• ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

এ কেমন ডিএ বৃদ্ধি, উল্টে বেতনেই তো কোপ! বলছেন সরকারি কর্মীরা

DA cartoon
ডিএ বাড়ানোর পরিবর্তে আসলে কোপ পড়ছে বেতনেই, এমনই অভিযোগ সরকারি কর্মীদের।

বাড়ছে ডিএ। রাজ্য সরকার জুন মাসেই ঘোষণা করে দিয়েছে সে কথা। কিন্তু সরকারি কর্মীরা বলছেন, খুব বড় ‘ফাঁকি’ হচ্ছে। ঘোষণা শুনে মনে হচ্ছে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু আসলে বেতনে কোপ পড়ছে— স্কুল শিক্ষক থেকে পূর্ত দফতরের কর্মী, সকলের  মুখে একই কথা। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার কথাও ভাবছে সরকারি কর্মীদের একাধিক সংগঠন।

ডিএ বাড়ানোর কথা ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কর্মীরা কেন বলছেন যে, কোপ পড়ল বেতনে? ডিএ বৃদ্ধির যে হিসেব প্রশাসনের তরফে দেওয়া হয়েছে, সেই অনুযায়ী রাজ্যের কর্মীদের ডিএ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের সমতুল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু একাধিক কর্মী সংগঠন বলছে, হিসেবে বড়সড় গলদ রয়েছে। কারণ ২৫ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির নামে অন্তর্বর্তিকালীন ভাতা (আইআর) তুলে দেওয়া হচ্ছে। আইআর হিসেবে যে টাকা এখন পাওয়া যাচ্ছে, ডিএ-র সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার পরে সেই অঙ্কও কমবে বলে জানা যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সরকার তার কর্মীদের যে হারে মহার্ঘ ভাতা দেয়, রাজ্যগুলির সরকারও নিজেদের কর্মীদের সেই হারেই মহার্ঘ ভাতা দেবে। নিয়ম এ রকমই। কেন্দ্র অনেক আগেই মহার্ঘ ভাতা নিয়ে গিয়েছিল ১২৫ শতাংশে। তার পরে সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা হয়। বাংলার সরকার ষষ্ঠ বেতন কমিশন গঠন করেছে ২০১৫ সালে। কমিশনের মেয়াদ দু’বার বাড়ানোও হয়েছে। তবে এখনও বেতন কমিশনের সুপারিশ রাজ্য সরকারের টেবিলে জমা পড়েনি। চলতি বছরের শেষের দিকেই কমিশনের সুপারিশ জমা পড়ার কথা। তার আগে ডিএ ১২৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া জরুরি ছিল। জুনের শেষ দিকে মুখ্যমন্ত্রী সেই বৃদ্ধির কথাই ঘোষণা করে দেন।

আরও পড়ুন: মমতার সিদ্ধান্তে সরছেন জয়া, জানালেন পার্থ

এখন ১০০ শতাংশ ডিএ পান এ রাজ্যের কর্মীরা। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ২০১৯-এর জানুয়ারি থেকে ১৮ শতাংশ বাড়ছে কর্মীদের ডিএ। আর বেতন কমিশন বসার পর থেকে যে অন্তর্বর্তিকালীন ভাতা (আইআর) দেওয়া শুরু হয়েছিল, তা এই ডিএ-র সঙ্গে জুড়ে গিয়ে ডিএ-র মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ২৫ শতাংশে। এই মুহূর্তে ব্যান্ড পে-র ১০ শতাংশ অর্থ আইআর হিসেবে পাচ্ছেন রাজ্য সরকারি কর্মীরা। সরকার জানিয়েছে, এই ১০ শতাংশ আইআর হল ৭ শতাংশ ডিএ-র সমতুল। অতএব ১৮ শতাংশ নতুন ডিএ-র সঙ্গে ওই ৭ শতাংশ জুড়ে দিলে ডিএ বৃদ্ধি পৌঁছে যাচ্ছে ২৫ শতাংশে। মোট ডিএ দাঁড়াচ্ছে ১২৫ শতাংশে। সরকারের দেওয়া হিসেব এ রকমই।

রাজ্য সরকারি কর্মীদের অনেকেই বলছেন, সরকারের দেওয়া এই হিসেবে বিস্তর কারচুপি রয়েছে। কী কী কারচুপির কথা বলছেন কর্মীরা? দেখে নেওয়া যাক।

প্রথমত, সরকারি কর্মীরা বলছেন, ১০ শতাংশ আইআর-কে ৭ শতাংশ ডিএ-র সমতুল বলে সরকার দাবি করছে ঠিকই। কিন্তু টাকার অঙ্কে তা সমান হচ্ছে না। ফলে বর্তমান মোট বেতনের সঙ্গে ২৫ শতাংশ ডিএ যোগ হলে বেতন যা হওয়ার কথা, জানুয়ারি থেকে তার চেয়ে কিছুটা কম বেতন পাবেন কর্মীরা। কতটা কম পেতে পারেন এবং কেন কম পেতে পারেন? দেখে নেওয়া যাক এক ঝলকে:

