লক্ষ্য ছিল, কেন্দ্রীয় সরকারের জমি বিলের বিরোধিতায় রাজ্য বিধানসভায় সর্বদল প্রস্তাব পাশ করিয়ে নরেন্দ্র মোদীকে বার্তা পাঠানো। দিনের শেষে সেই লক্ষ্য হাসিল হল ঠিকই। বিজেপি বাদে কেন্দ্রের জমি বিল ও অধ্যাদেশ (অর্ডিন্যান্স) বিরোধী প্রস্তাবে এক জায়গায় এল তৃণমূল, বাম ও কংগ্রেস। কিন্তু সেই পথে যেতে গিয়েই বিধানসভায় জাঁকিয়ে ফিরে এল সিঙ্গুরের অধ্যায়!

কেন্দ্রের জমি বিলের বিরোধিতা করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল যে তাদের জমি আন্দোলনের উপাখ্যান বলবে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের ‘মুখ’ হিসাবেই শাসক দলের তরফে শুক্রবার প্রস্তাবের উপরে বলার সুযোগ করে দেওয়া হয় বেচারাম মান্না ও ফিরোজা বিবিকে। সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে তাঁর অনশন-পর্বের কথা বলেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ও। আর এই সূত্রেই সিঙ্গুর নিয়ে সরকারকে পাল্টা আক্রমণে গিয়েছেন বিরোধীরা। প্রস্তাবের সমর্থনকারী সিপিএম এবং বিরোধী বিজেপি এই বিন্দুতে এক!

তৃণমূলের বেচারাম, ফিরোজা এবং পূর্ণেন্দু বসুর আক্রমণের জবাবে বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র এ দিন সিঙ্গুর-প্রশ্নে তাঁদের দৃঢ় অবস্থানই ফের বুঝিয়ে দিয়েছেন। আর সেই সঙ্গেই বিধানসভায় নথিভুক্ত
করিয়ে নিয়েছেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় ফিরলে তাঁরা সিঙ্গুরে শিল্পের পথেই হাঁটবেন। তাঁর কথায়, ‘‘সিঙ্গুরে আমাদের সরকার একটা গাড়ির কারখানার পরিকল্পনা নিয়েছিল। ভবিষ্যতে কোনও দিন যদি সুযোগ পাই, সেটাই আবার করব!’’ সূর্যবাবুর ব্যাখ্যা, সিঙ্গুরে প্রায় ৯২% মানুষ জমি দিতে সম্মত হয়েছিলেন। তথাকথিত ‘ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক’ কৃষকের বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল। যার জেরে সিঙ্গুরের মানুষ এবং এ রাজ্য বঞ্চিত হয়েছে। সিঙ্গুরে যে শিল্প বা কৃষি কোনওটাই আর হয়নি, সেই প্রসঙ্গ তুলে সূর্যবাবুর মন্তব্য, ‘‘এখন সিঙ্গুরে গেলেই বোঝা যাবে, কী মূল্য আমাদের দিতে হয়েছে!’’

সিঙ্গুরের মানুষের সঙ্গী যে শুধু আক্ষেপই, সেই সূত্র ধরে আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপি-র শমীক ভট্টাচার্যও। স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, ‘‘আপনি আবার সিঙ্গুর ও তার আশেপাশের এলাকায় গিয়ে দেখুন। দেখবেন, কৃষকেরা আর সেখানে জমির মালিক নয়। মাথায় বন্দুক ধরে জমি মাফিয়ারা অধিকাংশ জমিই কেড়ে নিয়েছে!’’ তাঁর আরও যুক্তি, জমি বিল আনতে গিয়ে এখন মোদীর সরকার যে কথা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের চেষ্টার সময়ে বাম সরকারের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-নিরুপম সেনেরা সেই কথাই বলতেন। আবার সূর্যবাবুও ফের স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সরকার জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ালে মাফিয়া-রাজেরই দৌরাত্ম্য চলবে।

কেন্দ্রের জমি বিলের বিরোধিতা করেও এই প্রশ্নে সহমত ব্যক্ত করেছেন কংগ্রেসের মানস ভুঁইয়া। বিস্তারিত তথ্য সহযোগে এ দিন তাঁর যুক্তি, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের মতো খণ্ডিত জমি এবং প্রবল জনঘনত্বের রাজ্যে শিল্পপতির পক্ষে সব জমি কিনে নেওয়া কী ভাবে সম্ভব? যেখানে বেসরকারি উদ্যোগে অনেকটা জমি কিনে ফেলা হয়েছে, সরকারের সামান্য স্পর্শেই সমস্যার সমাধান সম্ভব— সে দিকে খেয়াল রেখেই ২০১৩ সালে ইউপিএ সরকারের পাশ করা আইনে জমির মালিকদের সম্মতি ও সরকারি অধিগ্রহণের অনুপাত ৮০:২০ রাখা হয়েছিল।’’

মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য তাঁর পুরনো অবস্থানেই অনড়। তাঁর সাফ কথা, ‘‘আমরা ৮০:২০’তে রাজি হইনি। আমরা ১০০% জোর করে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে।’’ কিন্তু সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া একলপ্তে অনেকটা জমি কী ভাবে মিলবে, বিরোধীদের এই প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রীর জবাব, ‘‘বুদ্ধি খাটাতে হবে! অন্য উপায়গুলো দেখতে হবে। সহজ উপায়টাই নিতে হবে, তার কী মানে আছে?’’ সিঙ্গুর-প্রশ্নে বিরোধীদের আক্রমণের জবাবে তাঁর দলের পুরনো অবস্থানই ফের ব্যাখ্যা করেছেন মমতা। বলেছেন, ‘‘চেয়েছিলাম, অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দিয়ে সিঙ্গুরে
কারখানা হোক।’’ একই বিষয়ে একই লক্ষ্যে তৃণমূল, বাম ও কংগ্রেস তিন পক্ষের তিনটি প্রস্তাব থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সকলের মত নিয়ে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব  হোক।
শেষ পর্যন্ত বাম, কংগ্রেস এবং এসইউসি-র তরুণ নস্করের মত নিয়ে একটিই অভিন্ন প্রস্তাব পাশ করান পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। যদিও শমীকের প্রশ্ন, তাঁর বিরোধিতার পরে ওই প্রস্তাব সর্বসম্মত হয় কী ভাবে? রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনার প্রতিবাদ ও রাজ্যের দু’টি সার কারখানা খোলার দাবিতে আরও দু’টি প্রস্তাব নিয়ে এ দিন আলোচনা হয়েছে বিধানসভায়।

সিঙ্গুরের ভবিতব্য নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ার পাশাপাশিই এ দিন জমি বিলের উপরে অনর্গল বলতে গিয়ে আরও একটি প্রশ্ন শুনতে হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে। তাঁর বক্তৃতার মাঝেই বিরোধী দলনেতা সূর্যবাবু উঠে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখিয়ে জানতে চান, আর কত ক্ষণ চলবে এই রকম? প্রত্যেক বক্তারই তো বক্তব্যের সময় নির্ধারিত! যদিও বিধানসভার ছাপানো তালিকায় মুখ্যমন্ত্রীর নাম ছিল না। বিরোধী দলনেতার প্রশ্নের পরে আর বেশি কথা বাড়াননি মুখ্যমন্ত্রী।