রাজ্যের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক কাঠামো রক্ষা করার জন্য সকলকে সচেষ্ট হওয়ার আবেদন জানালেন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। রাজভবনে চার দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে রাজ্যপাল আরও ব্যাখ্যা করলেন, রাজ্যে ৩৫৬ ধারা জারি করার বিষয়ে কোনও স্তরেই কোনও আলোচনা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিন বিরোধী দল বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেস সরব হলেও শাসক তৃণমূলের সুরে তারাও ৩৫৬ ধারা জারি করে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে রাজভবনের বৈঠকে।

রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও হানাহানির জেরে রাজ্যের প্রধান চারটি দলকে নিয়ে বৈঠক ডেকেছিলেন রাজ্যপাল। মূলত আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বৈঠক ডাকা হলেও শুক্রবারের আলোচনায় উঠে এসেছিল রাজ্য জুড়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার অচলাবস্থার প্রসঙ্গও। বিরোধী নেতারা অভিযোগ করেছেন, গ্রাম থেকে হাসপাতাল—সর্বত্র অরাজকতা চলছে। প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ। শাসক দলের মহাসচিব তথা রাজ্যের মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য সেখানে বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য চিকিৎসকদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। বিশৃঙ্খলা বন্ধ করার জন্যও কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন।

রাজ্যপালের এমন বৈঠক ডাকার যৌক্তিকতা ও এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অবশ্য অব্যাহত রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিনও এবিপি আনন্দে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘‘সর্বদল বৈঠক কখন ডাকতে হয়, আমরা জানি। তেমন কোনও পরিস্থিতি রাজ্যে হয়নি। এখনও পর্যন্ত ১১ জন (ভোটের পরে) মারা গিয়েছেন, তার মধ্যে ৯ জনই তৃণমূলের। সব ক্ষেত্রে ওরাই (বিজেপি) আগে আক্রমণ করছে, ওরাই ঝামেলা করছে। আমি তো শাসক, আমি তো চাইব শান্তি থাকুক।’’ নিহতদের পরিবারকে আড়াই লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। 

রাজ্যপালের সামনেও এ দিন সিপিএমের পলিটবুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলতে হলে বিধানসভায় অস্তিত্ব আছে, এমন সব দলকে ডাকা উচিত ছিল। তা ছাড়া, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বৈঠক তো মুখ্যমন্ত্রী ডাকবেন, রাজ্যপাল নন। সেলিমকে সমর্থন করেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রও। সূত্রের খবর, রাজ্যপাল ব্যাখ্যা দেন, তিনি চেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীই বৈঠক ডাকুন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী রাজি হননি বলেই তিনি চার দলকে ডেকে পরিস্থিতি নিয়ে মতামত নিচ্ছেন। সহমতের ভিত্তিতেই পরে রাজ্যপাল বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘‘ভোটের পরে হিংসা চললে পরাজয় হয় রাজ্যেরই। অশান্তি ও হিংসা বন্ধে সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। সব ধরনের প্ররোচনামূলক বক্তৃতা বন্ধ করতে হবে’’। রাজ্যের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক কাঠামো রক্ষায় সকলের সহযোগিতাও চেয়েছেন রাজ্যপাল। 

বৈঠকে এ দিন রাজ্যপাল চার নেতাকে বলেন, ৩৫৬ ধারা জারির প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকে কোনও আলোচনা হয়নি। তাঁর রিপোর্টেও এমন কোনও কথা ছিল না। সংবাদমাধ্যমে অযথা এই নিয়ে জল্পনা হচ্ছে। বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদারও তখন বলেন, ‘পিছনের দরজা’ দিয়ে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করার কোনও ইচ্ছা তাঁদের নেই।

যে কোনও ঘটনায় ধর্মীয় মেরুকরণ টেনে আনার জন্য বিজেপির বিরুদ্ধে আবার তৃণমূল, সিপিএম ও কংগ্রেস মিলে সরব হয়েছে এ দিনের বৈঠকে। পার্থবাবু পরে বলেন, ‘‘রাজনৈতিক বিরোধ চিরকাল ছিল। কিন্তু সব কিছুর মধ্যে সাম্প্রদায়িক রং লাগানোর চেষ্টা বিজেপি যে ভাবে করছে, তা কখনও বাংলায় ছিল না।’’ বৈঠকের পরে সোমেনবাবুও বলেন, ‘‘বাংলায় কখনও এমন মেরুকরণের পরিবেশ ছিল না।’’ আর সেলিমের মন্তব্য, ‘‘চিকিৎসক নিগ্রহেও ধর্মীয় পরিচয় খুঁজছে বিজেপি। বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাতাবরণকে যে ভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে, তার তীব্র প্রতিবাদ করছি আমরা।’’

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।