উন্নয়নের দাবি যেখানে জোরালো সেখানে মনোনয়নপর্ব থেকেই এত হিংসা কেন? পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ প্রশ্ন আগেই উঠেছিল। এবার চর্চা শুরু হয়েছে, এতে লাভ কার? আদৌ কোনও লাভ হয় কি? ময়দান বিরোধীশূন্য করার এই রাজনীতি যে বিপরীত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে বিভিন্ন মহলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে তা নিয়েও। এবারের পঞ্চায়েত ভোটের মনোনয়ন ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে ‘সিঁদুরে মেঘ’ দেখছেন তৃণমূলের একাংশ। দলের এই ক্ষতি ঠিক কতটা? মাঝেরতলার মতো এবার শাসকের উপরতলায়ও শুরু হয়ে গিয়েছে এই অঙ্ক।

উদাহরণ হিসাবে অনেকেই টেনে আনছেন বাম আমলের কেশপুর বা আরামবাগ এবং তৃণমূল জামানার বিধাননগর। ক্ষমতায় থাকাকালীন একেবারে বিরোধীশূন্য রেখেই পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর বিধানসভা আসনে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয় ধরে রেখেছিল সিপিএম। পরিবর্তনের পরে সেই কেশপুরে এখন সিপিএমকে হারতে হচ্ছে একই ব্যবধানে। আরামবাগেও ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে প্রায় ছয় লক্ষ ভোটে জিতে রেকর্ড করেছিল সিপিএম। সংরক্ষণের কারণে ২০০৯ সালে রেকর্ডধারী অনিল বসু প্রার্থী ছিলেন না ঠিকই, জিতলেন সিপিএমের ব্যবধান কমে এসেছিল দুই লক্ষে। ২০১৪ সিপিএম হেরে যায় তিন লক্ষ ৪০ হাজার ভোটে।

একইভাবে ২০১৫ সালে বিধাননগর পুরভোটে গায়ের জোরে ওয়ার্ড দখলের অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। সল্টলেকে তাদের আক্রমণাত্মক ভূমিকা চোখের সামনে দেখা গিয়েছিল। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল বিধাননগর আসন জিতলেও সল্টলেক এলাকায় পিছিয়ে গেল।

বাম আমলে হোক বা তৃণমূল জমানা, সাংগঠনিক শক্তিতে সব নির্বাচন শাসকের মুঠোয় রাখার উদাহরণ এ রাজ্যে ভুরি ভুরি। হলদিয়া, গড়বেতা, গোঘাট, রায়না, মেমারি, মঙ্গলকোট, নানুর, শাসন, ভাঙড়, ক্যানিং—গত তিন দশকে ধারাবাহিক ভাবে ‘আধিপত্যে’র
প্রতীক হয়ে রয়েছে রাজ্যের এই জায়গাগুলি। রেকর্ড ভোটে জেতা প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক নন্দরানী
ডল বা সাংসদ অনিল বসুদের নামও ফিরে আসছে এই আলোচনায়। পরিবর্তনের হাওয়ায় তাঁদের অস্তিত্ব কার্যত বিলুপ্ত। মানুষ তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই সব দৃষ্টান্ত সামনে রেখেই তাই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সন্ত্রাস করে একবার দু’বার ভোটে জেতা গেলেও দীর্ঘমেয়াদী হয় না। জনগন সময় মতো ‘পাল্টা জবাব’ দিয়ে দেয়। সবসময় যে রাতারাতি ফল পাওয়া যায় তা নয়। বাম শাসনের অবসান ঘটতেও ৩৪ বছর লেগেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘মানুষের স্বাভাবিক মত স্থায়ীভাবে চেপে রাখা সম্ভব নয়। সুযোগ পেলে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধেই যায়।’’

 তবে তৃণমূলের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন না তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘দলের ভাবমূর্তি তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। দু’-একটা ঘটনা ঘটেছে। তাতে ধাক্কা লেগেছে এমন কথা বলার সময় আসেনি।’’