দ্বিতীয়ত, নিয়ম হল, বেতন কমিশন গঠিত হওয়ার পর থেকে বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হওয়া পর্যন্ত কর্মীদের আইআর দিতে হয়। কিন্তু নতুন ডিএ যে ভাবে ঘোষিত হয়েছে, তাতে জানুয়ারি থেকে আইআর-এর অবলুপ্তি নিশ্চিত। তবে বেতন কমিশনের সুপারিশ তার মধ্যে জমা পড়বে এবং কার্যকর হবে, এমনটা নিশ্চিত নয় বলে কর্মীদের একাংশের দাবি।

আরও পড়ুন: ৩০ শতাংশ আসনে এ বার পার্শ্বশিক্ষক

চলতি বছরের নভেম্বরে বেতন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে  নভেম্বরের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশও জমা পড়ে যাবে। জানুয়ারিতে যখন আইআর-এর অবলুপ্তি ঘটবে, তখন নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পথেও কোনও বাধা থাকবে না। কিন্তু ডিএ নিয়ে আন্দোলন তথা মামলা-মোকদ্দমার পথে গিয়েছে কর্মীদের যে সব সংগঠন, তারা বলছে, বেতন কমিশনের সুপারিশ কবে জমা পড়বে, সে বিষয়ে কেউই নিশ্চিত নন।

বিজেপি ঘনিষ্ঠ সংগঠন ‘সরকারি কর্মচারী পরিষদ’-এর আহ্বায়ক দেবাশিস শীল বললেন, ‘‘দিদিমণির বাড়িতে নেমন্তন্ন তো, না আঁচানো পর্যন্ত বিশ্বাস নেই যে খেলাম।’’ কী বলতে চাইলেন দেবাশিসবাবু? তিনি আরও স্পষ্ট করে বললেন, ‘‘বেতন কমিশনের মেয়াদ তো অনেক দিন আগেই শেষ হওয়ার কথা। সুপারিশ জমা পড়ে নতুন বেতন কাঠামো চালুও হয়ে যাওয়ার কথা ছিল এত দিনে। কিন্তু দু’বার কমিশনের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হল। এ বারও বাড়ানো হবে না, এ বারও সুপারিশ জমা পড়া পিছিয়ে দেওয়া হবে না, তা নিশ্চিত ভাবে বলব কী করে?’’

আইএনটিইউসি অনুমোদিত কর্মী সংগঠন ‘কনফেডারেশন’-এর তরফ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করা হয়েছে ডিএ সংক্রান্ত বিষয়ে। সরকারি কর্মচারী পরিষদের মামলাটি চলছে রাজ্য প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে। বামেদের কর্মী সংগঠন কো-অর্ডিনেশন কমিটিও ডিএ নিয়ে আন্দোলন করছে। কনফেডারেশনের তরফে সুবীর সাহা বললেন, ‘‘জীবনে কোনও দিন শুনেছেন যে, বেতন কমে যায়? আইআর-টাকে ডিএ-তে বদলে দিয়ে তো আসলে টাকার অঙ্কটা কমিয়ে দিল।’’ তাঁর কথায়, ‘‘ভারতের কোনও রাজ্যের সরকার কোনও দিনই এমন ঘটনা ঘটায়নি। আইআর এবং ডিএ সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একটাকে আর একটায় বদলে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেটাই করা হচ্ছে। কী ভাবে হচ্ছে জানি না।’’

রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির সুরও একই রকম চড়া। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজয়শঙ্কর সিংহ বললেন, ‘‘রাজ্য সরকার যে পদ্ধতিতে ২৫ শতাংশ ডিএ-র হিসেব মিলিয়ে দিতে চাইছে, সেটা ভয়ঙ্কর অনিয়ম। ভূ-ভারতে এ রকম কেউ দেখেননি। কর্মীদের সঙ্গে সরকার আর্থিক প্রতারণা করছে। এর বিরুদ্ধে আমরা ইতিমধ্যেই বিক্ষোভ দেখিয়েছি। এ বার আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাচ্ছি।’’

বিরোধী পক্ষে থাকা কর্মী সংগঠনগুলি সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করেই থাকে। কিন্তু শাসক দলের শ্রমিক শাখা অনুমোদিত কর্মী সংগঠনও প্রায় একই সুরে কথা বলেছে এ প্রসঙ্গে। আইএনটিটিইউসি অনুমোদিত রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের মেন্টর গ্রুপের আহ্বায়ক মনোজ চক্রবর্তী বললেন, ‘‘২৫ শতাংশ ডিএ নিয়ে তো বলার কিছু নেই। কিন্তু যে ভাবে আইআর বন্ধ করে ডিএ দেওয়া বলে বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তা সমর্থন করতে পারি না। সবচেয়ে ভাল হত, রাজ্য সরকার যদি আইআর রেখে ডিএ-টা দিত।’’ তবে যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তার জন্য সরকারকে দায়ী না করে বেতন কমিশনকেই বেশি করে দায়ী করছেন মনোজবাবু। তিনি বললেন, ‘‘২০১৫ সালে বেতন কমিশন গঠিত হয়েছে। সেই থেকে প্রায় তিন বছর হতে চলল। কমিশন নিজের সুপারিশ তো জমা দিতে পারলই না। সরকারকে তারা কোনও অন্তর্বর্তী রিপোর্টও দিল না।’’ তৃণমূল নিয়ন্ত্রিত কর্মী সংগঠনের নেতার খোঁচা, ‘‘এ রাজ্যের বেতন কমিশন আদৌ সক্রিয়, নাকি নিষ্ক্রিয়, তা আমরা বুঝতে পারছি না।’’

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন