• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

জেরার জন্য ডাক পড়তে পারে শুনে বললেন, বেড়িয়ে আসব

2

সারদা-কাণ্ডে জড়িয়ে ইতিমধ্যেই হাজতে যেতে হয়েছে তৃণমূলের দুই সাংসদ কুণাল ঘোষ, সৃঞ্জয় বসুকে। জেলে রয়েছেন মন্ত্রী মদন মিত্র। তৃণমূলের আর এক সাংসদ এবং দলের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়কে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিবিআই। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আর এক অর্থলগ্নি সংস্থা রোজ ভ্যালি নিয়ে সিবিআই তদন্ত শুরু হতেই এ বার জড়িয়ে গেল তৃণমূলের অভিনেতা-সাংসদ তাপস পালের নাম। বুধবার সকালে আচমকাই তাঁর দক্ষিণ কলকাতার ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালাল সিবিআই। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার তল্লাশিতে বেশ কিছু নথিপত্র মিলেছে বলে সংস্থা সূত্রের দাবি।

এ দিন সকাল ১০টা নাগাদ দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জের গল্ফ ক্লাব রোডের এক বিলাসবহুল আবাসনে হাজির হন সিবিআইয়ের সাত জন অফিসার। তাঁদের মধ্যে এক মহিলা অফিসারও ছিলেন। এই আবাসনেই সপরিবার থাকেন তাপস পাল। সিবিআই অফিসারেরা জানতে পারেন, আবাসনে তাপসের তিনটি ফ্ল্যাট আছে। ওয়ান-জে, ওয়ান-এইচ এবং ফোর-জি। এর মধ্যে একটিতে তিনি থাকেন, একটি তালাবন্ধ থাকে। তৃতীয় ফ্ল্যাটটি অফিস হিসাবে ব্যবহার করেন তাপস। সিবিআই অফিসারেরা যখন পৌঁছন, তখন কোনও ফ্ল্যাটেই তাপসের পরিবারের কেউ ছিলেন না। তাপস নিজে ছিলেন দিল্লিতে। তদন্তকারীরা আবাসনের নিরাপত্তারক্ষীকে ওই সাংসদের বিষয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু তিনি বিশেষ কিছু জানাতে পারেননি।

সিবিআই অফিসারেরা বেশ কিছু ক্ষণ অপেক্ষা করার করার পর খবর পেয়ে চলে আসেন তাপসের স্ত্রী নন্দিনী। তার পরেই শুরু হয় তল্লাশি। দরজা বন্ধ করে নন্দিনীদেবীর সামনেই দু’টি ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালান তদন্তকারী অফিসারেরা। তাপসের পরিচারক এবং গাড়িচালককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে চাবি না-মেলায় বন্ধ ফ্ল্যাটটিতে তল্লাশি চালানো যায়নি। সিবিআই সূত্রের খবর, তাপসের দু’টি ফ্ল্যাট থেকে প্রচুর নথি ছাড়াও কিছু জ্বালিয়ে দেওয়া কাগজপত্র, সিডি এবং পেন ড্রাইভ মিলেছে। প্রায় চার ঘণ্টা তল্লাশি চালিয়ে দুপুর ১ টা ৫০-এ আবাসন ছাড়েন অফিসাররা।

ফ্ল্যাটে তল্লাশির খবর পেয়ে এ দিন সন্ধ্যাতেই দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরেন তাপস। রাত আটটা নাগাদ বাড়ি ঢোকেন তিনি। দিল্লি ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের বলেন, “আমার স্ত্রী নন্দিনী রোজ ভ্যালির ‘ব্যঞ্জনবর্ণ’ নামে একটি অনুষ্ঠান করত। এটা কোনও বড় ব্যাপার নয়। যাঁরা রোজ ভ্যালির কোনও অনুষ্ঠান করেছেন, তাঁদের সবাইকে সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করছে।” কলকাতায় নেমে বিমানবন্দরে তাপস বলেন, “আমি ছিলাম না, জানি না কী হয়েছে।” সিবিআই কি অন্যায় করেছে? আপনি কি জেরার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত? তাপসের জবাব, “যার যা কাজ, সে তা করেছে। যে আমাকে যখন ডাকবে, তখনই আমি সেখানে বেড়িয়ে আসব।” সিবিআই সূত্রের খবর, তদন্তের স্বার্থে সাংসদকে জেরা করা হতে পারে।

তাপসের বাড়িতে কেন হানা দিল সিবিআই?

