাবিক। খাদিমকর্তা অপহরণ কাণ্ডে অভিযুক্ত হুজি চাঁই মিজানুর রহমান ১১ বছর পরে কলকাতায় এসটিএফের হাতে ধরা পড়েছে। গত এক-দেড় বছরে দেশে ধরা পড়েছে ইয়াসিন ভটকল-সহ ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের কয়েক জন চাঁই ও সদস্য। তাদের জেরা করেই কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে আল কায়দার ঘুমন্ত শাখা থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। এক গোয়েন্দা-কর্তার কথায়, “আল কায়দা এখন শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়। জেহাদিদের বড় অংশের মধ্যে তা মতবাদে পরিণত।”  

এসটিএফ জেনেছে, গত বছর অক্টোবরে পটনার গাঁধী ময়দানে নরেন্দ্র মোদীর সভাস্থলের অদূরে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে মূল অভিযুক্ত হায়দার আলি ওরফে আবদুল্লা ও আসিফ মুজিবুল্লা ওরফে তৌফিক বছর খানেক আগেও কলকাতায় এসেছিল। এই হায়দার আবার তালিবান জঙ্গিদের তিন লক্ষ টাকা অর্থসাহায্য পাঠায়। গোয়েন্দাদের একাংশের বক্তব্য, কলকাতায় যখন এই ধরনের জঙ্গিদের আশ্রয়ের অভাব নেই, তখন আল কায়দার ‘ঘুমন্ত’ শাখা থাকাটা মোটেই বিচিত্র নয়।

ওসামা বিন লাদেনের হাতে গড়া সংগঠনের ‘ঘুমন্ত’ ওই শখার সদস্যদের চিহ্নিত করার জন্য আগে নাটা, শওকতদের হাতে পেতে চাইছে এসটিএফ।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন