প্রশ্ন: বিজ্ঞানী হওয়ার ভাবনা কি ছোটবেলা থেকেই ছিল?

উত্তর: ছোটবেলায় বিজ্ঞানী হব ভাবতে পারিনি। কেউ জ্ঞিজ্ঞাসা করলে বলতাম, চিকিৎসক কিংবা ইঞ্জিনিয়র হব। কখনও কখনও বলতাম, আইএএস অফিসার হব।

 

প্রশ্ন: প্রিয় বিষয় কী ছিল?

উত্তর: উচ্চমাধ্যমিকের সময়ে ফিজিক্স খুব ভাল লাগত। ওই সময়েই মহাবিশ্ব নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়তাম সেই সময়ে। তখনই ‘কোয়ান্টাম ফিজিক্সে’র বিষয়ে জানতে পারি। তখন থেকেই ফিজিক্স নিয়ে পড়ার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। 

 

প্রশ্ন: আপনার ছোটবেলা কোথায় কেটেছে?

উত্তর: বাবা সরকারি চাকরি করতেন। বদলির চাকরি ছিল। নানা জায়াগায় ঘুরেছেন। ছোটবেলার কিছুটা সময় কেটেছে নন্দীগ্রামে। সেখানে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়েছি। তারপর শিলিগুড়িতে। সেখান থেকে বাবা হলদিয়ায় বদলি হয়ে আসেন। পঞ্চম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত হলদিয়ার চকদ্বীপা হাইস্কুলে পড়েছি।

 

প্রশ্ন: ছেলেবেলার কোনও উল্লেখযোগ্য স্মৃতি?

উত্তর: বেশির ভাগ স্মৃতিই স্কুলকেন্দ্রিক। স্কুলের গ্রাম্য পরিবেশ আজও মনে রয়েছে। সরস্বতী পুজোর সময়ে নাটক করতাম। বন্ধুরা দল বেঁধে বিজ্ঞানভিত্তিক জাদু দেখাতাম।

 

প্রশ্ন: মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছিলেন। অনেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভাল ফল করলেও পরবর্তী উচ্চশিক্ষায় দাগ কাটতে পারেননি। সে ক্ষেত্রে আপনি ব্যতিক্রমী। এরকম কেন হয় বলুন...

উত্তর: মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাল করলেও উচ্চ শিক্ষায় দাগ কাটতে পারেননি, একথা ঠিক নয়। আমার বন্ধু মহলেই অনেকে রয়েছে যাঁরা ছোটবেলায় ভাল ফল করেছেন এবং তাঁরা এখন উচ্চ শিক্ষায় ভাল ফল করে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।

 

প্রশ্ন: মাধ্যমিকে প্রথম হওয়া থেকে কেমন ছিল আপনার জার্নি?

উত্তর: চকদ্বীপা হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পর আমি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি হই। ২০০২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করি। তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স নিয়ে ভর্তি হই। ২০০৫ সালে স্নাতক। তারপর টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে ভর্তি হই।

 

প্রশ্ন: তারপর...  

উত্তর: টাটা ইনস্টিটিউটে গবেষণা করার পরে ‘এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্স’ নিয়ে পড়তে বিদেশ যাই। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে শুরু করি। সেই সময় ক্রিস্টোফার মনরো নামে এক বিজ্ঞানী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে নতুন গবেষণাগার তৈরির কাজ করছিলেন। আমিও সেই দলে যোগ দিই। সেখান থেকেই ২০১২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পোস্ট ডক্টরেট ফেলো’ হিসেবে যোগ দিই। হার্ভার্ডে তিন বছর পরম শূন্য তাপমাত্রা নিয়ে কাজ করেছি। ২০১৫ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে কিছু দিন কাজ করেছি। ২০১৬ সালে কানাডার অন্যতম প্রধান গবেষণাকেন্দ্র ‘ইনস্টিটিউট ফর কোয়ান্টাম কম্প্যুটিং’য়ে এক নতুন গবেষণাগার খোলার জন্য ডাক পাই। প্রতিষ্ঠানটি ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। তারপর কানাডার প্রধান কোয়ান্টাম গবেষণাগার থেকে ডাক পাই।

 

প্রশ্ন: আপনার ছেলেবেলার হলদিয়া ও আজকের হলদিয়ার মধ্যে কতটা তফাৎ?

উত্তর: হলদিয়ার পরিকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে হলদিয়ার দূষণও নজরে পড়েছে।

 

প্রশ্ন: মেদিনীপুরের সঙ্গেই উচ্চারিত হয় বিজ্ঞানী মণি ভৌমিকের নাম। দেখা হয়েছে ওঁর সঙ্গে?

উত্তর: মণি ভৌমিকের সঙ্গে দেখা হয়নি।

 

প্রশ্ন: দেখা হলে কী বলবেন?

উত্তর: দেখা হলে উনি যেভাবে লড়াই করে উঠেছেন তার কথা জানতে চাইব। আমার মনে আছে, উনি এক বার হলদিয়ায় এসেছিলেন। ওঁকে দেখতে আমাদের স্কুল থেকে বাস ভর্তি করে ছাত্ররা গিয়েছিল।

 

প্রশ্ন: দিন কয়েক আগেই তো চকদ্বীপা হাইস্কুল এসেছিলেন। পড়ুয়াদের ক্লাসও নিলেন। কেমন লাগল?

উত্তর: ঠিক ক্লাস নয়। সেটাকে একটা আলোচনাসভা বলা যেতে পারে। ছোটদের প্রশ্ন করার প্রবণতা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। ছোটদের অনেক সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতেও কিন্তু অনেক ভাবতে হবে। এটাই মজা। 

 

প্রশ্ন: সুযোগ পেলে স্কুল ও হলদিয়ার জন্য কিছু করা ভাবনা আছে?

উত্তর: এই রকম আলোচনাসভা চালিয়ে যেতে চাই। তবে শুধু নিজের স্কুল নয়, হলদিয়ার অন্য স্কুলের ছেলে মেয়েদেরও যদি কাজে লাগতে পারি তাহলে ভাল লাগবে।

 

প্রশ্ন:  শিল্পশহর হলদিয়ায় বিনিয়োগের জন্য যদি আপনাকে মাধ্যম হতে বলা হয়, রাজি হবেন?

উত্তর: হলদিয়ার উন্নতি আমি চাই। কিন্তু এই কাজের জন্য আমি উপযুক্ত নই।

 

প্রশ্ন: দেশে ফেরার ইচ্ছে আছে?

উত্তর: শিকড়ে তো সবাই ফিরতে চায়। দেশে ফিরলে আমি যে বিষয় নিয়ে কাজ করি, সেই বিষয়ে গবেষণাগার করার চেষ্টা করব। 

 

প্রশ্ন: ফুটবল না ক্রিকেট? কোনটা আপনার বেশি পছন্দ?

উত্তর: ক্রিকেট খেলতে ভাল লাগে। ফুটবল দেখতে ভাল লাগে।

 

প্রশ্ন: বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা নিয়ে কী বলবেন?

উত্তর:  মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করলে জাতির উন্নতি হয়। মানুষের চেতনার বিকাশ ঘটে। সমাজ ও জাতির মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি হয়। জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো ব্যক্তিও মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করেছেন। এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।

 

প্রশ্ন: আপনারা কি এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ করেছেন?

উত্তর: আমরা জনা কুড়ি বাঙালি বিজ্ঞানী মিলে একটা ওয়েব প্ল্যাটফর্ম চালাই। বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার এমন উদ্যোগ আগে হয়েছে কি না জানি না। আমরা পরিশ্রম করি এর জন্য। যাতে বাংলা ভাষায় উন্নতমানের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ সম্ভার তৈরি করা যায়। এখানে যাঁরা লেখেন তাঁরা সেই বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। www.bigyan.org.in এই ওয়েবসাইটে আগ্রহী পড়ুয়ারা সহজবোধ্য কিন্তু বিষয়ে গভীর প্রবন্ধের সন্ধান পাবে।

 

প্রশ্ন: আপনাদের সময়ের থেকে এখন স্কুল কলেজের পরীক্ষাগারে আধুনিক সরঞ্জামের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু পড়াশোনার মান কি বেড়েছে?

উত্তর: স্কুল, কলেজে ল্যাবরেটরিতে আধুনিক সরঞ্জামের সংখ্যা যদি বেড়ে থাকে তাহলে খুব আনন্দের কথা। আমরা হাতে-কলমে কাজের থেকে বেশি তাত্ত্বিক জিনিস পড়েছি। হাতে-কলমে কাজ করতে মজা পাওয়া যায়।  আধুনিক সরঞ্জাম খুবই প্রয়োজনীয়।

 

প্রশ্ন: এখন কি নিয়ে কাজ করছেন?

উত্তর: পরীক্ষামূলক কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা। আমরা যে গবেষণাগারটি তৈরি করছি, সেখানে ‘পরমশূন্য তাপমাত্রা’র কাছাকাছিতে পদার্থের অবস্থা কেমন হয় সেটা হাতেনাতে পরীক্ষা করা যাবে।