• কিংশুক গুপ্ত
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

উন্নয়ন হয়েছে। তবে রয়েছে আরও দাবি, না-পাওয়ার ক্ষোভও।

‘খুনিদের শ্রীবৃদ্ধি’, ক্ষুব্ধ স্বজনহারারা

Shalku Soren's mother Chhitamoni
নিহত শালকু সরেনের মা ছিতামণি। ছবি: দেবরাজ ঘোষ

ছেলের ছবি বুকে আঁকড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন পূর্ণিমা মানা। এগারোটা বছর কেটে গিয়েছে। তবু দিনটা ভুলতে পারেন না।

২০০৯ সালের জুন মাস। পূর্ণিমার ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ধীরাজ মানার তখন ১৬ বছর বয়স। তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল মাওবাদীরা। লালগড়ের ধরমপুর পঞ্চায়েতের কৃষ্ণনগর গ্রামের ধীরাজ আজও নিখোঁজ। ধীরাজের মতোই পুলিশের খাতায় নিখোঁজ কৃষ্ণনগর ও কদমডিহা গ্রামের আরও ছ’জন। তাঁরা সকলেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সিপিএমের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ধীরাজ ছিল নেহাতই স্কুলছাত্র।

পূর্ণিমা জানালেন, জনসাধারণের কমিটির মিছিলে না হাঁটাতেই ধীরাজকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল মাওবাদীরা। পূর্ণিমার বাড়ির সামনে সরু রাস্তা পাকা হয়েছে। কিন্তু অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া মাটির বাড়িতে হাঁ করা অভাব। পূর্ণিমার স্বামী জগবন্ধু পেশায় নাপিত। ছেলে নিখোঁজ থাকায় ক্ষতিপূরণ মেলেনি। পাননি আবাস যোজনার বাড়ি। ধীরাজের ভাই শিবরাজ এখন যুবক। চোখেমুখে ক্ষোভ। বললেন, ‘‘যারা খুন-সন্ত্রাস করল, তারা চাকরি, সরকারি পদ পেল। আর আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।’’ 

মাওবাদী হানায় নিহত সুবোধ মণ্ডলের মা মাধুরী মণ্ডল আবাস যোজনার বাড়ি পাননি। থাকেন কুঁড়ে ঘরে। লালগড়ের গোহমি গ্রামে। নিজস্ব চিত্র

আরও পড়ুন: করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ, তবুও স্বস্তি দিচ্ছে সংক্রমণের হার​

ওই এলাকারই অপহৃত অবসরপ্রাপ্ত গ্রন্থাগার কর্মী কেশব মানা, দিনমজুর সঞ্জয় মাহাতোর মতো অনেকেরই দেহ মেলেনি। মৃত্যুর শংসাপত্র না থাকায় পরিবারগুলি ক্ষতিপূরণও পায়নি। কেশবের স্ত্রী শান্তি, সঞ্জয়ের স্ত্রী সবিতা এখনও শাঁখা-সিঁদুর পরেন। শান্তি বলছিলেন, ‘‘স্বামী জীবিত না মৃত, বেঁচে থাকতে বোধহয় জানতে পারব না!’’ কদমডিহায় মাওবাদীদের হাতে খুন হওয়া দীনবন্ধু সরেনের স্ত্রী সলমা অবশ্য ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। সংসার চালাতে দিনমজুরিও করেন। সলমার ক্ষোভ, ‘‘সাড়ে চার লাখ টাকা ক্ষতিপূরণে তো সারা জীবন চলবে না। ছত্রধরের ছেলেরা চাকরি পেলে আমার ছেলে পাবে না কেন?’’ 

গত এক দশকে জঙ্গলমহল বদলেছে অনেকটাই। সে দিনের জনসাধারণের কমিটির নেতা ছত্রধর মাহাতো এখন তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক। তাঁর স্ত্রী নিয়তি রাজ্য সমাজকল্যাণ পর্ষদের সদস্য। দুই ছেলে চাকরি পেয়েছেন। আমলিয়া গ্রামের মুখে পিচ রাস্তার কাছে নতুন পাকা বাড়ি হয়েছে ছত্রধরের। কমিটির নেতা-কর্মীদের আরও অনেকেই তৃণমূলের নেতা বা সক্রিয় কর্মী। আর মাওবাদী কার্যকলাপে যুক্তরা কেউ হোমগার্ড, কেউ সিভিক ভলান্টিয়ার।

তৃণমূলের রাজনীতিতে ছত্রধরের আগমনে বিরোধীরা গোড়া থেকেই সরব। সিপিএমের ঝাড়গ্রাম জেলা সম্পাদক পুলিনবিহারী বাস্কে, বিজেপি-র জেলা সভাপতি সুখময় শতপথীদের দাবি, মাওবাদীদের ‘মুখ’ ছত্রধরকে বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূলের ‘মুখ’ করে এলাকা অশান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। ক্ষোভ রয়েছে তৃণমূলের অন্দরেও। লালগড় ব্লক তৃণমূলের এক নেতা বলছেন, ‘‘ছত্রধরকে দলের মুখ করে বিপর্যয়ই ডাকা হচ্ছে। মানুষ ভয়ে হয়তো সামনে কিছু বলছেন না। কিন্তু ক্ষোভের আঁচ টের পাচ্ছি।’’

স্বজনহারাদের যন্ত্রণা-বঞ্চনা লালগড় জুড়েই। ২০১০ সালে পুলিশের চর সন্দেহে মাওবাদীদের গুলিতে নিহত হন গোহমি গ্রামের সুবোধ মণ্ডল। কুঁড়েঘরের দাওয়ায় বসে বৃদ্ধা মাধুরী মণ্ডল জানালেন, ছেলের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের পুরো টাকাটাই তাঁর পায়ের হাড় ভাঙার চিকিৎসায় খরচ হয়ে গিয়েছে। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘বার্ধক্যভাতা, সরকারি বাড়ি কিছুই তো পেলাম না।’’ ছত্রধরের বিরুদ্ধে শালবনি গ্রামের সিপিএম কর্মী প্রবীর মাহাতোর খুনের ঘটনার পুনর্তদন্ত করছে এনআইএ। প্রবীরের মা সাবিত্রীও বলছেন, ‘‘এলাকার সবাই জানেন দশ বছর আগে কারা মাওবাদী আর কারা কমিটির লোক ছিল।’’

ছত্রধরের নতুন বাড়ি। লালগড়ের আমলিয়া গ্রামের লাগোয়া পাথরডাঙায়। নিজস্ব চিত্র

আরও পড়ুন: করোনার ওষুধ না আসা পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা: মোদী​

আর এক ছেলেহারা মা কাঁকড়াদাঁড়া গ্রামের ছিতামণি সরেন। ২০০৯ সালে তাঁর ছেলে সিপিএম কর্মী শালকু সরেনকে ধরমপুর পার্টি অফিসের সামনে খুন করেছিল মাওবাদীরা। পরদিনই ছিতামণিকে হাঁটানো হয়েছিল মিছিলে। কাঁকড়াদাঁড়া গ্রামের ২২টি আদিবাসী পরিবারের মধ্যে মাত্র তিনটি তৃণমূল সমর্থক পরিবার সরকারি প্রকল্পে বাড়ির বরাদ্দ পেয়েছে। ছিতামণি পাননি। ছেলের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণটাও পুরো পাননি। তবে বার্ধক্যভাতা পান। ওই গ্রামের আম-বাসিন্দা অনাদি মাহাতোর ক্ষোভ, ‘‘এক সময়ে যিনি মাওবাদীদের মুখপাত্র ছিলেন, তিনি এখন তৃণমূলের নেতা। এই পরিবর্তন আশা করিনি।’’
ছত্রধরের গ্রাম আমলিয়ার দুধ বিক্রেতা সন্তোষ গিরিকেও খুন করে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সন্তোষের ছেলে মঙ্গলও দুধ বেচেন। সন্তোষের স্ত্রী ভক্তিও বলছেন, ‘‘ছত্রধরেরা তো সব পেয়ে গেলেন। তাহলে আমার ছেলেরই বা কেন চাকরি হবে না?’’ এগিয়ে এলেন পাড়ার এক তরুণী। কঠিনমুখে বললেন, ‘‘ছত্রধরের ভাই ছিলেন মাওবাদী নেতা। ওঁদের বিরুদ্ধে মানুষের অনেক ক্ষোভ। কিন্তু ভয়ে কেউ কিছু বলেন না।’’ 
ছত্রধরের অবশ্য দাবি, ‘‘বাম আমলে সিপিএমের হার্মাদেরাই খুন-সন্ত্রাস করেছিল। স্বজনহারাদের পাশে আমি আছি। তাঁদের সমস্যা মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনব।’’ 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন