সকাল ১০টায় পৌঁছেছিলেন সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে সিবিআইয়ের দফতরে। গাড়ি থেকে নেমে কোনও দিকে না তাকিয়ে সোজা সিবিআইয়ের ইওডব্লিউ-৪ এর দফতরে ঢোকেন তিনি। চোখে মুখে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের ছাপ ছিল।গোটা দিন দিন কাটিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ সিবিআই দফতরের ওই গেট দিয়েই বেরোলেন রাজ্য পুলিশের দাপুটে আইপিএস অফিসার অর্ণব ঘোষ। চোখে মুখে সকালের আত্মবিশ্বাসের বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই!

এর আগে তিন তিন বার সিবিআইয়ের পাঠানো সমন উপেক্ষা করে জেরা এড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শীর্ষ আদালত সিবিআইকে পুলিশ কর্তাদের জেরার ক্ষেত্রে আইনানুগ পদক্ষেপ করার অনুমতি দেওয়ার পর, ‘বস’ রাজীব কুমারের কোণঠাসা অবস্থা দেখে আর জেরা এড়ানোর চেষ্টা করেননি অর্ণব। মঙ্গলবার বিকালে তাঁকে তলব করে নোটিস পাঠানোর পর বুধবার সকালেই হাজির হন তিনি।

দুঁদে পুলিশ কর্তা অর্ণব ঘোষের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতিই সেরে রেখেছিলেন সিবিআই আধিকারিকরাও। সিবিআইয়ের দুই এসপি এবং তদন্তকারী আধিকারিক তথাগত বর্ধনের নেতৃত্বে সিবিআই আধিকারিকরা তৈরি ছিলেন লম্বা চওড়া প্রশ্নমালা নিয়ে।

আরও পড়ুন: ঘরছাড়া তৃণমূল কর্মীরা, অভিযোগ তুলে নৈহাটি পুরসভার সামনে ধর্নায় বসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা​

সিবিআই সূত্রে খবর, রাজীব কুমারের মতো অর্ণবের জেরার ক্ষেত্রেও তদন্তকারীদের মূল ফোকাস ছিল রাজ্য সরকার গঠিত চিট ফান্ড তদন্তের বিশেষ তদন্তকারী দল(সিট)। কারণ ২০১৩ সালে যখন সারদা-কাণ্ড প্রকাশ্যে আসে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের তৎকালীনগোয়েন্দা প্রধান অর্ণব ঘোষ। কমিশনার তখন রাজীব কুমার। অর্ণবের তৈরি করা গোয়েন্দাদের বিশেষ দলই কাশ্মীরের সোনমার্গ থেকে গ্রেফতার করে আনে সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন এবং সারদার সেকন্ড ইন কমান্ড দেবযানী মুখোপাধ্যায়কে। তাঁর তদারকিতেই গোয়েন্দারা সারদার বিভিন্ন অফিসে তল্লাশি চালান, বাজেয়াপ্ত করেন বিভিন্ন নথি।  এর পর রাজ্য সরকার সিট গঠন করলে, সেখানেও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান তিনি।

সিবিআই সূত্রে খবর, সেই কারণেই প্রথম থেকে সিটকে কেন্দ্র করে একের পর এক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় রাজীব ঘনিষ্ঠ ওই পুলিশ কর্তাকে। সিট কী ভাবে কাজ করতবা সিটের কাজকর্মের তদারকি কে করতেন— এসব প্রশ্ন যেমন ছিল, তেমনই সিটের তদন্তে তাঁর ভূমিকা কী ছিল তা নিয়েও একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় অর্ণবকে।

সিবিআই সূত্রে খবর, কয়েক বছর ডেপুটেশনে সিবিআইতে কাজ করে যাওয়া অর্ণব প্রথম দিকে বেশ প্রস্তুত ছিলেন। প্রথম থেকেই তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে সিটে-র একজন সামান্য আধিকারিক ছিলেন তিনি। তাঁর উপরে থাকা পদস্থ কর্তাদের নির্দেশ পালন করা ছাড়া তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না। আর সেখান থেকেই উঠে আসে রাজীব কুমারের প্রশ্ন। সূত্রের খবর, প্রথম দিকে মুখ না খুললেও তিনি ধীরে ধীরে মেনে নেন যে রাজীব কুমার সিটের তদন্তের প্রতিদিনকার কাজের তদারকি করতেন। এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিতেন।

আরও পড়ুন: অনুব্রতর গড়ে থাবা! বিজেপিতে যোগ দিলেন লাভপুরের তৃণমূল বিধায়ক মণিরুল ইসলাম​

সূত্রের খবর, সিট-এর তদন্ত প্রসঙ্গেই আসে সিবিআইয়ের তথ্য বিকৃতি এবং তথ্য লোপাটের অভিযোগ। সারদার এক কর্মীর দেওয়া বয়ান সামনে রেখে প্রশ্ন আসে, সিট ঠিক কী কী বাজেয়াপ্ত করেছিল সারদার মিডল্যান্ড পার্কের অফিস থেকে? প্রশ্ন করা হয়, গ্রেফতার হওয়ার পরও কেন অভিযুক্ত দেবযানী মুখোপাধ্যায়কে তাঁর ল্যাপটপ ফেরত দেওয়া হয়েছিল? বাজেয়াপ্ত জিনিসের তালিকা প্রসঙ্গেই উঠে আসে পেন ড্রাইভ এবং লাল ডায়েরির কথা। তথ্য প্রমাণ সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে অর্ণব কী বলেছেন তা নিয়ে মুখে কুলুপ সিবিআইয়ের তদন্তকারীদের।

তবে তাঁদের একটাই ইঙ্গিত, অর্ণবের জেরা এবং বয়ান রেকর্ড গোটা তদন্তকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। বেশ কিছু মিসিং লিঙ্কের হদিশ পাওয়া গিয়েছে যা এর আগে শিলংয়ে রাজীব কুমার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। প্রশ্ন ওঠে, সারদার মালিকানাধীন একটি টিভি চ্যানেলের কর্মীদের অর্থ সাহায্য দেয় রাজ্য সরকার। সেই সময় সিটের তরফে কোনও রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল কি না? হয়ে থাকলে সেই রিপোর্টে কী ছিল?

অর্ণবের ম্যারাথন জেরার পর সিবিআই আধিকারিকদের মুখে ‘সন্তোষজনক’ মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই। রাজ্যের আইপিএস মহলের বড় অংশ যাঁরা এ দিন বার বার সিজিও কমপ্লেক্সের ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর রেখেছেন, তাঁদের ধারণা অর্ণবের বয়ান রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে বড় হাতিয়ার হতে চলেছে সিবিআইয়ের।