বিক্ষোভ হয়েছিল ২৯ নভেম্বর। ৩০ তারিখই রাজ্য সরকারের ১৮ জন কর্মীর বদলির নির্দেশ জারি হয়ে যায়। সিপিএম নিয়ন্ত্রিত কর্মী সংগঠনের (কোঅর্ডিনেশন কমিটি) গোটা নেতৃত্বের উপরে ঠিক এ ভাবেই ভেঙে পড়ে নবান্নের রোষ। কিন্তু রক্তচক্ষুতেও যে কর্মীদের ক্ষোভ দমানো যায়নি, তার প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে। বদলি হওয়া কর্মীরা নতুন অফিসে সাদর অভ্যর্থনা পাচ্ছেন। আর কোঅর্ডিনেশনের সাধারণ সম্পাদককে এমন জায়গায় বদলি করা হয়েছে, যে তাঁকে নতুন অফিসে জয়েন করানোর লোকই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী রয়েছেন কোঅর্ডিনেশন কমিটির যুগ্ম সম্পাদক পদে। ডিএ-র দাবিতে ২৯ নভেম্বর নবান্নের ভিতরে-বাইরে কোঅর্ডিনেশনের বিক্ষোভ হওয়ার পরে ২৪ ঘণ্টাও কাটতে দেয়নি সরকার। ই-মেল মারফত বদলির নির্দেশ পৌঁছে যায় বিশ্বজিতের কাছে। ১ ও ২ ডিসেম্বর ছিল শনি ও রবিবার। তাই ৩ ডিসেম্বর অর্থাৎ সোমবারই দার্জিলিং গিয়ে নতুন অফিসের কাজে যোগ দিয়েছেন বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী।

আচমকা এমন একটা পরিস্থিতি তথা সরকারের তীব্র রোষানল— পরিস্থিতি কতটা প্রতিকূল? বিশ্বজিৎ বললেন, ‘‘প্রতিকূলতা নিয়ে একটুও চিন্তিত ছিলাম না। এই রকম ভাবে বদলির নির্দেশ বিরল ঠিকই। কিন্তু নির্দেশ যেমন পেয়েছি, সে রকম ভাবেই কাজ করব, তেমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে সময় লাগেনি। কিন্তু ট্রেনে রিজার্ভেশন পাইনি। কলকাতা থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দার্জিলিং পৌঁছেছি।’’ তবে দার্জিলিং পৌঁছনোর পরে পরিস্থিতিটা যেমন হবে বলে আশা করেছিলেন সমবায় দফতরের কর্মী বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী, তেমন কিছুর মুখোমুখি একেবারেই হতে হয়নি বলে তিনি জানাচ্ছেন। আচমকা দার্জিলিং গিয়ে কোথায় থাকবেন, কোথায় খাবেন, কিছুই জানা ছিল না। হোটেলে থাকবেন বলে স্থির করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বজিতের গায়ে আঁচ লাগতে দেয়নি নতুন অফিস। যতক্ষণ না নিজের থাকার জায়গা খুঁজে নিতে পারছেন, ততক্ষণ সহকর্মীদের বাড়িতেই জায়গা হয়ে গিয়েছে কোঅর্ডিনেশন নেতার। বিশ্বজিৎ বললেন, ‘‘এই অফিসে কাজে যোগ দিতে এসে এমন সাদর অভ্যর্থনা পাব, তা আগে বুঝতে পারিনি। প্রত্যেকে আন্তরিক ভাবে স্বাগত জানাচ্ছেন, কারণ সকলেই জানেন আমরা বদলি হয়েছি কর্মীদের স্বার্থে আন্দোলন করতে গিয়েই।’’ দার্জিলিঙে যে অফিসে আপাতত কাজ করছেন বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী, সেখানে সবাই কোঅর্ডিনেশন কমিটির সদস্য, এমনটা মোটেই নয়। অন্যান্য দলের কর্মী সংগঠনের লোকজনও রয়েছেন। কিন্তু ডিএ চেয়ে বিক্ষোভ দেখানোর জেরে যে ভাবে বদলির মুখে পড়তে হয়েছে ১৮ জনকে, অধিকাংশ সরকারি কর্মীই তা সমর্থন করতে পারছেন না।

আরও পড়ুন: রাজ্যে মহিলা ‘ফায়ার ফাইটার’ চান দমকল মন্ত্রী ফিরহাদ

কলকাতার খাদ্য ভবনে পোস্টিং ছিল কোঅর্ডিনেশন কমিটির সহ সম্পাদক মানস দাসের। পূর্ত দফতরের ইঞ্জিনিয়ার মানসকে রাতারাতি বদলি করে দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জে। আনন্দবাজারকে মানসবাবু বললেন, ‘‘এত তাড়াতাড়ি থাকার জায়গা খুঁজে নেওয়া তো মুশকিল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা বাড়ি ভাড়া নেব। তার আগে পর্যন্ত হোটেলই ভরসা।’’ তবে বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরীর মতোই মানস দাসও সব রকম সহযোগিতা পাচ্ছেন নতুন অফিসের সহকর্মীদের কাছ থেকে।

