Bengal Panchayat Elections 2018: Terror looms large over villages, People in abnormal mum dgtlx - Anandabazar
  • ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

গ্রাউন্ড জিরো থেকে: ভোট নেই, তাও ‘হাড়-হিম ঠান্ডা’ গ্রামে গ্রামে

Terror in Panchayat Election
গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

Advertisement

হিমঘরের ঠিক ছাদের উপর উঠে এল সূর্যটা। হিমেল সকাল। আগের রাতে জোর ঝড়বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। তাই ঝপ করে নেমেছে পারদ। না হলে বাঁকুড়া-পশ্চিম মেদিনীপুর-হুগলির এই এলাকার জল-হাওয়া এতটা নরম নয়, বেশ চড়া-ই বরং। প্রাকৃতিক ভাবে তো বটেই, রাজনৈতিক ভাবেও।

‘‘শুধু সকাল দেখে কী আর বুঝবেন? একটু গভীরে যান। দুপুর দেখুন, বিকেল দেখুন, রাত দেখুন। তা হলেই বুঝবেন, এলাকাটা কতটা ঠান্ডা।’’ বিতৃষ্ণা বাঁকুড়ার কোতুলপুর নিবাসী স্কুল শিক্ষকের কণ্ঠস্বরে।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে উত্তরে আদিগন্ত সবুজ। আর দক্ষিণে তেলের মতো একটা রাস্তা। যে কোনও জমানায় শাসকের একচ্ছত্র দাপট, রাজনৈতিক হিংসা আর হাড় হিম সন্ত্রাসের জন্য বার বার শিরোনামে এসেছে বাংলার যে এলাকা, রাস্তাটা সেই এলাকার মাঝ বরাবর এফোঁড়-ওফোঁড় গিয়েছে। হুগলির আরামবাগ-গোঘাট, বাঁকুড়ার কোতুলপুর-জয়পুর ছুঁয়ে সোজা বিষ্ণুপুর। লম্বা যাত্রাপথে বড় রাস্তা থেকে আরও দক্ষিণে নেমে গিয়েছে বেশ কয়েকটা পথ, যেগুলো পৌঁছে দেবে পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা-কেশপুর-চন্দ্রকোনার দিকে

সিহড়, গোপীনাথপুর, বাঁকাদহ, বৈতল— সন্ত্রাসের মানচিত্রে অত্যন্ত পরিচিত নাম। সেই সিহড় অঞ্চলেই কথা শুরু হল এক বস্ত্র বিপণির মালিকের সঙ্গে। ‘‘আচমকাই এখানে চলে এলেন? নাকি এই এলাকাটা সম্পর্কে জেনেশুনেই এলেন?’’ সংক্ষিপ্ত এবং সতর্ক ভঙ্গিতে প্রশ্ন ব্যবসায়ীর। বললাম, ‘‘জেনেশুনেই এসেছি।’’ পঞ্চায়েতের মরসুমে বাংলা জুড়ে যখন মার খাচ্ছেন সাংবাদিকরা, তখন কলকাতা থেকে কোনও সাংবাদিক একা হাজির হয়েছেন রাজনৈতিক সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে! চোখেমুখে একটু বিস্ময় সিহড়ের বাসিন্দার। তার পরে একটু মাথা নাড়েন প্রৌঢ়। বলেন, ‘‘বেশ। এসেছেন সে ভালই। কিন্তু পরিচয়টা যতটা পারবেন গোপন রাখবেন।’’ মুচকি হেসে জানালাম, চেষ্টা করব। তার পর ভোট বা সন্ত্রাস নিয়ে কথাবার্তা এগনোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রৌঢ় আর কোনও আগ্রহ দেখালেন না। বিরক্তি নিয়েই জানিয়ে দিলেন, ‘‘আমার কিছু বলার নেই। অন্য কোথাও দেখুন।’’

আরও পড়ুন: আরামবাগ সেই বিরোধীশূন্যই

সিহড়ের বস্ত্র ব্যবসায়ী কোনও ব্যতিক্রমী চরিত্র নন। কোতুলপুর, জয়পুর, আরামবাগ, গোঘাট বা গড়বেতায় এই চরিত্রগুলোই সংখ্যাগরিষ্ঠ এখন। পঞ্চায়েত ভোট বা রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলেই চোখে-মুখে অসন্তোষ বা বিতৃষ্ণার ভাব গোপন থাকে না এঁদের। কিন্তু সে বিষয়ে একটা শব্দও তাঁরা উচ্চারণ করতে চান না।