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সূত্রের খবর, রোজ ভ্যালি অর্থলগ্নি সংস্থার অন্যতম ডিরেক্টর ছিলেন তৃণমূলের এই সাংসদ। তিনি যে রোজ ভ্যালির ফিল্ম ডিভিশনের ডিরেক্টর ছিলেন, সিবিআই-কে তা আগেই জানিয়েছিলেন সংস্থার মালিক গৌতম কুণ্ডু। বাংলা ফিল্মের ব্যবসায় মোটা টাকা ঢেলেছিল রোজ ভ্যালি। তাদের প্রয়োজিত ছবিতে অভিনেতা নির্বাচন থেকে ফিল্মের খুঁটিনাটি বিষয়ে দেখাশোনা করতেন তাপস, দাবি সিবিআইয়ের এক কর্তার। তিনি জানাচ্ছেন, ডিরেক্টর হিসেবে প্রতি মাসে তাপসকে ১ লক্ষ টাকাভাতা চেক মারফৎ দিত রোজ ভ্যালি। এর বাইরে প্রতি মাসে ভ্রমণ ভাতা (টিএ) বাবদ তিনি মোটা টাকা পেতেন। তা ছাড়া, বিভিন্ন সময়ে তৃণমূল সাংসদের বিমানের টিকিটও রোজ ভ্যালি কেটে দিয়েছে বলে সিবিআইয়ের হাতে নথি এসেছে। গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, কাগজে-কলমে তাপসের সঙ্গে রোজ ভ্যালির যে আর্থিক লেনদেনের হিসাব পাওয়া গিয়েছে, তার বাইরেও এই সংস্থা থেকে তিনি কোনও টাকা নিয়েছেন কি না, বা অন্য কাউকে অর্থ পাইয়ে দিয়েছেন কি না তা যাচাই করা হচ্ছে। সাংসদের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানোর কারণ এ সবই।

রোজ ভ্যালিতে ডিরেক্টর হিসাবে কী ভূমিকা ছিল তাপসের? প্রাথমিক তদন্তে সিবিআই জেনেছে, বাজার থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে সংস্থাটি কোনও সমস্যা পড়লে তাদের জন্য সাংসদ হিসাবে বিভিন্ন জায়গায় দরবার করতেন তাপস। তদন্তকারীদের দাবি, রোজ ভ্যালিকে অন্যায় ভাবে সুবিধা পাইয়ে দিতে বেশ কিছু সরকারি অফিসে চিঠিও লিখেছিলেন তিনি। এমন কিছু চিঠিপত্র তাদের হাতে এসেছে। সেই সব চিঠির সত্যতা যাচাই করতে এবং তাপস সেগুলি লিখে থাকলে কেন লিখেছিলেন তা জানতেই তাঁকে জেরা করতে চায় সিবিআই।

তাপস এ দিন রোজ ভ্যালির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সিবিআই সূত্রে দাবি, গৌতম কুণ্ডুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাপসের জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তা ছাড়া, এ ব্যাপারে বহু প্রমাণও তাদের হাতে এসেছে। সিবিআই গোয়েন্দারা জেনেছেন, রোজ ভ্যালির কর্ণধারের সঙ্গে তাপসের নিয়মিত বৈঠক হতো। বেশির ভাগ বৈঠকই হতো গভীর রাতে ভিআইপি রোডে সংস্থার সদর দফতরে।

তাপসের বাড়িতে সিবিআই তল্লাশির পরে তাঁর দল তৃণমূলের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। গত ১৪ জুন কৃষ্ণনগরে নিজের নির্বাচনী এলাকার একাধিক গ্রামে প্রকাশ্যে উস্কানিমূলক মন্তব্য করে দলকে বিড়ম্বনায় ফেলেছিলেন তাপস। সে দিন বিরোধীদের ঘরে দলের ছেলে ঢুকিয়ে রেপ করিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদ। সে যাত্রা তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলকে ক্ষমাপ্রার্থনার চিঠি দিয়েই রেহাই পেয়ে যান তাপস। মমতা বলেন, “আর কী করব, ওকে কি ফাঁসি দেব?”

সারদা-কাণ্ডে মদন মিত্রের পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। ছেঁটে ফেলেছেন কুণাল ঘোষ, মুকুল রায়কে। রোজ ভ্যালি-কাণ্ডে তাপসের কী গতি হয় সেটাই দেখার।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন