পদ্মায় ইলিশ ধরতে যাওয়া মৎস্যজীবীদের আটক করা নিয়ে প্রথমে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে বাদানুবাদ। তার পরে চলল গুলি। প্রাণ গেল এক বিএসএফ জওয়ানের। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অভিযোগ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি-র ছোড়া গুলিতেই নিহত হয়েছেন তাদের হেড কনস্টেবল বিজয়ভান সিংহ (৫১)। আহত আরও এক জওয়ান। আজ এই ঘটনা ঘটে বাংলাদেশের রাজশাহির চারঘাট উপজেলা সদরের বালুঘাট এলাকায় পদ্মা ও তার শাখা বড়াল নদীর মোহনায়। উল্টো দিকে খুব কাছেই মুর্শিদাবাদের জলঙ্গির কাকমারি চর।

বিজিবি-র দাবি, বিএসএফ গুলি চালালে আত্মরক্ষার্থে তারাও গুলি চালায়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গুলিতে নিরাপত্তাবাহিনীর কারও এ ভাবে মৃত্যুর নজির স্মরণকালে নেই। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ বিএসএফ এবং বিজিবি ফ্ল্যাগ মিটিং করে। বিজিবি-র অন্যতম কর্তা ফেরদৌস মাহমুদ বলেন, ‘‘বিএসএফ দাবি করেছে, তাদের এক জন নিহত হয়েছেন। কিন্তু আমরা কোনও তথ্যপ্রমাণ পাইনি।’’ প্রণব মণ্ডল নামে এক মৎস্যজীবী এখন বিজিবি-র হেফাজতে।

স্থানীয়রা জানান, পদ্মার মাঝামাঝি জাল-দেওয়া জল-সীমানা দিন কয়েক আগে শিথিল করেছিল বাংলাদেশ। বর্ষায় তেমন ইলিশের দেখা না-মেলায় মুর্শিদাবাদের ডোমকল-জলঙ্গি এলাকার মৎস্যজীবীরা তাই কিছুটা আশার আলো দেখেছিলেন। বৃহস্পতিবার ভোরে একটি নৌকায় কাকমারি থেকে পদ্মায় ইলিশ ধরতে গিয়েছিলেন প্রণব মণ্ডল, অচিন্ত্য মণ্ডল এবং বিকাশ মণ্ডল। অভিযোগ, জলঙ্গির শিরচরের বাসিন্দা ওই তিন জন যখন মাছ ধরছিলেন, তখন বিজিবি সীমান্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁদের আটক করে। বিএসএফ জানিয়েছে, আটক হওয়ার পরে মৎস্যজীবীরা বলেছিলেন যে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের অনুমতি নিয়েই পদ্মার ওই অংশে মাছ ধরতে এসেছেন তাঁরা। শুনে বিজিবি-র জওয়ানেরা প্রণবকে আটকে রেখে অন্য দু’জনকে বলেন, ‘‘তোরা বিএসএফকে ডেকে আন। তার পরে ওকে ছাড়ব।’’ অচিন্ত্য ও বিকাশ ১১৭ নম্বর ব্যাটেলিয়নের কাকমারি বিএসএফ ক্যাম্পে এসে ঘটনাটি জানান।

জখম রাজবীর সিংহ যাদব।

সব শুনে দুই ধীবরকে নিয়ে বিএসএফের তিন জওয়ান স্পিডবোটে মাঝপদ্মায় যান বিজিবি-র সঙ্গে ফ্ল্যাগ মিটিং করতে। অভিযোগ, জলসীমা নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের কথা কাটাকাটি শুরু হয়। প্রণবকেও ছাড়তে রাজি হয়নি বিজিবি। সেই সময়েই বিজিবি-র স্পিডবোটের সঙ্গে বিএসএফের স্পিডবোটের ধাক্কা লাগায় পরিস্থিতি আরও তেতে ওঠে। বিএসএফ সূত্রে খবর, ধাক্কা লাগার পরেই বিজিবি-র আরও একটি বোট তাদের বোটের কাছাকাছি চলে আসে।