কথা বলবেন, এমন কাউকে পাওয়া যাবে না তা হলে? মনোনয়ন পর্বে এবং তার আগে ঠিক কী চলছিল এলাকায়, এখনই বা কেমন পরিস্থিতিটা, কেউ মুখ খুলবেন না তা নিয়ে? ‘‘মুখ খুলতে পারেন। তবে একটু ঘনিষ্ঠ পরিসরে। আপনি যে একেবারে অচেনা।’’ বলেন হুগলির কামারপুকুরের বাসিন্দা আর এক শিক্ষক। এই শিক্ষকের সঙ্গে আগেই আলাপ, এক বন্ধুর সূত্রে। অগত্যা তাঁর দ্বারস্থই হতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজস্ব পরিসরে উঁকি দিতে।

লালমাটির পথ ধরে মাইলের পর মাইল গেলেও কোনও ঝান্ডা চোখে পড়ে না। ভোটের আগেই মিটে গিয়েছে ভোট। —নিজস্ব চিত্র।

সন্ধ্যায় বাইকে চড়ে জয়রামবাটি থেকে দারাপুর হয়ে পৌঁছনো গেল লেগো গ্রামে। পঞ্চায়েত অফিসের পাশে ফুটবল গ্রাউন্ড। সন্ধের পর মাঠে ছেলে-ছোকরারা ইতিউতি গোল হয়ে বসে গল্প-গুজব করে। মাঠের কোনায় তেমনই এক ঠেকে হাজির হওয়া গেল কামারপুকুরের সেই শিক্ষকের সঙ্গে। একে অন্ধকার, তায়ে গোটা মাঠ জুড়ে একাধিক গোল গোল জটলা। চট করে বোঝা সম্ভব নয়, কোনও জটলায় বহিরাগত কেউ ঢুকেছেন কি না। তাই বাঁচোয়া।

লেগো ফুটবল গ্রাউন্ডে বসে কিছুটা জানা গেল মনের কথা। কয়েক বছর হল সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন এক যুবক। তিনি বলেন, ‘‘আগেও এখানে ভোট ঠিক ভাবে হত না। বুথে গন্ডগোল হতই। কিন্তু অন্য কাউকে নমিনেশনই করতেই দেবে না! সব সিট রুলিং পার্টির! এই রকম সিপিএম-ও করেনি।’’

কিন্তু তৃণমূলই কী ভাবে করল এই রকম? বিরোধীদের হয়ে কেউ এগিয়ে আসতে সাহস পেলেন না কেন? উত্তর ছিনিয়ে নেন পাশের যুবক। ‘‘কে বলল, কেউ এগিয়ে আসেননি? বিরোধীদেরও প্রার্থী রেডি ছিল। কিন্তু তাঁদের বিডিও অফিস পর্যন্ত পৌঁছতে দেবে, তবে তো!’’

বিরোধীদের কেউ পৌঁছতেই পারলেন না বিডিও অফিস পর্যন্ত? ‘‘কী করে পারবে বলুন তো? রোজ সকাল থেকে হাজার খানেক লোক অফিসটা ঘিরে রাখছিল। তির-ধনুক, টাঙ্গি, বল্লম, বোমা, বন্দুক— কী নেই তাদের হাতে! বিডিও অফিসে ঢোকার চেষ্টা করলে আর ফিরতে হত?’’ কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়েন যুবক। তবে দ্রুত সামলে নেন, আশপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আবার গলার স্বরটা নামিয়ে নেন। চাপা ক্রোধ মেশানো গলায় বলেন, ‘‘এর ফলটা কিন্তু টের পেতেই হবে। লোকসভা ভোটটাও তো আসছে। যদি কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকে, তা হলে দেখে নেবেন ফলটা কী হয়।’’

কতটা সন্ত্রস্ত তিন জেলা? কতটা ভয়ে এলাকাবাসী? দেখে নিন ভিডিয়ো:

 

 

 

যতটা সন্তর্পণে মুখ খোলেন লেগোর ওই যুবক, ততটাই সাবধানী বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারাও। পানাহার মোড়ের কাছে দেখা হয়ে যায় বিজেপি নেতা আতাউর শেখের সঙ্গে। আগে তৃণমূলেই ছিলেন। পরে মুকুল রায়ের হাত ধরে বিজেপি-তে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে অবশ্য কথা বাড়াতে চান না আতাউর। সঙ্গে যেতে বলেন। কোয়ালপাড়া পৌঁছে একটা চায়ের দোকানের একেবারে ভিতর দিকে নিয়ে যান। সেই আবডালে বসে বলেন,  ‘‘যখন নমিনেশন চলছিল, তখন রোজ ফোনে হুমকি দিয়েছে। বিডিও অফিসের দিকে যাওয়ার চেষ্টাই যেন  না করি। রোজ মনে করিয়ে দিয়েছে।’’

