একে পলিতে রক্ষে নেই। দোসর জুটেছে টাকা ছাঁটাই।

দু’য়ে মিলে খাবি খাচ্ছে হলদিয়া বন্দর। ওখানে জাহাজ ঢোকা-বেরনোর মূল পথ যেটি, পলি জমতে জমতে সেই অকল্যান্ড চ্যানেলের নাব্যতা কমে দাঁড়িয়েছে সাকুল্যে আড়াই মিটারের একটু বেশি! যা কিনা হুগলি নদীর হাওড়া ব্রিজ লাগোয়া অঞ্চলের নাব্যতার সমান!

সব মিলিয়ে অকল্যান্ড চ্যানেল আর জাহাজ চলাচলের যোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এমনিতেই হুগলি নদীতে বাড়তি হারে পলি জমে। উপরন্তু দু’-দু’টো নদী-বন্দর (কলকাতা ও হলদিয়া) থাকার দরুণ হুগলিতে বছরভর নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে পলি তোলা দরকার। জাহাজ ঢুকুক বা না-ঢুকুক।

কিন্তু সেটা না-হওয়ায় সঙ্কট ঘনীভূত। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বন্দর-কর্তারা আঙুল তুলছেন অর্থাভাবের দিকে। যে সূত্রে সামনে আসছে কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রকের একটি সিদ্ধান্ত। পলি তোলা (ড্রেজিং) খাতে বন্দরগুলোকে বরাদ্দ ভর্তুকির অঙ্ক মন্ত্রক ধাপে ধাপে কমিয়ে আনছে। ‘‘এতে হলদিয়া ও কলকাতা বন্দরে কোপ পড়ছে ভীষণ রকম।’’— আক্ষেপ এক আধিকারিকের।

কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট (কেপিটি) সূত্রের খবর: হলদিয়ায় জাহাজ চলাচলের জন্য রয়েছে দু’টো চ্যানেল— অকল্যান্ড ও ইডেন। জাতীয় সড়কের মতো জাহাজ-চ্যানেলেও একাধিক লেন থাকে। ৩৪৫ মিটার চওড়া অকল্যান্ডে যেমন পাঁচটি। এ দিকে অগস্টের সমীক্ষা মোতাবেক, চ্যানেলের ১১৫ মিটার অংশে নাব্যতা প্রায় তলানিতে (২.৬ মিটারে) ঠেকেছে। এতে তিনটে লেনে জাহাজ চালানো অসম্ভব। বাকি দু’টোকে ‘বসিয়ে রাখা’ হয়েছে।

ফলে এই মুহূর্তে হলদিয়া চালু রাখতে মূল ভরসা ইডেন। এতে নাব্যতার সমস্যা তেমন নেই বটে, তবে জোয়ার-ভাটায় জল এতটাই অশান্ত হয়ে ওঠে যে, দক্ষ পাইলটদেরও বুক কাঁপে। তুলনায় অকল্যান্ডের জল বছরভর শান্ত থাকায় জলতলের বালি-ঢিবি এড়ানো সহজ। আর নিয়মিত ড্রেজিং হলে অকল্যান্ডে সাড়ে চার মিটার থেকে সাড়ে পাঁচ মিটার নাব্যতা বজায় রাখা কিছুই নয়।

এ সব কারণে সাগরদ্বীপের স্যান্ডহেডস থেকে বন্দর পর্যন্ত নদীপথ পাড়ি দিতে পাইলটেরা এ যাবৎ মূলত অকল্যান্ডকেই বেছে নিচ্ছিলেন। কিন্তু বাদ সেধেছে ড্রেজিং-ব্যয়ের বহর। অকল্যান্ডে বছরভর ড্রেজিংয়ের পিছনে কেন্দ্র চারশো থেকে পাঁচশো কোটি টাকার যে ভর্তুকি দিত, গত তিন বছরে ধাপে ধাপে তা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। পলির পাহাড় জমে রুগ্‌ণ থেকে রুগ্‌ণতর হয়েছে অকল্যান্ড চ্যানেল। গত সাত মাস তা জাহাজের মুখই দেখেনি।

পোর্ট ট্রাস্টের একাংশের দাবি: ড্রেজিং কম লাগবে— এই যুক্তিতে হলদিয়ায় জাহাজ ঢোকাতে ইডেন চ্যানেল চালু করতে বাধ্য করেছে দিল্লি। কেপিটি’র মেরিন ও হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ ঘোর আপত্তি তুলেছিল। দিল্লিকে বলা হয়েছিল— অকল্যান্ড বন্ধ করে ইডেন চালু করলে উল্টো বিপত্তি হবে। পলিতে যখন-তখন অকল্যান্ড রুদ্ধ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইডেন চ্যানেল থেকে রুটিনমাফিক তোলা পলি সাগরে ফেলে আসার সুযোগ থাকবে না। বন্দরে জাহাজ ঢোকার পথ সাফ রাখাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।

কিন্তু মন্ত্রক শোনেনি। পরিণামে হলদিয়া বিরাট বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেপিটি’র কিছু কর্তা। এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘হলদিয়ায় ঢোকার মুখে জেলিংহাম পয়েন্টে অবিরাম পলি জমে। তা ড্রেজারে তুলে লোয়ার অকল্যান্ড দিয়ে সাগরে ফেলে আসা হতো। অকল্যান্ডে নিয়মিত ড্রেজিং হতো। এখন অকল্যান্ড বন্ধ থাকায় জেলিংহামের পলি সরানোর রাস্তাও আটকে যাওয়ার জোগাড়।’’

এমতাবস্থায় ইডেনে কোনও বিভ্রাট ঘটলে হলদিয়া বন্দর পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা। কেপিটি’র মেরিন-অধিকর্তা ক্যাপ্টেন জে জে বিশ্বাস বলেন, ‘‘কিছু একটা সুরাহা বার করতেই হবে। আমরা পরিকল্পনা করছি।’’

বন্দর সূত্রের খবর: জাহাজ মন্ত্রকের নির্দেশে ইডেন চ্যানেল দিয়ে দু’টো জাহাজ প্রথম হলদিয়ায় আনা হয়েছিল ২০১৫-র ১৮ সেপ্টেম্বর। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি অকল্যান্ড বন্ধ করে ইডেন দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। সে দিন অকল্যান্ডের ৩৪৫ মিটার এলাকা জুড়ে নাব্যতা ছিল ৪.৬ মিটার। ১৫ এপ্রিলের সমীক্ষায় ধরা পড়ে, লোয়ার অকল্যান্ডে দ্রুত পলি জমছে। ১৬ এপ্রিল ফের ড্রেজিং শুরু হয়। ‘‘এখন ড্রেজিংয়েও লাভ হচ্ছে না। চ্যানেলের ১১৫ মিটার অংশে নাব্যতা ২.৬ মিটারে নেমেছে। তিনটে লেন বন্ধ। বাকি দু’টোও বুজে যেতে সময় লাগবে না।’’— পর্যবেক্ষণ এক অফিসারের। ওঁদের মতে, অকল্যান্ড বন্ধ করে কার্যত হলদিয়ার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সকলে অবশ্য এতটা হতাশ নন। কেপিটি’র অন্য অংশের বক্তব্য, গত সাত মাসে ইডেন দিয়ে ১৩৪০টি জাহাজ যাওয়া-আসা করেছে। সমস্যা হয়নি। ‘‘এ ভাবে চলে গেলেই তো হল।’’— বলছেন ওঁরা।

ক’দিন চলবে, সময়ই বলবে।