প্রায় আইসিসিইউ-এ যেতে বসেছিল রোগী। বছরখানেকের মধ্যে সেই রোগী এখন রীতিমতো দৌড়চ্ছে। 

২০১৭-১৮ সালে যে-সংস্থা মাসে মাত্র ১১ কোটি টাকার ব্যবসা করত, এখন তাদের মাসিক ব্যবসার পরিমাণ ৪৫ কোটি। আগে যেখানে সারা মাসে ৪০টি ওয়াগন তৈরি হত, এখন সেই ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা ব্রেথওয়েট মাসে গড়ে তৈরি করছে ১১০টি ওয়াগন।

অথচ বছর দেড়েক আগেও ব্যাঙ্কের কাছে ওই সংস্থার দেনা ছিল ২৬ কোটি টাকা। ভেন্ডারদের পাওনা ছিল ৫০ কোটি। মাথার উপরে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার দায় নিয়ে বছর দেড়েক আগে তলিয়ে যেতে বসেছিল ব্রেথওয়েট। ভেন্ডারেরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে রাজি ছিলেন না। প্রতি মাসে ব্যাঙ্কের ৩০ লক্ষ টাকার সুদ মেটাতে গিয়ে কর্মীদের বেতন দেওয়াই দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

সেই ব্রেথওয়েট বছরখানেকের মধ্যে এমন ভাবে ভাবমূর্তি বদলে ফেলেছে যে, সংস্থার অগ্রগতি খতিয়ে দেখে গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে ৫০ কোটি টাকার ইকুইটি শেয়ার কিনেছে রেল মন্ত্রক। সংস্থার প্রযুক্তিগত দক্ষতা খতিয়ে দেখে সারা দেশের সব রকম নতুন ওয়াগন (প্রোটোটাইপ হাব) তৈরির কারখানা হিসেবে ব্রেথওয়েটের সঙ্গে সমঝোতাপত্র (মৌ) সই করেছে রেলের গবেষণা সংস্থা আরডিএসও (রিসার্চ ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন)।

কী ভাবে সম্ভব হল প্রায় ডুবতে বসা সংস্থার আর্থিক পুনরুজ্জীবন?

ব্রেথওয়েট সূত্রের খবর, পরিচালন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আর কর্মীদের সমবেত প্রচেষ্টায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে সংস্থা। এক সময় ভেন্ডারদের পাওনা ঠিকমতো মেটাতে না-পারায় ওয়াগন তৈরির বিভিন্ন উপকরণ কখনওই একসঙ্গে পাওয়া যেত না। ফলে শুধু উপকরণের অভাবেই ব্যাহত হত ওয়াগন তৈরির কাজ। অনেক ক্ষেত্রে বরাত অনুযায়ী তৈরি জিনিস সময় মেনে সরবরাহ করতে বাইরে থেকেও কাজ করাতে হত। তাতে লাভের হার কমত। যন্ত্রাংশ সরবরাহের পরে তার বিল পেতে ভেন্ডারদের গড়ে ৩৩ দিন সময় লাগত। ফলে বাজারে সংস্থার নেতিবাচক ভাবমূর্তি প্রকট হয়ে পড়েছিল এবং উৎপাদনে তার প্রভাব পড়ছিল। সময়মতো সামগ্রী সরবরাহ করতে না-পারায় ব্রেথওয়েটের রেটিং প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছিল। খারাপ হয়ে পড়ছিল গার্ডেনরিচ এবং ভদ্রেশ্বরের কারখানার হালও।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০১৮-র জুনে সংস্থার চেয়ারম্যান তথা ম্যানেজিং ডিরেক্টর (সিএমডি)-র পদে প্রাক্তন আরডিএসও-কর্তা জ্যোতিষ কুমার যোগ দেওয়ার পরে। তিনি ব্যক্তিগত ভাবে সব ভেন্ডারের সঙ্গে কথা বলে ৩০ দিনের ‘ক্রেডিট পিরিয়ড’-এর ব্যবস্থা করেন। সব ইউনিয়নের নেতা তো বটেই, কর্মীদের সঙ্গেও বৈঠকে বসেন। সংস্থার তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস এবং বাম প্রভাবিত সব ইউনিয়নই কারখানা বাঁচাতে এগিয়ে আসে। যন্ত্রাংশের জোগান নিশ্চিত হতেই দ্রুত উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। সংস্থার সব রকম বিল মেটানোর সময়সীমা ৩৩ দিন থেকে তিন দিনে নেমে আসে। তাতে ভেন্ডারদের আস্থা ফেরার পাশাপাশি সংস্থায় নগদের জোগানও বাড়তে থাকে। চাকা ঘোরার প্রক্রিয়ার শুরু সেখান থেকেই। হিসেব সম্পূর্ণ হয়নি। তবে সদ্য শেষ হওয়া আর্থিক বছরে সংস্থার লাভ ১০ কোটি টাকা ছোঁবে বলে আশা করছেন কর্তারা।

ব্রেথওয়েটের তৃণমূল ইউনিয়নের নেতা ফারুক আজম, বিজেপি সমর্থিত ইউনিয়নের চন্দ্রকান্ত সিংহ এবং কংগ্রেসি ইউনিয়নের বিজয় রায় তাই এক সুরে বলছেন, ‘‘ভারত ওয়াগন বা বার্ন স্ট্যান্ডার্ডের পরিণতিই অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। পরিচালনার গুনে এখন আশার আলো দেখছি।’’

সিএমডি জানান, তাঁদের কাছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বরাত রয়েছে। চলতি অর্থবর্ষে মাসে ২০০টি ওয়াগন তৈরির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে চান তাঁরা। রেলের ওয়াগন মেরামতিরও বড় বরাত রয়েছে তাঁদের কাছে। পরের ধাপে গার্ডেনরিচ ও ভদ্রেশ্বরের কারখানায় বড় সেতুর গার্ডার নির্মাণ এবং ক্রেন তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে চান তাঁরা। ‘‘সংস্থার সামর্থ্য ছিলই। কর্মীদের সহায়তায় তার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হওয়াতেই সাফল্য মিলছে,’’ বলছেন সিএমডি।