ঘুপচি দোকানঘরের একেবারে ভিতরে সেঁধিয়ে গিয়েও কিন্তু রেহাই মেলে না। ভোট নেই ঠিকই, কিন্তু নীরব-শীতল নজরদারিতে খামতি নেই এখনও। নিস্তরঙ্গ গ্রামে অচেনা মুখ দেখা গিয়েছে, দ্রুতই সম্ভবত খবর পৌঁছে যায় শাসক দলের স্থানীয় গুমটি অফিসটায়। চা খাওয়ার অছিলায় বা অন্য কোনও অজুহাতে দোকানের ভিতরটায় বার বার চোখ বুলিয়ে যেতে থাকে একের পর এক গম্ভীর মুখ, শীতল চাহনি। তার পরে ভিড় বাড়তে থাকে দোকানটার মুখের কাছে। দ্রুত বদলে যেতে থাকে যেন বাতাসটা। অতএব এ বার বিদায় জানাতেই হয় আতাউর শেখকে। তিনিও আর কালক্ষেপ না করে উঠে পড়েন। ভিড়টার মাঝখান দিয়ে বাইরে বেরনোর সময় টের পাওয়া যায় অস্বস্তিটা বেশ বেড়ে গিয়েছে।

পরিস্থিতি ক্রমশ প্রতিকূল হচ্ছিল। সিহড়ের প্রৌঢ় বস্ত্র ব্যবসায়ীর পরামর্শ মানিনি। সাংবাদিক পরিচয়টাকে সে ভাবে গোপন রাখার চেষ্টা করিনি। অতএব ঝুঁকি বাড়ছিল। কিন্তু সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে ততক্ষণে ২৪ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। নানা ফিসফাস কানে আসতে শুরু করেছে নানা প্রান্ত থেকে। সে সবে কান পাতার লোভও সামলানো কঠিন।

রামডিহার এক যুবক একটা ফোন নম্বর দিলেন। জানালেন, নম্বরটা কোনও বিজেপি নেতার। সে নেতা মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন। নাম কী নেতার? যুবক বলেন, ‘‘তা ঠিক জানি না।’’ কিছুটা অন্ধকারের মধ্যেই ঢিল ছুড়তে হল অগত্যা। সেই নম্বরে ফোন করে নিজের পরিচয় দিতে হল। বিজেপি নেতা বললেন, ‘‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমরা কথা বলতে চাইছি। খুব সঙ্কটের মধ্যে আছি। আপনি কোতুলপুর সদরে এলে খুব ভাল হয়।’’

আরামবাগ। মনোনয়ন জমা দিতে আসায় প্রশাসনিক ভবন চত্বরে মার বিরোধী দলের মহিলা নেত্রীকে। —ফাইল চিত্র।

বেশ ঝুঁকি নিয়েই সম্পূর্ণ অচেনা এক সাক্ষাৎপ্রার্থীর সঙ্গে দেখা করার জন্য রওনা হতে হল অতএব। প্রায় ১৩ কিলোমিটার রাস্তা। ছেঁড়া ছেঁড়া বসতি, মাঝে বিস্তীর্ণ জনশূন্য প্রান্তর রাস্তার দু’ধারে। বাইকের পিছনে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ছুটে আসতে থাকে আরও দু’টো বাইক। কারা ওরা? ফলো করছে কি? সতর্ক চোখ রাখতে হয় লুকিংগ্লাসের দিকে। তবে মাঝপথ পর্যন্ত এসে রাস্তায় ধারে এক সময় থেমে যায় সেই দুই বাইক। ওরা কারা ছিল, কোনও উদ্দেশ্য ছিল কি? জানা যায় না আর।

