এনআরএসে চিকিৎসক-নিগ্রহের প্রায় ৬০ ঘণ্টা পরে মুখ খুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুরে এসএসকেএম হাসপাতালে গিয়ে তিনি যা বললেন, তাতে রাজ্য জুড়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্কট কাটার বদলে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠল। আন্দোলনকারীদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে কথা বলেছেন, তা ‘হুমকি এবং দুর্ব্যবহারের’ শামিল। ফলে কর্মবিরতি চালিয়ে যেতে তাঁরা অনড়। জুনিয়র ডাক্তারদের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রী প্রকারান্তরে তাঁদের ‘শাসিয়েছেন’ বলে মনে করছেন প্রবীণ আমলারাও। 

এসএসকেএম পর্বের পরে রাতে এবিপি আনন্দে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও জুনিয়র ডাক্তারেরা কর্মবিরতি না-তুললে প্রশাসনিক পদক্ষেপ করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘চিকিৎসকদের কাজ না-করার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে। তাঁরা এটা করতে পারেন না। আমার আবেদন, ওঁরা আন্দোলন তুলে নিন।’’ 

মুখ্যমন্ত্রীর এহেন ভূমিকায় রাজ্যের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের বড় অংশ ক্ষুব্ধ এবং প্রশাসনের উপরে বীতশ্রদ্ধ। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদে কামারহাটির সাগর দত্ত হাসপাতালের ১৫ জনের বেশি চিকিৎসক ইস্তফা 

দিয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রের খবর। সিউড়ি সদর হাসপাতালের ৬৭ জন চিকিৎসকও গণইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। অন্য দিকে, এনআরএসের সঙ্কট সামাল দিতে না-পারার দায়ভার কাঁধে নিয়ে এ দিনই সন্ধ্যায় ইস্তফা দিয়েছেন অধ্যক্ষ শৈবাল মুখোপাধ্যায় ও সুপার সৌরভ চট্টোপাধ্যায়। 

এ দিন বেলা ১২টা নাগাদ এসএসকেএমে আসেন মুখ্যমন্ত্রী। জরুরি বিভাগের সামনে হ্যান্ডমাইক হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘চার দিন ধরে রোগী পড়ে আছে। কয়েক জন মিলে তাণ্ডব চালাচ্ছে। আমার মন্ত্রী গিয়েছেন, পুলিশ কমিশনার গিয়েছেন। কথা বলার পরেও চিকিৎসা হচ্ছে না। এর থেকে দুর্ভাগ্য কিছু হতে পারে না। যাঁরা নাটক করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেব। যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁরা কেউ জুনিয়র ডাক্তার নন। তাঁরা ‘আউটসাইডার’। বিজেপি-সিপিএম উস্কানি দিচ্ছে। শুধু হিন্দু-মুসলমান করা হচ্ছে। যাঁরা কাজ করছেন না, তাঁরা হস্টেলে থাকবেন না। চার ঘণ্টার মধ্যে যাঁরা কাজে যোগ দেবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেব। জনগণকে পরিষেবা দিতে হবে। ২৫ লাখ টাকা দিয়ে পড়াব, তার পরে বন্ড দিয়ে পালিয়ে যাবে?’’ 

টিভিতে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুনে উত্তেজনা ছড়ায় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এনআরএসে। সেখানকার জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতিক্রিয়া, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেছেন। আমরা মনে করছি, আমরা ডাক্তারির কিছুই করতে পারি না। মেডিক্যাল কাউন্সিলে গিয়ে আমাদের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে আসব।’’ 

মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের আঁচ পড়ে আরজি কর, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও। পাশাপাশি প্রবীণ চিকিৎসকদের অনেকে বলেন,  জুনিয়র ডাক্তারদের বহিরাগত অাখ্যা দিয়ে, তাঁদের হস্টেল ছেড়ে চলে যেতে বলে, তাঁদের রাজনৈতিক দলের কর্মী তকমা দিয়ে, এনআরএসে জুনিয়র ডাক্তারদের মার খাওয়ার ঘটনায় সাম্প্রদায়িকতার ছাপ দেগে দিয়ে ঠিক করেননি মুখ্যমন্ত্রী। 

