বিদ্যাসাগরের ভাঙা আবক্ষ মূর্তিতে নতুন মালা দেওয়া হয়েছে বুধবার সকালে। সেখানে দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগর কলেজের রসায়নের শিক্ষক অরুণাভ মিশ্র বললেন, ‘‘কাল রাতে কলেজের বাইরে যখন আগুন জ্বলছে, কথা বলার ভাষা ছিল না। আমরা মনে করি, এই আক্রমণ আসলে বিদ্যাসাগরের মূল্যবোধ এবং আদর্শের উপরে আক্রমণ।’’ সেই মূল্যবোধের প্রসঙ্গ টেনেই অরুণাভবাবু ফিরে যান বিদ্যাসাগর কলেজের ইতিহাস এবং মূর্তি বসানোর কাহিনিতে।

১৮৭২ সালে বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৯৫৫ সালের আগে বিদ্যাসাগরের কোনও মূর্তিই ছিল না বলে জানালেন অরুণাভবাবু। ওই বছর ৭ মে এক অনুষ্ঠানে প্রথম বার বিদ্যাসাগরের মূর্তি বসানো হয় কলেজে। অরুণাভবাবু জানান, তখনও বিধান সরণির ক্যাম্পাস তাঁরা হাতে পাননি। তারও অনেক পরে পাওয়া গিয়েছে সল্টলেকের ক্যাম্পাস। শঙ্কর ঘোষ লেনের মূল ক্যাম্পাসেই সেই সময়ে ব্রোঞ্জের তৈরি প্রথম মূর্তিটি বসানো হয়েছিল। মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন শিল্পী সুনীল পাল। তিনি জানান, সত্তরের দশকে ওই ব্রোঞ্জের মূর্তি ভাঙার চেষ্টা চালায় নকশালেরা। তৎকালীন সান্ধ্য বিভাগের অধ্যক্ষ সেটি রক্ষা করেন। অরুণাভবাবু বলেন, ‘‘সেই মূর্তি এখনও অক্ষত রয়েছে। কিন্তু, প্লাস্টার অব প্যারিসের তৈরি অন্য মূর্তিটা রক্ষা করতে পারিনি আমরা। মানুষ হিসেবে আজ বড় লজ্জা করছে।’’ 

অরুণাভবাবু স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘‘যত দূর মনে পড়ে ২০০০ সালের আশপাশে বিধান সরণির ক্যাম্পাস আমরা পাই।’’ স্থান সঙ্কুলানের কথা জানিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষই ভবনটি পেতে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই সময়ে ১৭ নম্বর বিধান সরণির ওই জায়গায় একটি হস্টেল ছিল। অব্যবহৃত হস্টেলটি অধিগ্রহণ করে বাম সরকার। পরে তা বিদ্যাসাগর কলেজের হাতে তুলে দেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। শিক্ষকের কথায়, ‘‘সেই সময়ে মামলা লড়তে হয়েছিল ওই বাড়িটা পেতে গিয়ে। তবে বাড়িটা পেতে কলেজের সমস্যা হয়নি।’’ পরবর্তী কালে ১৭ নম্বর বিধান সরণির ওই বাড়িতে নতুন কলেজ ভবন তৈরি হয়। সেখানে নতুন ছ’টি বিষয়ের পঠনপাঠন চালু করে বিদ্যাসাগর কলেজ। কলা বিষয়ের আলাদা আলাদা বিভাগের জন্য আলাদা লাইব্রেরি-ঘরেরও ব্যবস্থা করা হয় সেখানে। তারও পরে ওই ভবনে বসানো হয় মঙ্গলবার ভেঙে যাওয়া বিদ্যাসাগরের মূর্তিটি।

শিক্ষক-শিক্ষিকারা জানাচ্ছেন, ১৯৯৭ সালে বিদ্যাসাগর কলেজের ১২৫তম প্রতিষ্ঠা দিবস ছিল। সেই সময়ে প্লাস্টার অব প্যারিসের তৈরি বিদ্যাসাগরের দ্বিতীয় মূর্তিটি বসানো হয়। প্রথমে সেটি কলেজের পরিচালন সমিতির ঘরে রাখা ছিল। ২০০৮ সালে সেটিকে বিধান সরণি ক্যাম্পাসে বসানো হয়। ওই বছরই প্রথম বিদ্যাসাগর কলেজ পরিদর্শনে যায় ‘দ্য ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল’ (নাক)। অরুণাভবাবুর কথায়, ‘‘সেই উপলক্ষেই মূর্তিটি বিধান সরণির ক্যাম্পাসে বসানোর পরিকল্পনা করেছিলাম আমরা। গত ২২ বছর মূর্তিটা কলেজেই রয়েছে।’’ তিনি আরও জানান, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যাসাগর কলেজের ১৫০ বছর পূর্তি। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ পূর্তি। ‘‘দু’টি মিলিয়ে ভাল কিছু করার আবেদন জানিয়ে কালই কলেজের অধ্যক্ষকে চিঠি লিখেছিলাম আমি। রাতে দেখলাম আমার কলেজ জ্বলছে। যাঁরা এ কাজ করলেন তাঁরা বুঝে নিন, এতে বিদ্যাসাগর চর্চায় বাঙালি আরও উদ্বুদ্ধ হল।’’

কলেজের অধ্যক্ষ গৌতম কুণ্ডু বলেন, ‘‘ওই মূর্তি আমাদের ঐতিহ্য। সেই সঙ্গে কলেজের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। মূর্তিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের কাছে সাহায্য চাইছি আমরা। এ ভাবে ইতিহাস মোছা যায় না।’’