আরও পড়ুন: সক্রিয় খোদ মমতা, পাল্টা চালেই কি জঙ্গলে অসীমানন্দকে চাইছে বিজেপি

বিজেপি নেতা বলেছিলেন, কোতুলপুর নেতাজি মোড়ে পৌঁছে ফোন করতে। কিন্তু যাঁর বাইকে সে পর্যন্ত যেতে হল, তিনি আবার বিজেপি নেতার মুখোমুখি হতে চান না। ফলে নেতাজি মোড়ের এক প্রান্তে কোনওক্রমে নামিয়ে দিয়েই দ্রুত বাইক ঘুরিয়ে হাওয়া হলেন তিনি। পায়ে হেঁটে মোড়ের অন্য প্রান্তে গিয়ে ফোন করতে হল বিজেপি নেতাকে। জানাতে হল, ‘‘পে-অ্যান্ড-ইউজ টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি।’’ বললেন, ‘‘একটু দাঁড়ান, বাইক নিয়ে আসছি।’’ শুরু হয় অপেক্ষা। এর মাঝে যত বাইক সামনে এসে থামে, তাঁদের প্রত্যেকের দিকেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে হয়। মিনিট দশ-বারো পরে হেলমেট পরিহিত যুবক বাইক নিয়ে খুব ধীরে সামনে এসে দাঁড়ান। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তাঁরও। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কথা বলেন না। মিনিট খানেক পরে এগিয়ে যেতেই হল। জিজ্ঞাসা করতে হল— আপনি? ‘‘হ্যাঁ-হ্যাঁ আমি। উঠে পড়ুন।’’

বাইক ছুটল কোতুলপুর চৌরাস্তার দিকে। কার বাইকে চড়েছি জানা নেই। ঠিক কোথায় যাচ্ছি জানা নেই। ইনি সেই বিজেপি নেতাই তো? নাকি কোনও ফাঁদ? সাত-পাঁচ ভাবনা আসতে থাকে মনে। এরই মধ্যে চৌরাস্তা ছাড়িয়ে কিছুটা গিয়ে বাইকের গতি কমে। বাইকের চালক কয়েক জনকে যেন ইশারায় ডেকে নেন, সামনের দিকে কোনও গন্তব্যে পৌঁছতে বলেন।

একটা লজের ভিতরে প্রায় লুকিয়ে শুরু হয় সাক্ষাৎকার। নেতা রয়েছেন। আরও পাঁচ-সাত জন দেখা করতে এসেছেন। মিডিয়াকে জানাতে এসেছেন নিজেদের অভিজ্ঞতা।  মির্জাপুর অঞ্চলের বাসিন্দা হরপ্রসাদ কুণ্ডু বললেন, ‘‘স্ত্রীকে মনোনয়ন পেশ করাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। বিডিও অফিসে হবে না, বুঝতে পেরেছিলাম। তাই বিষ্ণুপুর এসডিও অফিসে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় পুলিশ একবার আটকাল। বললাম স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি। ছেড়ে দিল।’’ বলে চলেন হরপ্রসাদ। ‘‘আবার এসডিও অফিসের সামনে পথ আটকাল পুলিশ। বলল কোথায় যাবে? বললাম নমিনেশন জমা দিতে। বলল, যাওয়া যাবে না, ১৪৪ ধারা রয়েছে। আমি বললাম, ভিতরে যে পাঁচ-ছশো লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে! ওদের জন্য ১৪৪ নেই? পুলিশ বলল, মার খেতে চাইলে ভিতরে যাও।’’ মনোনয়ন জমা দেওয়া হয়নি হরপ্রসাদের স্ত্রীয়ের। রাজু সাহাও আক্রান্ত। গেরুয়া ঝান্ডা ধরার ‘অপরাধে’ এলাকাছাড়া ছিলেন দিন দশেক। পরিবারের রোজগারের একমাত্র সম্বল কোতুলপুর চৌরাস্তার চায়ের দোকান। রাজু বলেন, ‘‘দোকানটা বন্ধ করে দিয়েছিল। তৃণমূল নেতা সাদেক কিছুতেই দোকান খুলতে দিচ্ছিল না। পরে পুজো কমিটির লোকজন মধ্যস্থতা করেছে। কয়েক দিন হল দোকানটা খুলতে পেরেছি।’’ জয়দেব কুণ্ডুর চোখে এখনও দুঃস্বপ্নের ঘোর— ‘‘সে দিন যদি এসডিও অফিসে ঢুকতাম, আর ফিরে আসতাম না।’’ কবে? ‘‘ওই যে দিন আবার নতুন করে মনোনয়ন জমা নেওয়ার তারিখ হয়েছিল, সে দিন।’’

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

এই সন্ত্রাসের মুখোমুখি কি শুধু বিজেপি? নাকি অন্যান্য বিরোধী দলেরও একই অবস্থা? এককালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিএম নেতা অমিয় পাত্রের অসহায় কণ্ঠস্বর বুঝিয়ে দেয়, সিপিএমের হালও একই রকম। বাঁকুড়া জেলা সিপিএমের সম্পাদক ছিলেন অমিয়বাবু। দলের সদ্যসমাপ্ত ২২তম কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছেন। পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়ার পর থেকে একাধিকবার আক্রান্তও হয়েছেন ইতিমধ্যেই।

