যেমন-তেমন অভিযোগ নয়। পশ্চিমবঙ্গে ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের ঘাঁটি তৈরির পাশাপাশি রাজ্যে একাধিক নাশকতার ছক। আটঘাট বেঁধে তাই তৈরি জাতীয় তদন্তকারী সংস্থাও (এনআইএ)। সূত্রের খবর, হুগলির এক পলিটেকনিক ছাত্রের বিরুদ্ধে এমনই সব গুরুতর অভিযোগ এনে চার্জশিট দেওয়ার কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছেন গোয়েন্দারা। অভিযুক্ত ছাত্রের নাম আশিক আহমেদ। বাড়ি হুগলির ধনেখালিতে।

বর্ধমানের কাঁকসার একটি বেসরকারি পলিটেকনিক কলেজের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র আশিক এখন তিহাড় জেলে বন্দি। গত ১৭ মার্চ তাকে গ্রেফতার করা হয়। সূত্রের খবর, তার আগে আশিককে টানা ২৩ দিন জেরা করেছিল এনআইএ।

গোয়েন্দাদের দাবি, হুগলির এক রাজনৈতিক নেত্রীকে খুনের পাশাপাশি বর্ধমান-হুগলির বেশ কিছু তল্লাটে আইএস যে বিস্ফোরণের ছক কষেছিল, আগাগোড়াই তাতে সামিল ছিল আশিক।

কিন্তু কী ভাবে? গোয়েন্দারা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় মগজধোলাইয়ের পরিণতি যে কী হতে পারে, তার একটা বড় উদাহরণ এই আশিক আহমেদ।

রবিবার এনআইএ-র এক কর্তা দিল্লি থেকে টেলিফোনে বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত ঠিক আছে, জুলাই মাসে আশিক আহমেদের বিরুদ্ধে আমরা চার্জশিট পেশ করব।’’ তিনি জানান, বছর উনিশের ওই তরুণকে বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনে (ইউএপিএ) কোনও জঙ্গি সংগঠনকে সাহায্য করা, তাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা এবং সেই সংগঠনের সদস্য হিসেবে কাজ করার জন্য অভিযুক্ত করা হবে। ইউএপিএতে চার্জশিট দেওয়ার ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থা ১৮০ দিন সময় পেয়ে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মাস দুয়েক আগেই চার্জশিট দিতে চলেছে এনআইএ। আশিকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগও আনতে চলেছেন গোয়েন্দারা।

তবে এনআইএ-র একটি সূত্রের খবর, আশিক এখন নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত। জেরায় সে কার্যত কিছুই গোপন করেনি বলেও জানা গিয়েছে। তাই আশিককে আইএসের ভারতীয় শাখা সংগঠনের বিরুদ্ধে রুজু হওয়া ওই মামলায় রাজসাক্ষীও করা হতে পারে।

এক তদন্তকারী অফিসারের কথায়, ‘‘আশিক শেষ পর্যন্ত কিছু করে উঠতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বসেই সে এ রাজ্যে নাশকতার ছক কষেছিল। এ ব্যাপারে আশিক নিয়মিত শলা পরামর্শ করেছিল এ দেশে আইএসের চাঁই হিসেবে চিহ্নিত যুবকদের সঙ্গে।’’ ওই অফিসারের দাবি, আশিকের বিরুদ্ধে যাবতীয় প্রমাণ এখন এনআইএ-র হাতে। তাই চার্জশিট পেশেও কোনও বাধা নেই।

জুলাই মাসে এনআইএ ওই নথি দিল্লির পাটিয়ালা হাউসে তাদের বিশেষ আদালতে পেশ করলে, সেটিই হবে প্রথম কোনও বাঙালির বিরুদ্ধে এই রাজ্যে আইএসের হয়ে কাজের অভিযোগে প্রথম চার্জশিট।

তবে আইএস-সংস্রবে প্রথম যে বাঙালির বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করা হয়, তার নাম মেহদি মসরুর বিশ্বাস। বাড়ি কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে কৈখালিতে। কিন্তু যে সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়, তখন সে বেঙ্গালুরুতে কর্মরত ছিল। মেহদি ওখানে বসেই আইএসের সব চেয়ে জনপ্রিয় টুইটার হ্যান্ডেল তৈরি করেছিল এবং চালাত বলে গত বছর জুনে চার্জশিট দেয় বেঙ্গালুরু পুলিশ। এ রাজ্যে যদিও তার সেই ধরনের কোনও কাজের প্রমাণ মেলেনি। 

আর আশিক? হুগলির এই ছাত্রটিকে ভারতে আইএসের শাখা সংগঠন হিসেবে পরিচিত জানুদ অল খলিফা-এ-হিন্দ (ভারতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার যোদ্ধারা)-এর অন্যতম সদস্য বলেই মনে করেন তদন্তকারীরা। কর্নাটকের ভটকলের বাসিন্দা মহম্মদ শফি আরমার ওই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা। এপ্রিলের শেষে একটি সূত্রে খবর আসে, সিরিয়ায় মার্কিন ড্রোন হানায় শফি আরমার নিহত হয়েছে। এনআইএ যদিও সেই খবরের ভিত্তি খুঁজে পায়নি।

গোয়েন্দারা জানান, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই শফির সঙ্গে আশিকের যোগাযোগ ছিল। তবে মোবাইলে আশিকের সরাসরি যোগাযোগ ছিল আইএসের ভারতীয় শাখা সংগঠনের প্রধান, মুম্বইয়ের মুদাব্বির মুস্তাক শেখ ও সংগঠনের অর্থনৈতিক প্রধান, কর্নাটকের মহম্মদ নাফিস খানের সঙ্গে। এমনকী, নাফিস কাঁকসায় এসে আশিকের মেস-এ এক রাত কাটিয়েও গিয়েছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের।

গত ২২ ও ২৩ জানুয়ারি ভারতের ছ’টি শহরের ১২টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে আইএসের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ২২ জনকে গ্রেফতার করে এনআইএ। তাদের মধ্যে মুদাব্বির ও নাফিসও ছিল। ওই দু’জনের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া নথি ঘেঁটেই আশিকের নাম পাওয়া যায়। এ বার চার্জশিট পেশের পালা।