শিলিগুড়ির পরে এ বার দুই ২৪ পরগনা!

রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা সফরে মঙ্গলবার এলেন না পুলিশ-প্রশাসনের কোনও কর্তাই। দুই জেলার জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠক করতে চেয়েও বৈঠক করতে পারলেন না রাজ্যপাল। কোনও জনপ্রতিনিধিকেই বৈঠকে আসার জন্য জেলাশাসকের তরফে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। পরপর জেলা সফরে গিয়ে প্রশাসনের কর্তাদের গরহাজিরায় দৃশ্যত ‘বিরক্ত’ রাজ্যপাল বলেন, ‘‘রাজ্যপাল এলে জেলাশাসক সেখানে আসবেন না, এটা শুধু সাংবিধানিক প্রধানকে অসম্মান করা নয়, সংবিধানেরও অমর্যাদা। জেলাশাসকরা কি আমার সঙ্গে মর্যাদার লড়াই চালাচ্ছেন? এই অপমান হজম করা কঠিন।’’

এই দুই জেলায় গিয়ে এ দিন যে রাজ্যপাল জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠক করতে চান, তা আগেই রাজভবন থেকে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু রাজ্যপাল ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক লিখিত ভাবে রাজভবনকে জানান যে, রাজ্য সরকারের ‘অনুমতি’ ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো যাবে না।

প্রশাসনিক কর্তাদের অনুপস্থিতি এবং রাজ্যপালের ক্ষোভ নিয়ে উত্তরবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করতে চাননি। দুই জেলার জেলাশাসকের সঙ্গে এ দিন ফোনে যোগাযোগ করা যায়নি। রাজ্য প্রশাসনের তরফেও কেউ কোনও মন্তব্য করেননি। শিক্ষামন্ত্রী ও তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘বলতে হলে প্রশাসনিক প্রধান যা বলার বলবেন। রাজ্যপাল প্রতিদিন কী বলবেন, আর তার প্রতিক্রিয়া দেওয়া আমার কাজ নয়।’’

রাজ্যপাল সস্ত্রীক এ দিন সকাল ন’টা নাগাদ প্রথমে সন্দেশখালির ধামাখালিতে পৌঁছে দেখেন, জেলাশাসকও সেখানে আসেননি। নেই কোনও পদস্থ কর্তাও। নিজের নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে মিনিট কুড়ি অপেক্ষার পরে রাজ্যপাল বলেন, ‘‘অনুষ্ঠানের আধ বেলা আগে জেলাশাসক লিখিত ভাবে জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী এখন উত্তরবঙ্গে। ফলে পুলিশ-প্রশাসনের আধিকারিকেরা কেউ আসতে পারবেন না। মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গে গেলে কি রাজ্য সরকার ছুটিতে চলে যাবে?’’ সরকারের নির্দেশ ব্যতীত বৈঠকের জন্য কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না, জেলাশাসকের এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রাজ্যপাল বলেন, ‘‘জেলাশাসককে জিজ্ঞাসা করুন, গত সত্তর বছরের মধ্যে কোনও রাজ্যপাল এলে জনপ্রতিনিধিদের ডাকার জন্য রাজ্য সরকারের অনুমতি নিয়েছেন কি না?’’

এর পর বিএসএফের স্পিড বোটে রওনা দেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সজনেখালির দিকে। সেখানেও পৌঁছে দেখেন জেলাশাসক অনুপস্থিত। ছিলেন শুধু অতিরিক্ত দুই জেলাশাসক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। তাঁদের কাছেই জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন, উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে কোনও রকম বাধা আসছে কি না, রাজ্যপাল তা জানতে চান বলে প্রশাসন সূত্রের খবর।

এখানেই প্রশাসনের গরহাজিরায় রাজ্যপাল ক্ষোভ ব্যক্ত করে বলেন, ‘‘যেখানে আমি যাই, সেখানে প্রশাসনের আধিকারিকরা আসেন না। কোনও মন্ত্রী কোথাও গেলে সেখানে কিন্তু প্রশাসনের সব আধিকারিকরা হাজির থাকছেন। আর মুখ্যমন্ত্রী গেলে তো কথাই নেই!’’

রাজ্যের প্রাক্তন অ্যাডভোকেট জেনারেল তথা কলকাতা হাইকোর্টের প্রবীণ আইনজীবী জয়ন্ত মিত্র বলেন, ‘‘রাজ্যপালরা সাধারণত বিশেষ উচ্চবাচ্য করেন না। জগদীপ ধনকড় সক্রিয় হয়েছেন। তিনি যা করছেন তা তাঁর এক্তিয়ারের বাইরে নয়।’’

রাজ্যপাল বারবারই বলছেন, তিনি মানুষের ক্ষোভ-আনন্দ বুঝতে রাজ্যের যে কোনও প্রান্তে যে কোনও সময়ে যাবেন। নিজের সাংবিধানিক এক্তিয়ারের মধ্যে থেকেই মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু তিনি কোথাও গেলেই কেন সরকার ‘সংঘাতে’ জড়িয়ে পড়ছে, তা নিয়েও এ দিন ফের প্রশ্ন তুলেছেন ধনখড়। এ দিনও তিনি বলেন, ‘‘মানুষের মাঝে গিয়ে কথা বলব। রাজ্যপালকে যে ভাবে অসম্মান করা হচ্ছে, তা বাংলার মানুষ ভাল ভাবে নিচ্ছে না।’’

তবে রাজ্যপালের সঙ্গে রাজ্য সরকারের এই সংঘাত নিয়ে বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নানের বক্তব্য, ‘‘আমরা রাজ্যপালের হয়ে কথা বলছি না। কিন্তু রাজ্য সরকারও রাজ্যপালের সঙ্গে যা করা উচিত ছিল, তা করেনি। অতীতেও বহুবার রাজ্যপালের সঙ্গে শাসক দলের সংঘাত হয়েছে। কিন্তু তা সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করেনি।’’ বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘‘রাজ্যপালের পদটার কী যৌক্তিকতা, তা নিয়ে আমাদের দলের প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু যাঁদের প্রশ্ন নেই, যাঁরা বিরোধী থাকাকালীন রাজ্যপালকে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন, তাঁরা এখন রাজ্যপালের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কী ভাবে? আর রাজ্যপাল এবং রাজ্য সরকারের এই তরজায় সাধারণ মানুষের কী লাভ হচ্ছে?’’