বাম জমানাতেও কি এই এলাকায় একই রকম ছিল না পরিস্থিতিটা? অমিয় পাত্র বলেন, ‘‘একেবারেই না। এ বার গোটা বিষ্ণুপুর মহকুমার কোনও জেলা পরিষদ আসনে বিরোধীদের প্রার্থী নেই। সব ক’টা পঞ্চায়েত সমিতি, সব ক’টা গ্রাম পঞ্চায়েত দখল হয়ে গিয়েছে। আমাদের আমলে কোতুলপুর-জয়পুরে কিছুটা গোলমাল হত। কারণ এলাকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিটাই ওই রকম। এক দিকে মেদিনীপুরের গড়বেতা-কেশপুর, আর এক দিকে হুগলির গোঘাট-আরামবাগ। কিন্তু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১০০ শতাংশ আসন আমাদের দখলে, এমনটা কখনও হয়নি। আর ইন্দাস-পাত্রসায়র-বিষ্ণুপুর-সোনামুখীতে বরাবরই ভোট হয়েছে।’’

এ বার হল না কেন? প্রবীণ সিপিএম নেতা বলেন, ‘‘কী করে হবে? বিষ্ণুপুরে কিছু মনোনয়ন জমা দেওয়া গিয়েছিল। এসডিপিও নিজে গিয়ে প্রার্থীদের হুমকি দিয়ে এসেছেন, মনোনয়ন না তুললে গাঁজার কেস দিয়ে দেবেন বলেছেন।’’

ভাঙচুরে তছনছ অমিয় পাত্রের বাড়ি। —ফাইল চিত্র।

কী বলছে শাসক দল? সফর সেরে শেষ বেলায় ফোন করেছিলাম কোতুলপুর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি প্রবীর গড়াইকে। মাওবাদী নেতা কিষেণজির ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী ছিলেন যে সুচিত্রা মাহাতো, সেই সুচিত্রার স্বামী এই প্রবীর গড়াই। তিনি বলেন, ‘‘কোথায় সন্ত্রাস? কোনও বিরোধী দলেরই কোনও সংগঠন নেই। সিপিএম-কে লোকে আর বিশ্বাস করে না। আর গোটা কোতুলপুরে বিজেপি-র কর্মীর সংখ্যা মেরেকেটে ৫০। ১৬৩টা বুথে প্রার্থী দেবে কী ভাবে?’’ এতই যদি দুর্বল হবেন বিরোধীরা, আক্রান্ত হতে হল কেন তাঁদের? কেন ঘরছাড়া থাকতে হল? প্রবীর গড়াই বলেন, ‘‘নিজেরাই ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আমরা বললাম, ফিরে এসো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না, যে দল করতে চাও, সেই দলই কর। কেউ মারবে না।’’ কিন্তু কোতুলপুর চৌরাস্তায় তো এক বিজেপি কর্মীর চায়ের দোকানটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। প্রবীর গড়াই বলেন, ‘‘আমরা যদি না চাইতাম, দোকান কি খুলতে পারত? বলছে পুজো কমিটি দোকান খুলিয়ে দিয়েছে। পুজো কমিটির সদস্যরা কোন দল করেন? তাঁরাও তো তৃণমূল। তা হলে তৃণমূলই তো দোকানটা খুলিয়ে দিল। এর পরেও কী ভাবে বলবেন সন্ত্রাস!’’

এত সন্ত্রাসের অভিযোগ, বিরোধী দলের এত সদস্য ঘরছাড়া, তিনটে জেলার প্রায় তিনটে মহকুমা জুড়ে বিরোধী দল নিশ্চিহ্ন। কিন্তু তৃণমূল নেতাদের কণ্ঠস্বর অদ্ভুত নির্লিপ্ত, আশ্চর্য রকম শীতল।

কোতুলপুর নিবাসী শিক্ষকের কথা মনে পড়ে যায়— গভীরে যান, দুপুর-বিকেল-রাত দেখুন, তা হলেই বুঝবেন, এলাকাটা কতটা ঠান্ডা।

মনে পড়ে যায় সেই রাতের দুর্যোগের কথা, যার জেরে পরের সকালটা ছিল হিমেল। মনোনয়ন পর্বে সে রকমই ভয়ঙ্কর দুর্যোগ দেখে নিয়েছে তিন জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তার রেশ এখনও বহাল। হা়ড় হিম এখনও সন্ত্রস্ত লালমাটির। সফর শেষে কলকাতায় ফেরার পথেও উপলব্ধিটা থেকে যায়— গ্রামের পর গ্রামের স্নায়ুতন্ত্রে-শিরদাঁড়ায় খেলে যাচ্ছে হিমেল স্রোত।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন
বাছাই খবর

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন