কিছুতেই যেন কিছু এসে যায় না। বিরোধীদের মনোনয়ন আটকাতে সোমবারও লাগামছাড়া সন্ত্রাসের ছবি দেখা গেল জেলা থেকে জেলায়। লাঠি-গুলি-বোমা-ইটবৃষ্টি— যেখানে যেমন ‘ওষুধ’ দরকার পড়ল, তেমনই প্রয়োগ করল শাসকের বাহিনী।

বীরভূমের সিউড়িতে গুলিতে প্রাণ গেল একজনের। উত্তর ২৪ পরগনার গোপালনগরে আর একজনের। একাধিক জেলায় জ্বলল একের পর এক বাড়ি। আর গোটা মনোনয়ন পর্বের মতো এ দিনও শাসক সন্ত্রাসে ‘নিষ্ক্রিয় সমর্থন’ জোগানোর অভিয়োগ উঠল পুলিশের বিরুদ্ধে।

হাইকোর্টের নির্দেশ মতো সোমবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্য ‘অতিরিক্ত’ একটা দিন পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কতটা কার্যকরী হল আর কতটা প্রহসনে দাঁড়াল— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠিয়ে রাখল সারাদিনের ছবি।

আরও পড়ুন: রাজ্য জুড়ে তীব্র সন্ত্রাস, আক্রান্ত বিধায়ক, সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও

সকাল ১১টায় মনোনয়ন দেওয়া শুরুর আগে থেকেই মারধর-বোমাবাজি-ইটবৃষ্টি চালিয়ে বিরোধী প্রার্থীদের আটকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ আসতে শুরু করে প্রায় সব জেলা থেকেই। সময় যত এগিয়েছে, শাসক সন্ত্রাসও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রাজ্য জুড়ে।

বহরমপুরে রাস্তায় ফেলে পেটানো হল কংগ্রেস বিধায়ক মনোজ চক্রবর্তীকে। গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি তিনি। সমস্ত সন্ত্রাসের অভিযোগ শাসকের বিরুদ্ধে, কিন্তু শাসক বেশ নির্লিপ্তই। সমস্ত দোষ তারা চাপাচ্ছে বিজেপির উপরে। যেমন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেন, ‘‘বিজেপির পায়ের তলায় মাটি নেই। সে কারণেই ঝাড়খণ্ড থেকে লোক এনে হামলা চালাচ্ছে তারা।’’

গলির মধ্যেই বিজেপির পার্টি অফিস। তা লক্ষ্য করেই আগ্নেয়াস্ত্র, ইট, লাঠি নিয়ে হামলা চালাচ্ছে তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী, অভিযোগ বিরোধীদের। সিউড়িতে।

ছাড় পাননি খবর সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকরাও। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙাতে মারধর করা হয় আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সেবাব্রত মুখোপাধ্যায়কে। তাঁর মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। রামপুরহাটে মনোনয়নের ছবি তুলছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার চিত্র সাংবাদিক সব্যসাচী ইসলাম। তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী তাঁকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করতে শুরু করে। মাথা ফেটে রক্তাক্ত হয়ে যান তিনিও। কোনওক্রমে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। আলিপুরে খবর সংগ্রহে যান আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক আর্যভট্ট খান এবং কলকাতার এক টিভি চ্যানেলের মহিলা সাংবাদিক প্রজ্ঞা সাহা। আড়াই ঘণ্টা ওই মহিলা সাংবাদিকের কোনও খোঁজ মেলেনি। তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী তাঁকে তুলে যায় বলে অভিযোগ। আড়াই ঘণ্টা পর তিনি উদ্ধার হন। আর আর্যভট্ট খানকে অনেক ক্ষণ ফোনে পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায় তাঁর মোবাইল ফোন এবং ঘড়ি কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

কয়েক নজরে দেখে নিন নানান জেলায় গোলমালের কিছু খণ্ডচিত্র:

• অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি ছিল সিউড়িতে। তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় এক ব্যক্তির। মৃত ব্যক্তি বিজেপির কর্মী ছিলেন বলে জানানো হয় বিজেপির তরফে। একের পর এক বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় সিউড়িতে। এলাকা আপাতত শুনসান। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে উত্তর ২৪ পরগণার গোপালনগরে আরও এক ব্যক্তির।

