কখনও আংটির ভিতর দিয়ে গলে গিয়েছে। আবার কখনও বড় দেশলাইয়ের বাক্সে এঁটে গিয়েছে একটি গোটা শাড়ি। 

মসলিনের সূক্ষ্মতার কিংবদন্তী সত্যি প্রমাণ করছেন নবদ্বীপের মাটিয়ারি কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানের কারিগরেরা। সর্বোচ্চ পাঁচশো কাউন্টের মসলিন সুতোর কাপড় তাঁরা বাণিজ্যক ভাবে উৎপাদন করছেন অনেক দিন ধরেই। সূক্ষ্ম মসলিন উৎপাদনে রাজ্যের অন্যতম অগ্রণী কেন্দ্র নবদ্বীপের ওই প্রতিষ্ঠানে কাটুনি থেকে বুনন শিল্পী— প্রায় প্রত্যেকেই রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন কোনও না কোনও সময়ে। এ বার তাঁদের মসলিন সাফল্যকে স্থায়ী করতে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্যের খাদি বোর্ড। কিংবদন্তীর মসলিনের এ বার জি আই রেজিস্ট্রেশন হতে চলেছে। 

পশ্চিমবঙ্গ খাদি এবং গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের তরফে ইতিমধ্যেই এই সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পর্ষদের চেয়ারম্যান গৌরীশঙ্কর দত্ত জানান, “মসলিন বাংলার নিজস্ব সম্পদ। তাই আমরা মসলিনের জি আই রেজিস্ট্রেশন করানোর প্রস্তুতি নিয়েছি। এই কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। সামান্যই বাকি আছে। বাংলার মসলিনের জি আই রেজিস্ট্রেশন পাওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।”  

ও পার বাংলার জনপ্রিয় যাত্রা ‘সোনাই বিবির পালা’তে এক আশ্চর্য শাড়ির বর্ণনা আছে। ‘‘পরথমে পাইড়াইল শাড়ি, নামে গঙ্গার জল। নুখেতে নইলে শাড়ি, আরও করে টলমল! পানিতে থইলে গো শাড়ি, শাড়ি পানিতে মিলায়, শুখেনায় থইলে শাড়ি ভাইরে, পিঁপড়ায় টাইন্যা লইয়া যায় রে।’’— এ পালা গত শতকের। যদিও এর বহু আগে খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে লেখা ‘পেরিপ্লাস অব দি এরিথ্রিয়ান সি’ নামের বইতে বঙ্গদেশে তৈরি এক বিশেষ বস্ত্র সম্পর্কে হুবহু একই রকমের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সে কাপড় মসলিন! তাতে সর্বোৎকৃষ্ট মসলিনকে গেনজেটিক বা গঙ্গাজলি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একটু মোটা ধরনের মসলিনকে মলোচিনা আর প্রশস্ত ও মসৃণ মসলিনকে মোনাচি নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

মসলিন। কায়ায় সঙ্গে সে জড়িয়ে থাকত ছায়ার মতো। বাংলার তাঁতের অহঙ্কার। তাঁতিদের আঙুলের ইন্দ্রজালে মাকড়সার জালের মতো প্রায় অদৃশ্য সুতোর টানাপড়েনে বারে বারে ‘বেআব্রু’ হয়েছে রোম সুন্দরী থেকে মুঘল সম্রাজ্ঞীর উষ্ণ শরীর। প্লিনি অভিযোগ করেছেন যে, মসলিনের ক্ষীণ আব্রুর ফাঁকে রোমান সুন্দরীরা দেহের বঙ্কিম রেখা, দেহসৌষ্ঠব প্রকাশ করতে ভালবাসতেন। তাই বাংলার মসলিন ছিল তাঁদের প্রথম পছন্দ। তখন রোম সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে গ্রিসে মসলিন বিক্রি হত। আবার, মিশরের প্রাচীন মমির শরীরে মিলেছে সূক্ষ্ম মসলিন। 

দু’হাজার বছর ধরে কিংবদন্তী হয়ে ওঠা সেই মসলিনের এবার জি আই রেজিস্ট্রেশন হতে চলেছে। সূক্ষ্ম মসলিন উৎপাদনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে জড়িয়ে আছে নদিয়া মাটিয়ারি কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ ভারতে এক সময়ে মসলিনের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও স্বাধীনতার পর ফের শুরু হয়ে যায় মসলিন উৎপাদন। ফের সেই সূক্ষ্মতা অর্জনের লক্ষ্যে শুরু হয় সাধনা। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয় মসলিন উৎপাদনের কাজ। 

সূক্ষ্ম মসলিন উৎপাদনে রাজ্যের অন্যতম অগ্রণী কেন্দ্র নবদ্বীপের মাটিয়ার কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক শুভাশিস চক্রবর্তী জানান, “দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পাঁচশো কাউন্টের মসলিন তৈরিতে আমরাই প্রথম সফল হই। এখন তা বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন হচ্ছে। এর পর আমরা ছ’শো কাউন্টের উৎপাদন পরীক্ষামূলক ভাবে সফল হয়েছি। কিন্তু  এই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মসলিন যে আমরাই উৎপাদন করছি, সেই দাবি চিরস্থায়ী করার জন্য জি আই রেজিস্ট্রেশন খুবই জরুরি ছিল। খাদি বোর্ড এর জন্য উদ্যোগী হয়েছে। আমরা ভীষণ খুশি।” গত মে মাসের শেষদিকে নবদ্বীপের মসলিন উৎপাদনকারী ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যাবতীয় নথি নিয়ে গিয়েছেন খাদি বোর্ডের কর্তারা।    

এই প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ খাদি এবং গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, এখন বিভিন্ন রাজ্যে মসলিন উৎপাদন হলেও সুক্ষ্ম মসলিন কেবল মাত্র এই রাজ্যেই হয়। অন্য রাজ্যের মসলিন যেখানে দেড়শো থেকে বড় জোর দুশো কাউন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সেখানে এই রাজ্যে পাঁচশো কাউন্ট পর্যন্ত বাণিজ্যিক ভাবে উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে নদিয়া এবং মুর্শিদাবাদের মসলিন উৎকৃষ্টতম। তিনি বলেন, “নবদ্বীপে মাটিয়ারি কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান তো ছয়’শো কাউন্টের সুতো তৈরি করে ফেলেছে। এই রাজ্যের মসলিন যখন ফের সেই কিংবদন্তী সূক্ষতার পথে এগোচ্ছে তখন তার স্বত্ত্বাধিকার খুব জরুরি। এই জন্য জি আই রেজিস্ট্রেশনে উদ্যোগী হয়েছে। কেননা, মিলে বোনা মসলিন আর হাতে বোনা কাপড়ের মধ্যে আসল নকলের ফারাকটা নির্ধারণ করতে জি আই একমাত্র অস্ত্র।”     

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।