এবিপি আনন্দে মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা বক্তব্য, এনআরএসে ঘটনার পরের দিনই সকালে তিনি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর ফোনে কথা বলতে চেয়েছিলেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। কিন্তু তাঁরা কথা বলেননি। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, ‘‘এটা অপমানজনক।’’

এসএসকেএমে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদে এ দিন দুপুর ২টো নাগাদ আরজি কর হাসপাতালে প্রবীণ চিকিৎসকেরা মিছিল করেন। ন্যাশনাল ও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ব্যানার, পোস্টার নিয়ে বিক্ষোভ হয়। সন্ধ্যায় সাগর দত্ত হাসপাতালে বিভাগীয় প্রধানদের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন শিশু বিভাগ, মেডিসিন

এবং আইসিইউ-এর ১৫ জনের বেশি চিকিৎসক। তবে প্রিন্সিপাল হাসি দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, তিনি কোনও পদত্যাগপত্র পাননি। সিউড়ি হাসপাতালের সুপার শোভন দে-ও জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের একটি বৈঠক হয়েছে বলে শুনলেও কোনও পদত্যাগপত্র তাঁর হাতে আসেনি। 

এসএসকেএমের আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের অনেকেই এ দিন জানান, মুখ্যমন্ত্রী হুমকি না-দিয়ে যদি নিরাপত্তার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিতেন, তা হলেই তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে কাজে যোগ দিতেন। তাঁদের মতে, হাসপাতালের মেন গেট, বিভিন্ন ওয়ার্ড-সহ যে সব জায়গায় জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে সরাসরি রোগী বা তাঁর পরিবারের লোকজনের দেখা হয়, সেই সব জায়গায় নিরাপত্তা বাড়ানোর আশ্বাস দিতে পারতেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি তা দিলেনই না, উল্টে গুন্ডা দেখিয়ে ভয় পাইয়ে দিলেন। এক জুনিয়র ডাক্তারের কথায়, ‘‘আমাদের হুঁশিয়ারি দেওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘লোক ডাকলে সব পালিয়ে যাবে’। এর পরেই বেশ কিছু বহিরাগত জরুরি বিভাগের সামনে চলে আসে।’’ এ দিন দুপুরে এসএসকেএমের জরুরি বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিতিতেই ভবানীপুর এলাকার বেশ কিছু যুবক অবস্থানকারীদের সামনে জড়ো হয়েছেন। 

তবে এসএসকেএম ঘুরে আসার ঘণ্টা আড়াই পরে প্রবীণ চিকিৎসক এবং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক প্রফেসরদের একটি চিঠি লেখেন মুখ্যমন্ত্রী। তাতে সব রোগীর চিকিৎসার দিকে নজর দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রবীণ চিকিৎসক এবং প্রফেসর চিকিৎসকরা হাসপাতালগুলি সক্রিয় রাখতে যথাযথ দায়িত্বপালন করলে তিনি কৃতজ্ঞ থাকবেন। 

তবে সেই অনুরোধের বিশেষ প্রভাব গোটা রাজ্যে পড়েনি। রাজ্যের ১৩টি মেডিক্যাল কলেজের সব ক’টিতেই বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত কর্মবিরতি বহাল। এ দিনই রাজ্যের স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ডিরেক্টর, প্রিন্সিপাল ও সুপারকে পাঠানো নির্দেশনামায় অবিলম্বে আউটডোর এবং জরুরি বিভাগে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালু করতে বলেছেন। সেই কাজে কেউ বাধা দিলে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। 

কিন্তু এ দিনই উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজের সুপার রাজ্যের ডিরেক্টর অব মেডিক্যাল এডুকেশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, ইন্টার্ন, হাউস স্টাফ এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিরা কর্মবিরতি করায় আগামী ২৪ ঘণ্টার বেশি আউটডোর এবং জরুরি পরিষেবা চালু রাখা সম্ভব নয়। তবে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালে এ দিন সন্ধ্যায় অবস্থান বিক্ষোভ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। আর বর্ধমান মেডিক্যালে আন্দোলনকারীরা এ দিন রাতে অবস্থান তুলে নিলেও শুক্রবার সকাল দশটা থেকে ফের ধর্নায় বসবেন বলে জানিয়েছেন।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।