ইট-বৃষ্টি চলছে বারুইপুর বিজেপির পার্টি অফিসে। 

• মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ায় বিরোধীদের উপর চড়াও হয় দুষ্কৃতীরা। মুর্শিদাবাদের সামসেরগঞ্জে কংগ্রেস সাংসদ আবু হাসেম খান চৌধুরীর গাড়িতে হামলা হয়। কংগ্রেস অফিসে ঢোকার মুখে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-বৃষ্টি, বোমা ছোড়া হয় বলে অভিযোগ।

আরও পড়ুন: মনোনয়ন ঘিরে অভিযোগে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা, পুলিশকে চিঠি কমিশনের

• ডায়মন্ড হারবার ব্লক-১ মনোনয়ন জমা দেওয়ার লাইন থেকে সমস্ত প্রার্থীদের বার করে দেয় তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনী। এমনকী বিনা কারণে সিপিএম প্রার্থী প্রবীর দাসের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেন সিপিএমের দক্ষিণ ২৪ পরগণার জেলা সম্পাদক শমীক লাহিড়ী। নোদাখালি থানার আইসি ফোন করে নাকি তাঁকে মনোনয়ন জমা দিতে মানা করেন। দিলে গ্রেফতারের হুমকিও দেন বলে অভিযোগ শমীকবাবুর। 

দেখুন ভিডিও:

 

• তাঁর আরও অভিযোগ, বজবজ ১ও ২, বিষ্ণুপুর ১ ও ২, ফলতা,  ডায়মন্ডরবার ১ ও ২ বিডিও অফিস তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনী ঘিরে রেখেছে। বিষ্ণুপুর ১ ব্লকের ভান্ডারিয়া জিপি-র মহিলা প্রধান সাজিদা বিবির শ্লীলতাহানি করার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের উপর। বজবজ ২ ব্লকে ব্যাপক বোমাবাজি চলছে।

• সকাল ১০টা নাগাদ আলিপুর এসডিও অফিসও তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনী দখল নিয়ে নেয়। আর তাঁদের পাহারাদার পুলিশ, অভিযোগ বিরোধীদের।

• আলিপুর এসডিও অফিসে যখন দখল নিচ্ছে তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনী। ঠিক সে সময়ই দক্ষিণ ২৪ পরগণার ফলতায় হরিণডাঙ্গা পার্টি অফিস থেকে সিপিএম প্রার্থীদের মেরে বার করে দেয় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তৃণমূলের বাইকবাহিনী।

• উত্তর ২৪ পরগণার স্বরুপনগরে মনোনয়ন জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে রবিবার রাত থেকেই শুরু হয়ে যায় অশান্তি। খুন হন এক ব্যক্তি।

• জলপাইগুড়ি সদর বিডিও অফিস দখল করে রেখেছে কৃষ্ণ দাস, নিতাই করের নেতৃত্বে তৃণমূলের এক বিশাল গুন্ডাবাহিনী। বিরোধীদের কাউকেই ভিতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না তাঁরা। এমনকী পুলিশকেও বিডিও অফিসের ভিতরে আটকে রেখে বাইরে তৃণমূল মনোনয়ন দিতে বাধা দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: ‘অনাথ’ করে দেবেন, হুমকি দিলীপের

• পূর্ব বর্ধমানের দাঁইহাটে সকাল থেকেই সিপিএমের পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়। সিপিএমের নেতা-কর্মীদের বার করে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয়। মনোনয়ন পত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়।

• পশ্চিম বর্ধমানের লাউদোহায় এসডিও অফিসে প্রার্থীদের নিয়ে মনোনয়ন জমা দিতে যান বাবুল সুপ্রিয়। অভিযোগ তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখান তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা। মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেন তাঁরা।

• হুগলির হরিপালেও বিডিও অফিসে তৃণমূলের হামলা। দিঘাতে রাতভর বিজেপি ও তৃণমূল সংঘর্ষ হয়। বিজেপির ব্লক সভাপতি সহ গুরুতর জখম হয়েছেন অনেকে। 

• নন্দীগ্রাম ব্লক-১ এ বিডিও দফতর থেকে বিজেপি প্রার্থীদের টেনে বার করে দেওয়া হয় পুলিশের সামনেই। নন্দীগ্রাম ব্লক-২ এ নির্দল প্রার্থীদের মাথা ফাটিয়ে দেয় তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী। হলদিয়াতেও একই ছবি। হলদিয়া এসডিও অফিস থেকে বিরোধী প্রার্থীদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেয় তৃণমূল। বিরোধীদের অভিযোগ, এসডিপিও তৃণমূল কর্মীদের সমর্থন করেন।

—নিজস্ব চিত্র।