বিজিবি ঘিরে ফেলছে দেখে বিএসএফ জওয়ানেরা আর ঝুঁকি নেননি। তিন জওয়ান দুই ধীবরকে নিয়েই ফিরতি পথ ধরেন। অভিযোগ, এই সময়েই বিজিবি-র স্পিডবোট থেকে ছিটকে আসতে থাকে গুলি। বিজয়ভানের মাথার ডান দিকে গুলি লাগে। উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা রাজবীর স্পিডবোট চালাচ্ছিলেন। গুলি লাগে তাঁর হাতে। সাগরপাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে বিজয়ভানকে মৃত ঘোষণা করা হয়। রাজবীরকে ভর্তি করানো হয় মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালে। তাঁর চোট গুরুতর।

বাংলাদেশের চারঘাট উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘‘এটা ইলিশের প্রজননের মরসুম হওয়ায় বাংলাদেশের সব নদীতে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেই জন্যই নদীতে টহল দিচ্ছিল বিজিবি। তারা দেখে, বাংলাদেশের জলসীমার ভিতরে তিন ভারতীয় মৎস্যজীবী ইলিশ ধরছেন। তাঁদের মধ্যে দু’জন পালিয়ে যান, এক জনকে আটক করা হয়।’’ বিজিবি-র অভিযোগ, ওই দু’জন ফিরে গিয়ে বিএসএফকে ঘটনাটি জানালে তারা এসে আটক ধীবরকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। কটূক্তিও করা হয়।

এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের দাবি, কাকমারি ফাঁড়ি থেকে স্পিডবোটে বিএসএফের ‘৪ জন’ জওয়ান বাংলাদেশের প্রায় ৪০০-৫০০ গজ ভিতরে ঢুকে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে এক জন ইউনিফর্ম পরিহিত থাকলেও বাকিরা হাফপ্যান্ট ও গেঞ্জি পরে ছিলেন। বিএসএফের দলটির কাছে অস্ত্রও ছিল। বিজিবি তাদের বলে, আটক মৎস্যজীবীকে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে ফেরানো হবে। কিন্তু বিএসএফের ওই দলটি যে-হেতু ‘অবৈধ ভাবে’ বাংলাদেশে ঢুকেছে, তাই তাদেরও ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে ভারতে হস্তান্তর করা হবে। বিজিবি-র দাবি, এই কথা শুনেই বিএসএফের দলটি পালাতে যায়। বিজিবি বাধা দিলে বিএসএফ জওয়ানেরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে বোটে করে ভারতের দিকে চলে যেতে থাকেন। তখনই বিজিবি আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়।

নিহত বিজয়ভান উত্তরপ্রদেশের ফিরোজাবাদের বাসিন্দা। তাঁর দুই ছেলে। মৎস্যজীবী প্রণবকে বিজিবি-র চারঘাট করিডর সীমান্ত ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে বলে বিজিবি সূত্রের দাবি। প্রণবের স্ত্রী রেখা মণ্ডল বলছেন, ‘‘ওরা তো বিএসএফের অনুমতি নিয়েই মাছ ধরতে গিয়েছিল। মানুষটাকে নিয়ে ওরা কী করছে, কেমন আছে কিছুই জানি না।’’ বিকাশ রয়েছেন বিএসএফ ক্যাম্পে। তাঁর স্ত্রী খঞ্জনা মণ্ডল বলেন, ‘‘শুধু চিঁড়ে বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল। সেটাও খেল কি না কে জানে।’’

এই ঘটনা নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত কিছু বলেনি বিদেশ মন্ত্রক। যদিও বিকেলেই গোটা ঘটনাটি মন্ত্রকের বাংলাদেশ বিভাগকে জানান বিএসএফের ডিজি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দু’সপ্তাহ আগেই নরেন্দ্র মোদী এবং শেখ হাসিনা দিল্লিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা অংশীদারির দাবি জানিয়েছিলেন। যৌথ বিবৃতিতেও সীমান্তকে আরও শান্তিপূর্ণ করার কথা বলা হয়েছিল। এর পরে এমন ঘটনা সাউথ ব্লকের মতো হাসিনা সরকারকেও বিড়ম্বনায় ফেলেছে। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘‘ভারত-পাক সীমান্তে এই ঘটনা ঘটলে পাক রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হত। এ ক্ষেত্রে কিন্তু তেমন কিছু হয়নি।’’ সূত্রের বক্তব্য, অস্বস্তি এড়াতেই এই ধরনের নীরবতা। তবে নেপথ্যে নিশ্চয়ই কথা চলছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘‘এমন একটি ঘটনার কথা শুনেছি। বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’’