বিশ্বজিৎ বা মানসের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিজয়শঙ্কর সিংহের অভিজ্ঞতা কিন্তু মিলছে না। বিজয়বাবু কোঅর্ডিনেশন কমিটির শীর্ষ নেতা, তিনি সাধারণ সম্পাদক। তাঁর বদলিটা হয়েছে নেপাল সীমান্তের কাছে পুলবাজারে। বিজয়বাবু বললেন, ‘‘নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নামার পরে আরও ১০০ কিলোমিটার যেতে হয়। তবে গিয়ে আমার নতুন অফিসে পৌঁছনো যায়।’’ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই অফিসে চলে যেতে চাইছেন বিজয়। জানালেন নিজেই। কিন্তু এখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কারণ কী? কারণ রাজ্য সরকারের অপরিণামদর্শী নির্দেশ। বিজয়শঙ্কর সিংহ সচিবালয়ের কর্মী, তাঁকে সরাসরি কলকাতা থেকে পুলবাজার পাঠানো সম্ভব ছিল না। তাই তাঁকে উত্তরবঙ্গের সচিবালয় উত্তরকন্যায় কাজে যোগ দিতে বলা হয়। উত্তরকন্যা থেকে পুলবাজারে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু উত্তরকন্যায় যে ঘরে গিয়ে কাজে যোগ দেওয়ার কথা বিজয়শঙ্করের, সেই ঘরে আপাতত কারও পোস্টিং-ই নেই, ঘরটা তালাবন্ধই থাকে— জানাচ্ছে কোঅর্ডিনেশন কমিটি। তাই বিজয়শঙ্কর সিংহ সেখানে গিয়ে কার হাতে জয়েনিং লেটার দেবেন বা কাকে রিপোর্ট করবেন, কেউ জানেন না। অতএব বদলি করেও এখনও পর্যন্ত কোঅর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদককে দার্জিলিঙে পাঠাতে পারেনি প্রশাসন। এই সরকার কতটা অপ্রস্তুত এবং কতটা বেহিসেবি ভাবে চলে, বিজয়শঙ্কর সিংহের নতুন পোস্টিং নিয়ে তৈরি হওয়া এই জটিলতা থেকেই তা প্রমাণ হয়— বলছে কোঅর্ডিনেশন কমিটি।

আরও পড়ুন: আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আশঙ্কায় বিজেপির রথযাত্রার আবেদন খারিজ 

কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত কর্মী সংগঠন কনফেডারেশন এবং বিজেপি ঘনিষ্ঠ কর্মচারী পরিষদও কিন্তু বদলি হওয়া কর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ২৯ নভেম্বর যখন নবান্ন থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল ১৮ জনকে, তখন শুধু কোঅর্ডিনেশনের সদস্যরা নন, কনফেডারেশনের সদস্যরাও বিক্ষোভ দেখাতে জড়ো হয়েছিলেন শিবপুর থানার সামনে। ডিএ-র দাবিতে কনফেডারেশন এবং কর্মচারী পরিষদ অনেক দিন আইনি লড়াই লড়ছে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে। কোঅর্ডিনেশন কমিটি বিষয়টি নিয়ে মাঠে নামছে না কেন, তা নিয়ে ওই দুই সংগঠন প্রশ্নও তুলছিল। কোঅর্ডিনেশন অবশেষে মাঠে নামল। আর তা দমাতে সরকার বজ্রমুষ্টি প্রয়োগ করল। স্বাভাবিক কারণেই সরকারের এই অবস্থানের বিরোধিতা করছে কংগ্রেস এবং বিজেপির সংগঠন। কোঅর্ডিনেশন কমিটির নেতাদের পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছেন কনফেডারেশনের সুবীর সাহা বা কর্মচারী পরিষদের দেবাশিস শীলরা।

একমাত্র উল্টো সুর তৃণমূল নিয়ন্ত্রিত কর্মী সংগঠন ফেডারেশনের। সংগঠনের মেন্টর গ্রুপের আহ্বায়ক মনোজ চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন কোঅর্ডিনেশন কমিটি আমাদের উপরে কম অত্যাচার করেনি। তার নিরিখে ওঁদের সঙ্গে তো কিছুই ঘটেনি। সংরক্ষিত এলাকায় কেন বিক্ষোভ দেখালেন ওঁরা? আইন ভেঙেছেন। শাস্তি পেয়েছেন। আমরা আইন না ভেঙেও অনেক বার শাস্তির মুখে পড়েছি। কোঅর্ডিনেশনের নেতাদের নিয়ে এত চোখের জল ফেলার কিছু নেই।’’

(বাংলার রাজনীতি, বাংলার শিক্ষা, বাংলার অর্থনীতি, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার স্বাস্থ্য, বাংলার আবহাওয়া -পশ্চিমবঙ্গের সব টাটকা খবরআমাদের রাজ্য বিভাগে।)