যন্ত্র রাখবে হাজিরার হিসেব! হাজিরায় নজরদারি চালাবেন আমলারা! এমন হলে কাজই করব না। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইস্তফার পরিকল্পনা করেছেন সরকারি চিকিৎসকদের একাংশ।

হাসপাতালে কখন ঢুকলেন, বহির্বিভাগে ক’জন রোগীকে দেখলেন, ক’জন ভর্তি হওয়া রোগীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন, ক’ঘণ্টা পরে হাসপাতাল থেকে বেরোলেন— ঘড়ি ধরে এই সব কিছুরই হিসেব কষে রাখবে যন্ত্র। সেই হিসেব শীর্ষ কর্তার কাছে পৌঁছে দেবেন বিভাগীয় প্রধান।

এই নজরদারিতেই ঘোর আপত্তি সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একাংশের। তাই তাঁরা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ইতিমধ্যেই কলকাতার একাধিক মেডিক্যাল কলেজে অস্থি, কার্ডিওলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রধানের কাছে পদত্যাগপত্র জমাও দিয়েছেন।

রাজ্যের অধিকাংশ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জুন থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বায়োমেট্রিক হাজিরা পদ্ধতি শুরু হয়েছে। হাজিরার খাতায় সইয়ের পরিবর্তে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে চিকিৎসকদের হাজিরা নথিভুক্ত হচ্ছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী চিকিৎসকদের সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করতেই হবে।

সরকারি হাসপাতালের এক শ্রেণির চিকিৎসকদের প্রশ্ন, অধিকাংশ সময় তাঁদের সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে হয়। তা হলে এ ভাবে আমলার নজরদারি কেন চাপিয়ে দেওয়া হবে! ক’জন রোগীকে বহির্বিভাগে দেখলেন, শুধু তার নিরিখে কী ভাবে চিকিৎসকের কাজের পরিমাপ করা যায়, সেই প্রশ্নও তুলছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, যে-কোনও মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক-চিকিৎসকের রোগী দেখার পাশাপাশি পড়ানো এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণার কাজের দায়িত্ব থাকে। হাসপাতালে কাজ করা বলতে শুধু রোগী দেখাকেই গুরুত্ব দেওয়া হলে গবেষণার কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ষন্ত্রের অসুস্থতার প্রশ্নটিও তুলছেন অনেক চিকিৎসক। কলকাতার একটি মেডিক্যাল কলেজের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, বায়োমেট্রিক যন্ত্র তো অধিকাংশ সময় ঠিক মতো কাজ করে না। তাঁর সাম্প্রতিক হাজিরার স্লিপে দেখা গিয়েছে, অধিকাংশ দিন বায়োমেট্রিক যন্ত্র ঠিক কাজ না-করায় হাজিরা শূন্য দেখাচ্ছে! অথচ সেই দিনগুলোয় তাঁর হাসপাতালে থাকার প্রমাণ হিসেবে অন্যান্য নথি রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘পদোন্নতি থেকে বেতন— সব কিছু বায়োমেট্রিকের তথ্যের উপরে নির্ভর করবে বলে জানানো হচ্ছে। অথচ যন্ত্রের এই হাল! এটা হবে কেন?’’

স্বাস্থ্য ভবন এই সব প্রশ্নকে আমল দিচ্ছে না। স্বাস্থ্যকর্তাদের একাংশ জানান, ়়ডাক্তারের অভাবে ভুগছে অধিকাংশ সরকারি হাসপাতাল। রোগী পরিষেবা উন্নত করতে চিকিৎসক জরুরি। ডাক্তারদের কাজের সময় নির্ধারিত থাকলে রোগীরা সহজেই তাঁদের পাবেন। তা ছাড়া রবিবারের মতো ছুটির দিনে হাসপাতালে চিকিৎসক নেই বলে অভিযোগ ওঠে। এই সব সমস্যার সুরাহায় হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতির বিষয়টিকে বা়ড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটাকে আদৌ নজরদারি বলতে রাজি নন স্বাস্থ্য ভবনের কর্তারা। এক শীর্ষ কর্তার কথায়, ‘‘সব চাকরিরই কিছু না কিছু নিয়মবিধি রয়েছে। সরকারি চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য।’’ এই প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যসচিব অনিল বর্মা অবশ্য কোনও মন্তব্য করেননি। ফোন, এসএমএস করা হলেও উত্তর দেননি তিনি।